‘এবারের নির্বাচনটা আমাদের লড়াইয়ের একটা অংশ’

হাদি বলতেন, বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে গিয়ে কোনো বিপ্লবী হত্যার শিকার হলে তার বিচার হতে হবে। বিচার না হলে নতুন বিপ্লবী জন্মাবে না।

ড. মোজাফফর হোসেন

নজিরবিহীনভাবে মানুষ জমায়েত হয়েছিলেন শরিফ ওসমান হাদির জানাজায়। জানাজা শেষে সমবেত জনতা দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘দিল্লি নয় ঢাকা; গোলামি নয় আজাদি; ক্ষমতা নয় জনতা; আপস নয় সংগ্রাম; মুজিববাদ মুর্দাবাদ; ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। এ স্লোগানগুলো অসংখ্যবার ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়েছে ওসমান হাদির কণ্ঠে। জানাজার নামাজে জনসমুদ্রে এক সাথে এমন বজ্রকঠিন উচ্চারণ এর আগে এই ভূখণ্ডে আগে কখনো দেখা গেছে বলে আমাদের জানা নেই। নিসন্দেহে সমবেত এ উচ্চারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতি সংস্কারের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হাদির দেখানো পথে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। ওসমান হাদি নিজে ছিলেন সেই সংস্কারের সম্মুখ সারির একজন যোদ্ধা; স্বপ্ন বাস্তবায়নের অগ্রসেনানী।

ওসমান হাদির জানাজায় এত মানুষ সমবেত হলেন কেনো? কী ছিল তার মর্মার্থ? বড় একটি রাজনৈতিক দলের ব্যঙ্গোক্তিতে হাদি ছিলেন নিছক ‘বাচ্চা মানুষ’। এই বাচ্চা মানুষ কিভাবে বাংলাদেশ নাড়িয়ে দিলেন? কোন যোগ্যতা বলে সারা দেশের মানুষকে কাঁদিয়ে গেলেন? আসলে ওসমান হাদি ছিলেন নিপীড়কদের জানি দুশমন; জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। তিনি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কাজে সংগ্রাম করেছেন। সেই সংগ্রামের প্রতি সমাগত মানুষেরও ন্যূনতম মৌন সমর্থন না থাকলে এত লোক জানাজায় সমবেত হতেন না। কাজেই সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পথটা হচ্ছে দ্বীনের পথ বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের রাস্তা। এ বিশ্বাস নিয়ে মানুষ ওসমান হাদির জানাজায় দলে দলে যোগ দেন। বিপুল এ জনগোষ্ঠী রয়েছে এই মনস্তত্তে¡র সাথেও। এ মনস্তত্তে¡ ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ সামনে অগ্রসর হচ্ছে।

ওসমনা হাদি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ধারণ করেছেন। ব্রিটিশ আধিপত্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যে পথ কবি নজরুল তৈরি করেছিলেন; বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্যে ওসমান হাদি সেই পথে হেঁটেছেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদ, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও শোষণকে সমূলে উৎপাটনের লক্ষ্যে ওসমান হাদির জবান ছিল খুব স্পষ্ট। তিনি বাংলাদেশকেন্দ্রিক বয়ান উৎপাদন করতে চেয়েছেন। তাই তো বলেছেন, ‘আমাদের ইচ্ছা ছিল আমরা একটি রোল মডেল তৈরি করতে চাই বাংলাদেশের রাজনীতিতে। মানে, যে ঐতিহাসিক জুলাই হলো, এটি ঘিরে নতুন করে কিছু শুরু করা; যেটি আগে হয়নি; যেটি মানুষ পছন্দ করে। আমরা খুব সাহস নিয়ে শুরু করলাম। নিঃসঙ্গ লড়াই ছিল;কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, নিঃসঙ্গ লড়াই এখন এত, আল্লাহ এর সাথে এত মানুষ জোগার করে দিয়েছেন’। ওসমান হাদির সংগ্রামের পথ মসৃণ ছিল না। তাকে চলতে হয়েছে ভারতীয় হেজিমনির বিপরীতে। আওয়ামী লীগ ছাড়াও বাংলাদেশে আরো অনেক রাজনৈতিক দল ওসমান হাদির এ পথচলাকে পছন্দ করতে পারেনি। কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি।

ওসমান হাদি বাংলাদেশের নির্বাচন পদ্ধতির একটি সংস্কার চেয়েছেন। এখানে নির্বাচনে শক্তি দেখিয়ে প্রচারের মাঠ দখলে রাখতে চান ভোটপ্রার্থীরা। টাকার বিনিময়ে ভোট কেনেন। পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে ফেলেন মাঠ-ঘাট। মানুষ ও যানবাহন চলাচলের রাস্তা-ঘাটে দলীয় নেতাকর্মীরা সমাবেশ ডাকেন। যেখানে চলে অন্তঃসারশূন্য বক্তৃতা। উচ্চ শব্দে মাইক দিয়ে জন-অশান্তি বাড়িয়ে তোলে সম্ভাব্য সংসদ সদস্যদের চেলারা। এর নাম দেয়া হয়েছে নির্বাচনী আমেজ। এ বিরক্তিকর উৎপাতকে কেউ উৎসব নামে ডাকেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এ যে পদ্ধতি, যুগের পর যুগ চলে আসছে। এর পরিবর্তন দরকার। এই সংস্কার এমনি এমনি আসবে না। এর জন্য একটি লড়াই দরকার। সে জন্য ওসমান হাদি নিজে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন, কীভাবে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা করতে হয়; ভোট সংগ্রহ করতে হয়। হাদি বলেছেন, নির্বাচনে জিততে হবে এমন মানসিকতা তিনি লালন করেন না। তবে নির্বচনে অংশগ্রহণটা যেন মার্জিত হয় তার জন্য তার সংগ্রাম। তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনটা আমাদের লড়াইয়ের একটা অংশ’।

