প্রসঙ্গ ভূমিকম্প

ভূমিকম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতিরাধ করা যায় না। তবে এর মোকাবেলায় নগরায়ন পরিকল্পনা, গৃহায়ন দ্রব্যাদির ব্যবহার, নির্বিঘ্নে উদ্ধারকাজ চালানোর প্রস্তুতি এর ক্ষয়ক্ষতি সীমিত করতে পারে। এর প্রমাণ জাপান-তাইওয়ানের মতো দেশ। যেখানে কেবল পরিকল্পিত নগরায়ন ও গৃহায়ন দ্রব্যাদির নিয়ন্ত্রিত এবং পরিকল্পিত ব্যবহার ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি নামিয়ে এনেছে সহনীয় পর্যায়ে। ২০২৩ সালে জাতিসঙ্ঘের আবাসিক তত্ত্বাবধানে কার্যালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ‘ভূমিকম্পে দুর্বলতা এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, দেশের বেশির ভাগ ভবনের নকশা ও নির্মাণকৌশল ভূমিকম্প প্রতিরোধক নয়। মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। এজন্য মূলত দায়ী নকশা অনুমোদনকারী সংস্থা। তাদের ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির প্রবণতা গোটা দেশকে অস্তিত্বসঙ্কটে ফেলেছে

‘পৃথিবী যখন প্রবলভাবে প্রকম্পিত হবে এবং মানুষ বলবে এর কী হলো!’ (৯১-১-৩) এর বাস্তব রূপ দেখা গেল ২১ নভেম্বর ২০২৫। হঠাৎ করেই কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেল সমগ্র দেশের চলমান জীবনের স্বাভাবিক গতি। আতঙ্কে দিশেহারা মানুষ, কেউ ছুটছে বাড়ির বাইরে, রাস্তায়, উঁচুতলা থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে কেউ ভাঙল হাত-পা। চোখের পলকেই ঘটে গেল অভাবিত ঘটনা। পরদিন আগের দিনের স্থবির বিমূঢ়ভাব কেটে ওঠার আগেই সকালে ও বিকালে আবারো ভূকম্পন। ২৩ নভেম্বর রংপুরে আচমকা কেঁপে উঠল বাড়িঘর। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের ভূমি কেঁপে উঠল চার চার বার। মানুষ হতবিহ্বল। এর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল যখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হলো। এর ওপর আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করল সামাজিক প্রচার মাধ্যমগুলো। বিভিন্ন টেলিভিশনে বিজ্ঞজনের আলোচনা এবং মূল্যবান জ্ঞান বিতরণের চিত্র সারা দেশে একটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করল। ভূমিকম্পের আফটার শক্-এর পরিবর্তে সারা দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা সবার মধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। সবার প্রশ্ন, এরপর কী? বিজ্ঞজনের আলোচনায় উঠে আসা ‘৮ মাত্রার ভূমিকম্প-এই এলো বলে’ মানুষের মনে আতঙ্ক ও ভয় ছড়াতে ত্বরিত ভূমিকা পালন করল সামাজিক প্রচারমাধ্যম।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। বেপরোয়াভাবে প্রকৃতির ওপর অত্যাচার, নির্বিচার বনভূমি ধ্বংস, জলাধার ভরাট, নদীর নাব্য হারানোর সাথে সাথে নদী দখল-দূষণ, ইটভাটার সীমাহীন দূষণ, কার্বন নিঃসরণ সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ ও প্রকৃতি এখন বিস্ফোরণোন্মুখ। অন্যদিকে ভূ-তাত্তি¡ক গঠন ও অবস্থান বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক দুর্ঘটনাপ্রবণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। যেজন্য বাংলাদেশের নগরায়ন পরিকল্পনা বেশ জটিল। অপরিকল্পিত নগরায়ন দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধারকার্যক্রম দুঃসাধ্য করে তুলছে। এর প্রমাণ কিছুদিন আগের মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডি। যেখান থেকে আহত ও নিহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। এতে অনেককেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেয়া যায়নি। অবস্থার কোনো পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধারকার্যক্রম যে প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে তার প্রমাণ নিকট অতীতের নিমতলী, পুরাতন ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন, ফুলবাড়িয়ার হকার্স মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনার পর উদ্ধারপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে দমকলের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতে সময় লেগেছিল অনেক। দুর্ঘটনাজনিত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায় অনুমানের বাইরে। দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়ার মতো প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী বাহিনীর বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতিও প্রকট।

