দেশ এখন দ্রুতগামী নির্বাচনী ট্রেনে। আগামী সংসদ নির্বাচনের প্রচারাভিযান শেষ পর্যায়ে। স্বৈরাচার খেদানোর পর জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এখন দেশের সবচেয়ে বড় দল। দেশব্যাপী বিপুল তাদের সাংগঠনিক বিস্তার-বিস্তৃতি। দেশনেত্রীর জীবন অবসানের পর সঙ্গত কারণে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন দলের চেয়ারম্যান । ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন থেকে মুক্ত হয়ে তিনি এখন দেশে। তাকে ঘিরে দেশে-বিদেশে বিপুল প্রত্যাশা এবং জল্পনা-কল্পনা। জনধারণা, আগামী নির্বাচনে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে। তাই তারেক রহমানকে দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী ভাবা হচ্ছে, ভোটে অপ্রত্যাশিত কোনো ফল না হলে। এটি পাবলিক পারসেপশন।
বিএনপির যারা ভক্ত এবং অনুরাগী তাদের কাছে তো বটেই, সাধারণ মানুষ, কৃষক-শ্রমিক-মজুর, দিন এনে দিনে খাওয়া মানুষ, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, ক্রীড়াবিদ— সব শ্রেণীর ঔৎসুক্য এবং মনোযোগের কেন্দ্র এখন জিয়া-খালেদার ছেলে তারেক রহমান। তার এবং বিএনপির যারা বিরোধী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী তাদেরও অনুরূপ ঔৎসুক্য এবং মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ষাট বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা তারেক রহমানের প্রথম এবং প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তিনি আপসহীন পিতা-মাতার উত্তরাধিকারী। গণতন্ত্রের সাথে পারিবারিক বংশ পরম্পরা সব সময় এক সাথে না গেলেও তারেক জিয়া ব্যতিক্রম।
কেননা, স্বৈরাচার-পূর্ববর্তী ১/১১ এর ভারতীয় দালালদের হাতে অবর্ণনীয় দৈহিক-মানসিক নির্যাতন এবং দেশান্তরের যন্ত্রণা সয়ে তিনি রাজনৈতিক জীবনের উত্থানপর্বকে মহিমান্বিত করার সুযোগ পেয়েছেন। ব্রিটিশ সমাজের শিষ্টাচার এবং মূল্যবোধ তাকে দিয়েছে ব্যক্তিত্ব গঠনের বৈশ্বিক সুযোগ। প্রবাসে থেকে কার্যত বৃহত্তম একটি দল পরিচালনা করেছেন তিনি। সুযোগ পেয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগান্তকারী প্রচার কৌশল কাজে লাগানোর। তবে তার ও দলের বেশিরভাগ কর্মী মনে করেন, বিএনপির মৌলিক রাজনৈতিক দর্শন ও স্বাতন্ত্র্য থেকে কিছুটা বিচ্যুত হওয়ার যে ঝুঁকি সাম্প্রতিক মাসগুলোয় তিনি নিয়েছেন, এর আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল না।
তাহলে এ ভূমিকা কি তার বা দলের জন্য যোগের চেয়ে বিয়োগের গণিত প্রধান করে তুলছে?