বাংলাদেশপন্থী মানুষ বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান দীর্ঘদিন কালচারালি ভারতীয় হেজিমনির শিকার হয়েছেন। ফলে বাঙালি মুসলমান যুবকদের যে মানসপট তৈরি হয়েছে সেটি ভেঙে নতুন করে গড়তে না পারলে আখেরে ভারতের পরমাত্মীয় আওয়ামী লীগের আধিপত্য অটুট থাকবে। এ বাস্তবতা আঁচ করতে পেরে ওসমান হাদি বলেছিলেন, ‘আমরা বলেছি বাংলাদেশে যতক্ষণ না পর্যন্তু একটি বাংলাদেশপন্থী সাংস্কৃতিক বিপ্লব হবে; ততদিন আমাদের প্রকৃত মুক্তি আসবে না। এই যে সবাই বলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নেই, আমি এটি বিশ্বাস করি না। এখন পর্যন্তু আওয়ামী লীগই ক্ষমতায়- কালচারালি; মানে রাজনৈতিক ক্ষমতার জায়গা থেকে হয়তো এর উপরের স্তরটা নেই; কিন্তু যে ন্যারিটিভ, যে এস্টাবলিশমেন্ট, যে ভাবনা, যে চিন্তাকাঠামোর পুরোটাই আওয়ামী লীগের তৈরি রাজনীতির ওপরে দেশ চলছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশে যত দল আছে- বিএনপি বলেন, জামায়াতে ইসলামী বলেন, তারা কিন্তু শুধু আগের আলোচনাগুলোর ওপরে রিঅ্যাকশন দিচ্ছে। আমরা কি নতুন করে কোনো কালচারাল এস্টাবলিশমেন্ট বা চিন্তা, মনস্তত্ত¡ তৈরি করতে পারছি? আওয়ামী লীগের ১০০টি লেয়ার ছিল বেনামে, এ সাংস্কৃতিক হেজিমনি তৈরি করতে, যে তার মনস্তত্ত¡ তৈরি করে দেবে। যে ছেলেটা প্রচুর অ্যান্টি আওয়ামী লীগ হবে; সেই ছেলেটিও দিন শেষে যে পলিটিক্যাল অ্যান্ড কালচারাল ইনপুটটা দেবে, সেটি কিন্তু আওয়ামী লীগের ঘরে যাবে’। হাদির এ বক্তব্য পরিষ্কার। সংগ্রাম সময় নিয়ে করে যেতে হবে। এ জন্য হাদি পলিটিক্যাল অ্যান্ড কালচারালি বাংলাদেশপন্থী ন্যারেটিভ তৈরির কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এ লড়াইয়ে শক্তি প্রয়োগের ব্যাপার নেই। জয়ী হতে হলে ইন্টেলেকচুয়ালি কালচারাল কনটেস্ট চালাতে হবে।

মৃত্যু নিয়ে ওসমান হাদির দৃষ্টিভঙ্গি কুরআনিক। মৃত্যু হচ্ছে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের সেতু। কবি আল মাহমুদ মৃত্যুকে ঈদের মতো আনন্দের মনে করেছেন। ‘স্মৃতির মেঘলা ভোরে’ কবিতায় আল মাহমুদ বলেন, ‘কোনো এক ভোর বেলা রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ; অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো-অন্ধকারে ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’

কিন্তু আমরা বেশির ভাগ মানুষ মৃত্যকে ভয় পাই। ওসমান হাদি মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুকে মহিমান্বিত করতে হয়। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ভেতরে থেকে যে মৃত্য, সেই মৃত্যু শ্রেষ্ঠ মৃত্যু। হাদি বলতেন ‘রাজনীতিবিদদের মৃত্যু বাসায় হতে পারে না, এটি কোনো ভালো মৃত্যু না; যিনি রাজনীতি করেন, যিনি সংগ্রামী, তার মৃত্যু হবে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজপথে।’

সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেমে মৃত্যুভয় থাকলে সংগ্রামে সফল হওয়া যায় না। কী আশ্চর্য! ওসমান হাদির বক্তব্য ও মৃত্যুর মধ্যে দৃষ্টান্তহীন মেলবন্ধন লক্ষ করা গেছে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, রাজনীতিতে অগ্রজরা তাকে জায়গা ছেড়ে দিতে চান না। অসহিষ্ণুুভঙ্গি ও বৈরীভাবাপন্নে হাদিকে বলা হয়েছিল, তোমরা সব কিছু ভেঙে দিচ্ছ! জবাবে হাদি বলেছিলেন, হ্যাঁ, আমরা সব কিছু ভাঙতে পেরেছি। এই বলাটা ছিল হাদির জন্য মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে বলা। হাদি বলতেন, বিপ্লবকে এগিয়ে নিতে গিয়ে কোনো বিপ্লবী হত্যার শিকার হলে তার বিচার হতে হবে। বিচার না হলে নতুন বিপ্লবী জন্মাবে না। ওসমান হাদিকে হত্যাকারী ও তার ষড়যন্ত্রকারীকে বের করে বিচার ত্বরান্বিত করা জরুরি।

লেখক : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক