শিক্ষকদের খণ্ডিত বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য সমস্যার অবসান

শিক্ষাবিষয়ক নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকদের ক্লাস বাদ দিয়ে রাস্তায় আন্দোলন দেশ ও জাতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

ফিরোজ আলম

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস পরিচালিত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ-২০২৪’ বলছে, দেশের ৯৭ শতাংশ অর্থাৎ- মোট ৯২ হাজার ৩৯২টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৬ হাজার ১০৪টি এমপিওভুক্ত। অথচ এদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক না বলে, বলা হয় বেসরকারি শিক্ষক।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এখন প্রাপ্তি অনেক। বিগত ২৫ বছরে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের চেষ্টার ক্রমাগত ফল এটি। বাংলাদেশ মাদরাসা জেনারেল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন-বিএমজিটিএ, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট, মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ, বিটিএ, বাসিস, শিক্ষক ইউনিয়ন, জাতীয়করণ-প্রত্যাশী জোট ও আদর্শ শিক্ষক পরিষদসহ অন্যান্য শিক্ষক সংগঠনের দীর্ঘ চেষ্টার ফলে যা হয়েছে তা হলো :

মাদরাসার জনবলকাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় অধিকাংশ বৈষম্য দূর হওয়া, এইচএসসি, কলেজ বা আলিম মাদরাসায় জ্যেষ্ঠ প্রভাষক পদ বিলুপ্ত করে সহকারী অধ্যাপক পদ বহাল থাকা, প্রভাষকদের আট বছর চাকরিকাল পূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে অনুপাত প্রথার ৫:২ বাতিল করে ১:১ এ সহকারী অধ্যাপক পদ নিশ্চিত করা, বার্ষিক ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট হওয়া, ২০ শতাংশ বৈশাখী ভাতা হওয়া, সম্প্রতি ৫ শতাংশ প্রণোদনা হওয়া, অতীতের তুলনায় শিক্ষা খাতে বাজেটে আনুপাতিক হারে এবং টাকার অঙ্কে বাজেট বৃদ্ধিকরণ, ব্যবস্থাপনা কমিটির হাতে তথাকথিত নিয়োগের পরিবর্তে এনটিআরসিএর মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দান করা, বিষয়-ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দান করা, অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবস্থাকরণ, শিক্ষার্থীদের হাতে ট্যাব প্রদান, দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের উপবৃত্তি ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, বিনামূল্যে মানসম্মত বই প্রদান, আইসিটি শিক্ষা উপকরণ প্রদান, সহকারী শিক্ষকদের অষ্টম গ্রেডসহ (কাজ চলমান) নানাবিধ অসাধারণ ব্যবস্থা গ্রহণ হওয়া, যা শিক্ষাক্ষেত্রে একটি মাইলফলক নিঃসন্দেহে।

এসবের মধ্যে শিক্ষকদের বঞ্চনার ইতিহাসও কম নয়। যেমন- সরকারি নিয়মে শতভাগ উৎসব ভাতা, বিনোদন ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি না হওয়া, গত ১০ বছরে একটি পে-স্কেল ও মহার্ঘ ভাতা না হওয়া, সহকারী শিক্ষকদের অষ্টম গ্রেড ও ইএফটির মাধ্যমে মাসের ১ তারিখে বেতন না হওয়া, সরকার বেতন দেয়ার পরও শিক্ষকদের নামের আগে বেসরকারি লেখা বাদ না দেয়া, সব শিক্ষক জীবনে দু’বার পদোন্নতি পেলেও প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়া শিক্ষকদের জীবনে মাত্র একবার পদোন্নতি পাওয়া, সহকারী অধ্যাপক থেকে যোগ্যতাভিত্তিক সহযোগী অধ্যাপকে পদোন্নতি না দেয়া, বিশেষায়িত নাম দিয়ে মাদরাসার জেনারেল শিক্ষকদের প্রশাসনিক পদে পদোন্নতি কিংবা সম-স্কেলে পদোন্নতি না দেয়া ইত্যাদি।

শিক্ষকদের ওই আক্ষেপগুলো শুধু গত ক’মাস ধরে প্রেস ক্লাবে সংঘটিত দাবির প্রেক্ষাপটে নয়; বরং বিগত ২৫ বছর ধরে সব শিক্ষক সংগঠনের প্রাণের দাবি ছিল। সে জন্য সব শিক্ষক সংগঠন বিগত ২৫ বছরে অগণিত সেমিনার, মানববন্ধন, আলোচনা সভা, প্রেস ক্লাবের সামনে কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। সে কারণে আজ মেধাবী অনেকে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। অথচ আগে এ পেশার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। এর প্রমাণ, ২০২৩ সালে সেন্টার ফর এডুকেশনাল রিসার্চ নামের একটি শিক্ষা গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানের ৩৫৫ জন অভিভাবকের এক জরিপে জানা যায়, ৬৫ শতাংশ বাবা-মা এবং তাদের সন্তানরা চান না শিক্ষকতা পেশায় যেতে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগের ইচ্ছা চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা বিসিএস ক্যাডারের দিকে। সরকারের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত না করা এর কারণ।

