প্রফেসর কর্নেল ডা: জেহাদ খান (অব:)
মহান আল্লাহ আমাদের শরীরে বেশির ভাগ অঙ্গ একজোড়া করে সৃষ্টি করেছেন। যেমন- দুই চোখ, কান, হাত, পা, ফুসফুস, কিডনি, ডিম্বাশয়, অণ্ডকোষ ইত্যাদি। একটি নষ্ট হয়ে গেলে আরেকটি দিয়ে মোটামুটি কাজ চলে। আর একটি করে অঙ্গ হচ্ছে হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ (লিভার), প্লিহা (স্পিন) ও জরায়ু ইত্যাদি। কোনো কোনো রোগের চিকিৎসায় জীবন বাঁচাতে জরায়ু ও প্লিহা ফেলে দিতে হয়। অর্থাৎ- এ দুটো অঙ্গ ছাড়াও মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব। যকৃৎ হচ্ছে এমন একটি অঙ্গ, যার ৮০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেলেও বাকি ২০ শতাংশ থেকে আবার কিছু দিনের মধ্যে পূর্ণ যকৃৎ তৈরি হয়ে যায়। হৃৎপিণ্ড হচ্ছে সব দিক থেকে ব্যতিক্রম। এর সামান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর ঠিক করা সম্ভব হয় না। হৃদরোগে পৃথিবীর অনেক দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে থাকেন। অন্য কোনো অঙ্গ রোগাক্রান্ত হলে এত দ্রুত মানুষ মৃত্যুবরণ করেন না। যেমন- হৃদরোগের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী হার্টঅ্যাটাক হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বা এক ঘণ্টার মধ্যে মারা যান। কাজেই এ হৃৎপিণ্ডের যতেœর ব্যাপারে আমাদের মনোযোগী হওয়া দরকার। হৃৎপিণ্ড যেমন অনেক মূল্যবান, এর চিকিৎসাও তেমনি ব্যয়বহুল। অথচ আমরা স্বল্প খরচে হৃদরোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারি, যা পরে আলোচনা করছি।
হৃৎপিণ্ড নিয়ে মানুষের ভাবনার অন্ত নেই। ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে হৃৎপিণ্ডের গোলাকৃতি একটি ছবি আঁকা হয়। আসলে এটি হচ্ছে একটি গরুর হৃৎপিণ্ড, যার সামান্য ভালোবাসা আছে (গাভীর স্বল্পকালীন মাতৃস্নেহ ব্যতীত)। মানুষের হৃৎপিণ্ড হচ্ছে পিরামিড আকৃতির, যার চূড়া নিচের দিকে থাকে। মহান আল্লাহ এটি এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন, যা সারাজীবন অনবরত কাজ করে চলেছে। এর থেমে যাওয়া মানে জীবন থেমে যাওয়া। ‘আকাশসমূহ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহর। তিনি যা চান সৃষ্টি করেন।’ (আল কুরআন-৪২ : ৪৯)
প্রাণী জগতে তিনি যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে হৃৎপিণ্ড সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী তিমির হৃৎপিণ্ড মিনিটে চলে মাত্র আটবার। এ রকম হলে মানুষের পক্ষে বাঁচা সম্ভব নয়। অক্টোপাসকে একটি নির্দয় প্রাণী হিসেবে মনে করা হয়; অথচ এর রয়েছে তিনটি হার্ট এবং সে সন্তানের জন্য জীবন উৎসর্গ করে থাকে। কাঠবিড়ালি সারাক্ষণ দৌড়ঝাঁপ করে থাকে; অথচ বাঁচে মাত্র ৫-১০ বছর। আর কচ্ছপ বসে থেকে বাঁচে প্রায় ৩০০ বছর। এই হচ্ছে স্রষ্টার সৃষ্টিনৈপুণ্য। সেই তুলনায় মানুষের জ্ঞান খুব সীমিত। ‘তোমাদের খুব কম জ্ঞান দান করা হয়েছে’। (আল-কুরআন ১৭ : ৮৫)
মানুষের হৃৎপিণ্ডে ফিরে আসি। হৃৎপিণ্ডের রয়েছে প্রধানত পাঁচ ধরনের রোগ : ১. জন্মগত রোগ; ২. হৃৎপিণ্ডের ভাল্বের রোগ; ৩. হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশির রোগ; ৪. হৃৎকম্পনজনিত রোগ; ৫. হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির রোগ। এর মধ্যে রক্তনালির রোগ সবচেয়ে বেশি মারাত্মক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ৭৯ লাখ লোক রক্তনালির হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করে থাকেন, যা সব মৃত্যুর মধ্যে ৩১ শতাংশ। হৃৎপিণ্ডের তিনটি বড় রক্তনালি আছে। এ রক্তনালিগুলোর কোনো একটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে হার্টঅ্যাটাক হয়। এ রোগ হওয়ার জন্য প্রধানত উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি দায়ী। তা ছাড়া অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মদ, মেদ, স্ট্রেসফুল লাইফ, প্রতিযোগিতামূলক জীবনপদ্ধতি ইত্যাদি হৃদরোগের ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে দায়ী।
