ন্যায়পাল নিয়োগ

বাংলাদেশের সংবিধানে ন্যায়পাল পদের উল্লেখ থাকলেও কিভাবে কোন পদ্ধতিতে ন্যায়পাল পদটিতে নিয়োগ হবে। সেই সাথে তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে কিছু বলা নেই। অতঃপর ১৯৮০ সালে প্রণীত আইনে ন্যায়পাল পদে নিয়োগ এবং তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিধান করা হলেও সংবিধান কার্যকর হওয়ার ৫৪ বছর পরও ন্যায়পাল পদটিতে নিয়োগদানপূর্বক ১৯৮০ সালে প্রণীত ন্যায়পাল আইন অনুযায়ী কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। কার্যকরকালীন সংবিধানে যে ন্যায়পালের বিধান ছিল তা এখনো অক্ষুণ্ন আছে। তবে এখন পর্যন্ত ন্যায়পাল নিয়োগ কার্যকর হয়নি। একসময় কর-ন্যায়পাল আইন, ২০০৫-এর অধীন ২০০৬ সালের ৯ জুলাই চার বছরের জন্য দেশের প্রথম কর-ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে সংসদ কর্তৃক ২০১১ সালে কর-ন্যায়পাল আইন বাতিল করা হলে এ পদের নিয়োগটিও বাতিল হয়ে যায়।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ৭৭ ন্যায়পাল-বিষয়ক। অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে— সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পাল পদ প্রতিষ্ঠায় বিধান করতে পারবে। উক্তরূপ আইন দ্বারা ন্যায়পালকে কোনো মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা বা দায়িত্ব দেয়া হবে, ন্যায়পাল সেরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। ন্যায়পাল তার দায়িত্ব পালন সম্পর্কে বার্ষিক রিপোর্ট প্রদান করবেন। সেই রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হবে।

সংসদে ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০ সালে প্রণীত হলেও এখন পর্যন্ত ওই আইনের অধীন কোনো ন্যায়পাল নিয়োগ কার্যকর হয়নি। আইনটিতে সংসদের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক একজন ন্যায়পাল নিয়োগের উল্লেখ আছে, যিনি আইনি ও প্রশাসনিক বিষয়ে দক্ষ এবং যার সততা সুবিদিত। আইনটিতে বলা আছে— ন্যায়পাল যে তারিখে কার্যভার গ্রহণ করবেন, সে তারিখ থেকে তার পদের মেয়াদ হবে তিন বছর। এছাড়া তিনি একটি অতিরিক্ত মেয়াদে পুনঃনিয়োগ লাভে যোগ্য হবেন। প্রমাণিত অসদাচরণ বা শারীরিক অক্ষমতার কারণ ছাড়া সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে সমর্থিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির আদেশ ছাড়া ন্যায়পালকে তার পদ হতে অপসারণ করা যাবে না। ন্যায়পাল রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয়পদ ত্যাগ করতে পারবেন।

ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০-এর বিধান সাপেক্ষে ন্যায়পালের পারিশ্রমিক, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারকের সমরূপ হবে।

ন্যায়পাল কোনো মন্ত্রণালয়, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ বা কোনো সরকারি কর্মকর্তার গৃহীত পদক্ষেপের বিষয়ে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির অভিযোগ উত্থাপিত হলে তদন্ত করতে পারবেন; তবে ধারাটির কোনো কিছু ন্যায়পালকে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি আদালতের কার্যধারা অথবা আদালতের সদস্য হিসেবে কর্মরত কোনো ব্যক্তির আচরণ বিষয়ে তদন্তের ক্ষমতা দেয় না।

সংবিধানে শুধু ন্যায়পালের বিষয় উল্লেখ আছে। ফলে যে ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০ প্রণীত হয় তাতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সংসদের সুপারিশের ভিত্তিতে তিন বছর মেয়াদে একজন ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয় উল্লেখ আছে। সংবিধানে কর-ন্যায়পাল বিষয়ে কিছু উল্লেখ না থাকলেও কর-ন্যায়পাল আইন, ২০০৫ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালে চার বছর মেয়াদে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। কর-ন্যায়পাল শুধু একটি মেয়াদের জন্য নিয়োগ লাভের যোগ্য ছিলেন। কোনো পুনঃনিয়োগের বিধান ছিল না। এ ক্ষেত্রে ন্যায়পাল আইন-১৯৮০-তে এক মেয়াদের জন্য পুনঃনিয়োগের বিধান বিদ্যমান।

কর-ন্যায়পাল আইন, ২০০৫-এ বলা হয়— কর-ন্যায়পালের পদমর্যাদা হবে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের পদমর্যাদার অনুরূপ এবং পারিশ্রমিক, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হবে। সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারক যে পদ্ধতিতে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ ছাড়া কর-ন্যায়পালকে অপসারণ করা যাবে না। কর-ন্যায়পাল রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে স্বীয় স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে তার পদ ত্যাগ করতে পারতেন। অন্যদিকে ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী ন্যায়পালের পারিশ্রমিক, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারকের সমরূপ হবে। ন্যায়পাল রাষ্ট্রপতির কাছে স্বীয় স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে তার পদ ত্যাগ করতে পারবেন।