জাতীয় অধ্যাপক মরহুম জামিলুর রেজা চৌধুরী ছিলেন জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি কমিটির প্রধান। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগপ্রস্তুতি প্রায় শূন্যের কোঠায়। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির উদ্ধারকাজে নিয়োজিত সেনাবাহিনীর উদ্ধারকর্মীদের জন্য তৎকালীন সাভার এরিয়া কমান্ডার সাধারণ জনগণের কাছে ড্রিল মেশিন চেয়েছিলেন। ফুলবাড়িয়া হকার্স মার্কেট অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ও উদ্ধারকর্মীরা সবার প্রতি যার যতটুকু সম্ভব পানি নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পেছনে কারণ ছিল দুর্ঘটনা মোকাবেলার সামান্যতম ব্যবস্থা ছাড়াই কেমিক্যাল গুদামজাতকরণ। কর্তৃপক্ষের নজরদারির দুর্বলতা তো আছেই। বেইলি রোডের রেস্টুরেন্টের অগ্নিকাণ্ড এর বড় প্রমাণ। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেন, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপান, মিডিয়ায় উপস্থিত হন অনেক পণ্ডিত ব্যক্তি উপদেশের অমিয়বার্তা নিয়ে। কিছু দিন হইচই চলে। তারপর সব চুপচাপ। জীবন চলে আগের ছন্দে।

ভূমিকম্প প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতিরাধ করা যায় না। তবে এর মোকাবেলায় নগরায়ন পরিকল্পনা, গৃহায়ন দ্রব্যাদির ব্যবহার, নির্বিঘ্নে উদ্ধারকাজ চালানোর প্রস্তুতি এর ক্ষয়ক্ষতি সীমিত করতে পারে। এর প্রমাণ জাপান-তাইওয়ানের মতো দেশ। যেখানে কেবল পরিকল্পিত নগরায়ন ও গৃহায়ন দ্রব্যাদির নিয়ন্ত্রিত এবং পরিকল্পিত ব্যবহার ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি নামিয়ে এনেছে সহনীয় পর্যায়ে। ২০২৩ সালে জাতিসঙ্ঘের আবাসিক তত্ত্বাবধান কার্যালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ‘ভূমিকম্পে দুর্বলতা এবং পদ্ধতিগত ঝুঁকি মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, দেশের বেশির ভাগ ভবনের নকশা ও নির্মাণকৌশল ভূমিকম্প প্রতিরোধক নয়। মানা হয়নি বিল্ডিং কোড। এজন্য মূলত দায়ী নকশা অনুমোদনকারী সংস্থা। তাদের ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির প্রবণতা গোটা দেশকে অস্তিত্বসঙ্কটে ফেলেছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় সারা দেশে রয়েছে ২০০ জনের একটি টিম। শুধু ঢাকা শহরের জন্যই যা অপ্রতুল। উদ্ধার সরঞ্জামের স্বল্পতাও সঙ্কট বাড়িয়ে দেবে নিঃসন্দেহে। এমতাবস্থায় শুধু ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্তকরণ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নয়। এক্ষেত্রে প্রয়োজন প্রতিটি বাড়িতে প্রতিরোধমূলক প্রস্তুতি। এজন্য প্রতিটি টিভি চ্যানেলে ভূমিকম্পকালে এবং পরবর্তীতে করণীয় শীর্ষক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। এটি দৈনিক ৩-৪ বার প্রচার করার ব্যবস্থা নেয়া। ভূমিকম্প নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর মতো অনুষ্ঠান ও বক্তব্য প্রচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা। এতে মানসিক অস্থিরতাজনিত রোগের বিস্তৃতি ঘটতে পারে। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর পরামর্শ সম্পর্কিত অনুশীলন অবিলম্বে চালু করা দরকার। মোটকথা ভূমিকম্পকালীন নিরাপত্তা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতার প্রয়োজন এখন সর্বাধিক। আতঙ্ক নয়, সাবধানতার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতি ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি সীমিত করতে পারে। এজন্য জাতীয় দুর্যোগ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরকে ত্বরিত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]