এখন মেধাবীরা শিক্ষকতায় কিছুটা আগ্রহী হচ্ছেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের বেপরোয়া সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের হতাশার মাত্রা বাড়াচ্ছে। বর্তমান অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য শিক্ষকদের হতাশা আরো বাড়িয়েছে। তিনি বলেছেন, লোকজন সবসময় বলে- এটি দেন, সেটি দেন; কিন্তু সরকারের রাজস্ব আদায় খুব কম। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত খুব কম, মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের আয় কমের অজুহাত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয় কমের অজুহাতে শিক্ষকদের দাবি সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া ও জাতীয়করণের স্বপ্ন আজও অধরা।

অবসরের ছয় মাসের মধ্যে অবসর-কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা শিক্ষকদের দিতে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় থাকলেও তোয়াক্কা করছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অবসরসুবিধা বোর্ডের ৪৫ হাজার আবেদনের জন্য প্রয়োজন পাঁচ হাজার কোটি টাকা ও কল্যাণ সুবিধার ৪২ হাজার ৬০০টি আবেদন নিষ্পন্নে তিন হাজার ৯৩০ কোটি টাকা অর্থাৎ- মোট ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ না দেয়ায় নিজের জমানো অবসর-কল্যাণ বোর্ডের টাকা তুলতে পারছেন না অবসর ফান্ডের ৪৫ হাজার ও কল্যাণ ট্রাস্টের ৪৩ হাজার মোট এ দেশের অবসরপ্রাপ্ত ৮৮ হাজার শিক্ষক।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় সুপ্রিম কোর্টের এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষকদের ভোগান্তি বাড়াতে বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবেলা করার প্রস্তুতির নামে সময় ক্ষেপণের পদক্ষেপ নিচ্ছে মন্ত্রণালয়। ২০২৫ সাল শেষ হতে যাচ্ছে, অথচ শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অবসরসুবিধা ২০২১ সাল পর্যন্ত আবেদন খারিজ করা হচ্ছে। অন্য দিকে শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট ২০২২ সালের আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করছে। ৯ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে সরকার বন্ড হিসেবে দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও এ থেকে শিগগির তেমন সুফল আশাই করা যায় না। কারণ অবসর বোর্ডের জন্য বছরে প্রয়োজন হয় এক হাজার ৩৮০ কোটি টাকা; কিন্তু আয় হয় ৮৭৬ কোটি টাকা। এতে বছরে ঘাটতি থাকে ৫০৪ কোটি টাকা।

কল্যাণ ট্রাস্টের ৪ শতাংশ হারে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে আয় আসে ৫০ কোটি টাকা। এফডিআরের লভ্যাংশ থেকে আয় হয় দুই কোটি টাকা। প্রতি মাসে ঘাটতি থাকে ১৩ কোটি টাকা। বছরে ১৬৯ কোটি টাকা।

শ্রীলঙ্কায় ৯০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় অর্থে চলে। অন্য দিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক উন্নতমানের এবং শিক্ষকদের বেতন সরকারির চেয়ে অনেক বেশি। অথচ এ দেশে শিক্ষকদের বেলায় আয় কমের অজুহাত। এমতাবস্থায় শিক্ষকদের ক্ষোভ বেড়ে চলেছে।

মাদরাসার ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো প্রকট। মাদরাসাশিক্ষকদের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র মাত্র একটি। তা হলো মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র-বিএমটিটিআই। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তথ্যমতে, এখানে একজন শিক্ষক একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ফের প্রশিক্ষণ নিতে হলে কমপক্ষে ৩৮ বছর সময় লাগতে পারে। অথচ এ ৩৮ বছরে সিলেবাস বা শিক্ষাপদ্ধতি কয়েকবার পরিবর্তন হতে পারে। কী ভয়াবহ সমস্যা। ফলে মানসম্মত চাকরি উপযোগী শিক্ষার্থী এখানে তেমন হারে গড়ে উঠছে না।

ব্র্যাকের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ফাজিল-কামিল সম্পন্নকারীদের মাত্র ৩২ শতাংশ জানিয়েছেন, কর্মক্ষেত্রে তারা তাদের অ্যাকাডেমিক শিক্ষাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পেরেছেন। ৪২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের অ্যাকাডেমিক শিক্ষা কর্মক্ষেত্রে কিছুটা কাজে লেগেছে আর ২৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের কর্মক্ষেত্রে অ্যাকাডেমিক শিক্ষা কাজে লাগেনি। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-বিআইজিডির তথ্যে দেখা গেছে, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি করেন মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মাত্র ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

অন্য দিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবি বাড়িভাড়ার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে কথার ফুলঝুরিতে শুধু করুণা দেখায়। যেমন- অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথা সবাই বলছে; কিন্তু সরকারের কাছে অর্থ কোথায়। শিক্ষকরা কত টাকা বেতন পান; ভুখা পেটে আর কতদিন পড়াবেন তারা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, শিক্ষকদের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া দিতে সরকারের বার্ষিক প্রয়োজন দুই হাজার ২৬৭ কোটি টাকা। তা দিতে সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের যত সব লেম এক্সকিউজ। অবিলম্বে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেসরকারির ‘বে’ বাদ দেয়া, সরকারি নিয়মে বাড়ি, এমপিওভুক্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণসহ অন্যান্য সমস্যার সমাধান জরুরি বৈকি। শিক্ষাবিষয়ক নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষকদের ক্লাস বাদ দিয়ে রাস্তায় আন্দোলন দেশ ও জাতির জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ নয়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, আয়েশা রা: মহিলা কামিল মাদরাসা, সদর, ল²ীপুর ও মহাসচিব- কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, বিএমজিটিএ।