কর্ম অবসানের পর কর-ন্যায়পাল প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য ছিলেন না। ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০-তে কর্ম অবসানের পর ন্যায়পাল প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভের যোগ্য বিবেচিত। কর-ন্যায়পাল ৬৭ বছর বয়সসীমা পর্যন্ত স্বীয়পদে বহাল থাকতে পারতেন। এ বিষয়ে ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০-তে কোনো নির্ধারিত বয়সসীমা দেয়া নেই।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক কর-ন্যায়পালের নিয়োগ লাভের বিধান রয়েছে। তবে ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০-এর বিধান অনুযায়ী সংসদের সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ন্যায়পাল নিয়োগ লাভের যোগ্য।

গুরুতর অসদাচরণ অথবা মানসিক বা শারীরিক অসামর্থ্যরে কারণে কর-ন্যায়পাল দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে অক্ষম হলে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ভিত্তিতে পদ হতে অপসারণ করতে পারতেন। এ বিষয়ে ন্যায়পাল আইন, ১৯৮০-এর বিধান অনুযায়ী সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে সমর্থিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির আদেশ ছাড়া ন্যায়পালকে তার পদ থেকে অপসারণের সুযোগ নেই।

সুইডিশ শব্দ Ombudsman-এর বাংলা প্রতিশব্দ ন্যায়পাল। Ombudsman-এর অর্থ— প্রতিনিধি বা মুখপাত্র। এ অর্থে ন্যায়পাল বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়ে থাকে, যিনি অন্যের প্রতিনিধিত্ব করেন বা মুখপাত্র হিসেবে অন্যের জন্য কথা বলেন। সুইডেনের সংবিধানে ১৮০৯ সালে প্রথম Ombudsman পদ তৈরি করা হয়। সরকারি চাকরিজীবী, বিচারক বা সশস্ত্রবাহিনীর সদস্য কর্তৃক দেশের আইন যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কি-না এবং তাদের বেআইনি কাজ ও অহেতুক হয়রানির কারণে জনগণের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা পদদলিত হচ্ছে কি-না তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্ত করে দেখার জন্য অভিযোগ তদন্তকারী দফতর হিসেবে ন্যায়পাল পদের উৎপত্তি ঘটে। পরবর্তীকালে সুইডেনের সংবিধানকে অনুসরণ করে বিশ্বের অন্যান্য দেশের শাসনব্যবস্থায় ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

য্ক্তুরাজ্যে ন্যায়পালকে বলা হয় পার্লামেন্টারি কমিশনার। পৃথিবীর যেসব দেশে ন্যায়পাল পদের বিধান আছে; সেসব দেশে ন্যায়পাল আইনসভা বা সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত হন। সাধারণত আইনসভা বা সংসদে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে ন্যায়পাল নির্বাচন করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ন্যায়পালকে যথাযথ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

পৃথিবীর যেসব দেশে ন্যায়পালের বিধান রয়েছে সে সব দেশে ন্যায়পালের কার্যাবলির মধ্যে আছে— বেসামরিক প্রশাসন ও আদালতের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান। ন্যায়পালকে বেআইনি কার্যকলাপ, কর্তব্যে অবহেলা ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে হয়। বিশেষভাবে প্রতারণামূলক অপরাধ ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কার্যকলাপের প্রতি ন্যায়পালকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। যেকোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সংবিধানের বিধি বা দেশের আইন লঙ্ঘন কিংবা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিধিবদ্ধ নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করলে ন্যায়পাল তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। সাধারণভাবে ন্যায়পাল পদের মূল উদ্দেশ্য সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের সমতা ও সততা বিধান এবং সুনির্দিষ্টভাবে প্রশাসনের যেকোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের গতিবিধির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ।

ন্যায়পালের শাস্তি প্রদানের কোনো ক্ষমতা নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে, যেমন— জনসাধারণের সম্পত্তি বেদখল হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আদালতে অভিযুক্ত করার পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য ন্যায়পাল প্রস্তাব দিতে পারেন। বিচারক বা প্রশাসনিক কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা ন্যায়পালের নেই। তবে এসব সীমাবদ্ধতা প্রশাসনের ওপর ন্যায়পালের নিয়ন্ত্রণ এবং সংশোধন প্রক্রিয়াকে অকার্যকর করতে পারে না। কোনো কর্মকর্তা যদি নিজের সিদ্ধান্তকে বিধিসম্মত ও আইনানুগ বলে দাবি জানিয়ে ন্যায়পাল প্রদত্ত সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেন, সে ক্ষেত্রে ন্যায়পাল বিষয়টি সম্পর্কে সংসদ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে রিপোর্ট করতে পারেন। দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিগুলোর ত্রুটি নির্দেশ করার অধিকারও তার এখতিয়ারভুক্ত।

বাংলাদেশের সংবিধানে ন্যায়পাল পদের উল্লেখ থাকলেও কিভাবে কোন পদ্ধতিতে ন্যায়পাল পদটিতে নিয়োগ হবে। সেই সাথে তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে কিছু বলা নেই। অতঃপর ১৯৮০ সালে প্রণীত আইনে ন্যায়পাল পদে নিয়োগ এবং তার ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে বিধান করা হলেও সংবিধান কার্যকর হওয়ার ৫৪ বছর পরও ন্যায়পাল পদটিতে নিয়োগদানপূর্বক ১৯৮০ সালে প্রণীত ন্যায়পাল আইন অনুযায়ী কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
[email protected]