দেশজুড়ে এখন নির্বাচনী জোয়ার। জনগণ উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। দিন যত ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনী লড়াইয়ের পারদ তত বাড়ছে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যম একপেশে আচরণ করে তখন সেটিই অস্বাভাবিক। তখন সাংবিধানিক রীতি-নীতি লঙ্ঘন হয়, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়। নির্বাচন কমিশনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধার মুখে পড়ে।
নির্বাচনমুখী কোনো দলই নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেনি। হামলা-ভাঙচুর এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্র হননের কুৎসিত প্রবণতা চলছে। হামলার চূড়ান্ত পর্যায় দেখা গেছে শেরপুরের শ্রীবরদীতে। সেখানে জামায়াত নেতাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এরও আগে প্রকাশ্য জনসভায় থানা পর্যায়ের এক নেতা নারীদের হিজাব এবং অন্তর্বাস ছিঁড়ে ফেলার হুমকি দেন। এ ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানা যায়নি। এ ধরনের ঘটনা গ্রামগঞ্জে অহরহ ঘটছে। স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ ক্ষেত্রে কুম্ভকর্ণের ভূমিকায়। যে দলের পরিচয়ে নারীদের হিজাব ছেঁড়ার কথা উচ্চারণ হয়— সেই দলও এ ব্যাপারে কিছু করেছে বলে জানা যায়নি; বরং তারাই অন্য দলগুলোর ব্যাপারে মিথ্যা ছড়াচ্ছে। এরা ক্ষমতায় গেলে নারীদের সম্মান ভূলুণ্ঠিত হবে।
নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৭০ সালের কথা। ওই সময় জামায়াতের নির্বাচনী সভায় আক্রমণ করেছিল আওয়ামী লীগ। তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করে। একই অবস্থা এবারো দেখা যাচ্ছে; লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রশ্নবিদ্ধ।
সত্তরের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। ছিল না শত শত সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের বাহুল্য। তার পরও নির্বাচনের কিছু দিন আগে হঠাৎ একযোগে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল প্রোপাগান্ডা। বলা হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের প্রধান অধ্যাপক গোলাম আযমের মেয়ে লন্ডনের বারে ব্যালে নর্তকী হিসেবে কাজ করে। অথচ তার কোনো মেয়েই নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা! হাট-বাজারে, চায়ের দোকানে, সামাজিক অনুষ্ঠানে একই কথা— একই ফিসফাস। এই প্রোপাগান্ডা ভাঙতে, নির্বাচনী প্রচারে অনেকটা সময় খরচ হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। এবারো একই আওয়ামী কৌশল। জামায়াত আমিরের হ্যাক করা এক্স হ্যান্ডেলে নারীদের প্রতি অবমাননাকর তথাকথিত মন্তব্যের জেরে তাৎক্ষণিকভাবে নারীসম্মান (!) রক্ষায় জানপ্রাণ নিয়ে মাঠে নেমেছে একটি গোষ্ঠী।
এদের মদদদাতাদের বোঝা দরকার, একজন জাতীয় নেতাকে হেনস্তা একসময় তাদের জন্যও বুমেরাং হতে পারে। ঘৃণা দিয়ে দেশ গড়া যায় না। বন্ধু তৈরি করা যায় না। এটাও একরকম সন্ত্রাস। এভাবে আর যাই হোক নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন আশা করা যায় না। যেখানে ক্ষমতার নাগাল পেতে অসৎ উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে। নিঃস্ব প্রার্থী কোটি টাকার গাড়িতে জনসংযোগ করে বেড়াচ্ছেন নির্বাচন কমিশন এবং দুদকের চোখের সামনে। এত দামি গাড়ির ঘোষণা তার সম্পদ বিবরণীতে আছে কি না, থাকলে এর ট্যাক্স পরিশোধ করা হয়েছে কি না এসব দেখার কেউ নেই।
অথচ আমাদের কাছাকাছি দেশ শ্রীলঙ্কা, তাদের অবস্থা বাংলাদেশের চাইতেও খারাপ ছিল। ওই দেশে প্রশংসা করার মতো নির্বাচন হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা কী? নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে— পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ?
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