স্বৈরাচারের বয়ানে ছিল বিএনপি-জামায়াত সমার্থবোধক বা একই ব্রাকেটে বন্দী দুই অবিভাজ্য রাজনৈতিক সত্তা। কার্যত এটা ছিল ‘বিএনপি’র আজন্ম বৈশিষ্ট্য। কেননা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ মানে ইসলামী মূল্যবোধ এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুগল মিশেল। সেই বিএনপিকে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন পথের পথিক হয়ে উঠতে।
যেখানে ভারতীয় আধিপত্যবাদের অভিন্ন লক্ষ্যবস্তু ছিল বিএনপি এবং জামায়াত, এমন কী ঘটেছে যে, সাফল্যের প্রায় ওঠা চূড়ায় আরোহণের প্রাক্কালে বিএনপি এই আশঙ্কা ব্যক্ত করল, দেশে মৌলবাদের উত্থান নিয়ে তারা শঙ্কিত এবং চিন্তিত। আর, রাজা যত না বলেন; পারিষদ দল বলে তার শতগুণ। তারেক রহমান যখন দেশে মৌলবাদের উত্থান নিয়ে তার সংশয় ও উদ্বেগ প্রকাশে সীমাবদ্ধ থাকলেন, তার দলের ভারত ঘেঁষা এবং আওয়ামী-সমঝোতায় বিশ্বাসী অন্য অন্তত ৫-৬ জন কেন্দ্রীয় নেতা রীতিমতো জামায়াতের বিরুদ্ধে ‘ক্রুসেড’ শুরু করে দিলেন, বিশেষ করে মির্জা ফখরুল, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ। এ সুযোগে বিএনপির মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা ভারত ও আওয়ামী অনুরাগী নেতা-নেত্রীরা রীতিমতো ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন, যেসব কথা আমরা কখনো সিপিবি-জাসদ-ওয়ার্কার্স পার্টির মুখেও শুনিনি। ‘নৌকা’ প্রতীকের ভোটারদের মন জয়ে তথা রাম-বাম শক্তির পক্ষে অবস্থান নেয়ায় তারা যে সাধারণ ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের অনুরাগীদের চিত্ত থেকে উঠে যেতে শুরু করেছেন এবং যার অনিবার্য প্রচার নির্বাচনের ওপর পড়েছে, সে সম্পর্ক এমন ঝুঁকিপূর্ণ উদাসীনতা প্রদর্শনের আত্মঘাতী পথ বেছে নিলেন, নাকি আধিপত্যবাদের দ্বিতীয় বিশ্বস্ত পক্ষের ভূমিকায় নামলেন, সেটা ‘বিএনপি’ বিষয়ক এ ক্রমঃ বিকাশমান বিভ্রান্তির মূল বিষয়।
এখন কোটি টাকার প্রশ্ন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান কি তার নিজের ‘কৌশলগত দিকবদলের’ নীতি এবং তার পারিষদে ঘাপটি মেরে থাকা ভারতীয়-আওয়ামী স্বার্থরক্ষীদের আপন করে নেবেন, নাকি যে কারণে বিএনপি এত জনপ্রিয় সেই নীতি ও অবস্থানের তাত্ত্বিক অবস্থানে অটল থাকবেন। কী সেই অবস্থানের তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভিত্তি? উত্তর খুব সহজ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া ৭ নভেম্বরের (১৯৭৫) নেতা, যে ৭ নভেম্বর ঘটেইছিল একই বছরের ১৫ আগস্ট তারিখে এদেশের মাটিতে ভারতীয় আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ ও এর দেশীয় মুজিবী দুঃশাসনের রক্তাক্ত অবসানের মধ্য দিয়ে। জিয়া যখন ১৫ আগস্টের সামরিক অভিযানের সমুদয় সুফল ভোগ করেও ১৫ আগস্টকে কার্যত উপেক্ষা করেছিলেন, তার পুত্র তারেক রহমানকেও দেখা যাচ্ছে চব্বিশের সাধারণ ছাত্র-জনতা, সিপাহি এবং বিশেষ করে ইসলামপন্থীদের নেতৃত্বে পরিচালিত জগৎকাঁপানো মহাবিদ্রোহের মূল সুবিধাভোগী হয়েও সেই বর্ষা বিপ্লবের মর্মবাণী থেকে সরে গিয়েছেন। তার অগ্রাধিকার তালিকায় এখন প্রথম এজেন্ডা হলো পতিত স্বৈরাচারের পুনঃপ্রত্যাবর্তনের সর্বনাশা ভাবনা। যে চিন্তাটি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির জন্য অনিবার্যভাবে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে এবং আখেরে হবেও।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