আগেই উল্লেখ করেছি, হৃদরোগের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল, যা গরিব মানুষের পক্ষে বহন করা সম্ভব হয় না বলে তারা চিকিৎসার অভাবে মারা যান। কাজেই আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে রোগ প্রতিরোধ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ আমাদের মহামূল্যবান হৃৎপিণ্ড দিয়েছেন। এটি সংরক্ষণে তিনি কী নির্দেশিকা পাঠিয়েছেন জানা যাক। আল-কুরআন ও হাদিস থেকে জানা যায়, আমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:-এর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করতে পারি তাহলে হৃদরোগ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ ধূমপান করে থাকেন। মহান আল্লাহ বলেন- ‘নিজ হাতে নিজেদের ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।’ (আল-কুরআন-২ : ১৯৫) ‘আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না।’ (আল-কুরআন-৪:২৯) মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের এ আয়াতগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে চার শতাধিক ফতোয়া রয়েছে যে, ধূমপান হারাম। ২৫ শতাংশ হৃদরোগ ধূমপান, জর্দা, গুলের কারণে হয়ে থাকে। কাজেই কুরআনের এ মূলনীতি অনুসরণ করে আমরা যদি ওই বিষাক্ত বস্তু বর্জন করতে পারি তাহলে হৃদরোগ অনেক কমে যাবে।
‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের ভুলিয়ে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরের সাক্ষাৎ করবে।’ (আল-কুরআন-১০২ : ১-২) ‘তারা (মুমিনরা) পৃথিবীতে প্রতিপত্তি চায় না।’ (আল-কুরআন-২৮ : ৮৩) গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের মানুষের তুলনায় শহরের মানুষের মধ্যে উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের প্রকোপ বেশি। শহরের মানুষের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির লড়াই, অধিক ধনসম্পদের মোহ, স্ট্রেস, ডিপ্রেশন ইত্যাদি গ্রামের মানুষের তুলনায় বেশি। কাজেই আমরা যদি সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে সহজ-সরল নিরহঙ্কার জীবনযাপন করতে পারি, তাহলে এ শহুরে রোগগুলো হওয়ার প্রবণতা কমে যাবে। রাসূল সা: আমাদের পাকস্থলীর তিন ভাগের এক ভাগ খাবার দিয়ে পূর্ণ করতে বলেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কম আহার করলে হৃদরোগসহ কিছু রোগ কম হয়ে থাকে। কুরআনে বেহেশতের খাবার হিসেবে ফল, পাখির গোশত ইত্যাদির উল্লেখ করা হয়েছে। বনি ইসরাইলকে ৪০ বছর সালওয়া নামের পাখির গোশত খেতে হয়েছে। সূরা কাহাফ থেকে জানা যায়, মুসা আ:-এর শিক্ষাসফরে পাথেয় ছিল ভাজা মাছ। গবেষণায় দেখা গেছে, যে অঞ্চলের মানুষ মুরগি, মাছ, ফল, সবজি (সেডিটেরিয়ান ডাইট) খেয়ে থাকেন তাদের হৃদরোগ কম হয়। রোজা হৃদরোগ প্রতিরোধের অন্যতম মাধ্যম।
হৃদরোগ প্রতিরোধে তেল, ঝাল ও চর্বিবিহীন নানা রকম ডায়েটের পরামর্শ দেয়া হয়। অথচ প্রমাণিত যে, লিভার আমাদের রক্তের চর্বি ৮০ শতাংশ তৈরি করে। মাত্র ২০ শতাংশ চর্বি আসে খাবার থেকে। অর্থাৎ- এ রকম কড়া ডায়েটের গুরুত্ব অনেক কম। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখা, কার লিভার বেশি চর্বি তৈরি করছে, বিশেষ করে ৪০ বছর পর থেকে। রাসূল সা: সব ধরনের খাবার খেতেন; কিন্তু কম পরিমাণে। গোশত ও শাকসবজি খাওয়ার মানুষের দুই রকমের দাঁত রয়েছে। গরুর আছে শুধু ঘাস খাওয়ার জন্য দাঁত। আর বাঘ, সিংহ ইত্যাদির আছে শুধু গোশত খাওয়ার জন্য দাঁত। তাতেও বোঝা যায়, মহান আল্লাহ আমাদের সব ধরনের খাবার খাওয়ার জন্য সৃষ্টি করেছেন।
রাসূল সা: বলেছেন, কেউ যদি না জেনে চিকিৎসা করে, তবে সে-ই দায়ী হবে (ভুল চিকিৎসার জন্য)। (আবু দাউদ-৪৫৮৬-৮৭) সুতরাং, হৃদরোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ রোগের চিকিৎসায় বিশেষ করে রিং বসানো, বাইপাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথেষ্ট জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে চিকিৎসা দিতে হবে। অন্যথায় ভুল চিকিৎসার দায় ডাক্তারের। মানসিক অস্থিরতা, ডিপ্রেশন, স্ট্রেস, পারিবারিক অশান্তি, অনিদ্রা ইত্যাদি হৃদরোগের প্রকোপ বৃদ্ধি করতে পারে। একজন মুসলিমের মানসিক প্রশান্তি আনার জন্য আল্লাহর বিধান যথেষ্ট। ‘জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর স্মরণ দ্বারা অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (আল-কুরআন-১৩ : ২৮)
উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে জানা গেল, অসীম জ্ঞানের অধিকারী মহান আল্লাহ মানুষের জীবনযাপনের জন্য যে সুন্দর বিধান দিয়েছেন; তা যেমন আমাদের যেকোনো সমস্যার সুন্দর সমাধান করতে পারে, তেমনি হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য তা একইভাবে কার্যকর।
লেখক : সাবেক অধ্যাপক, কার্ডিওলজি বিভাগ, সিএমএইচ, ঢাকা। হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ইবনে সিনা স্পেশালাইজড হাসপাতাল, ধানমন্ডি



