কোথায় যাচ্ছেন ট্রাম্প

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা উল্টে দেয়া থেকে শুরু করে পশ্চিম গোলার্ধ এবং তার বাইরে সামরিক হামলা চালানো পর্যন্ত ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন এবং অন্যান্য জাতির সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। অন্যদের ওপর চড়াও হওয়াকে তিনি আইনে নিয়ে এসেছেন। এর জেরে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রাধান্য পাচ্ছে।

রিন্টু আনোয়ার
রিন্টু আনোয়ার |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

ট্রাম্প নিজের তুলনা নিজেই। ট্রাম্পের বড় গুণ তার অকপটতা। আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টরা নগ্ন স্বার্থকে ‘গণতন্ত্র’ আর ‘মানবাধিকারে’র মুখরোচক ভাষায় ঢেকে দিতেন। ট্রাম্প সেসব ভব্যতার মুখোশই পরেন না। ডেলটা ফোর্সের হেলিকপ্টারসহ দেড় শতাধিক বিমান, বোমা ও বিশেষ বাহিনী পাঠিয়ে বিদেশী কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে ঘাড় ধরে নিয়ে আসতেও তার বাধে না। বলতে মুখে আটকায় না ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযান ছিল নিছক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ। এর আগেও, বড়দিনের দিন ট্রাম্প নাইজেরিয়া ও সোমালিয়ায় বিমান হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। একই দিনে ভেনিজুয়েলার ওপর ড্রোন হামলাও চালানো হয়।

নিজেকে ‘আয়রনম্যান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা দরকার তা-ই করবেন, বিশ্ববাসীকে এ বার্তা দিতে তিনি বাকি রাখেননি। একতরফা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে নিজ দেশকে তিনি বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতেও পিছপা হচ্ছেন না। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে প্রচারিত তার নীতি শেষ পর্যন্ত আমেরিকাকে ফার্স্ট রাখবে, না ক্রমেই লাস্টের দিকে নেবে- সেই ভাবনার সময় তার নেই। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকা ফার্স্ট আর্মস ট্রান্সফার স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট অস্ত্র স্থানান্তর কৌশল’ আদেশের মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র বিক্রিকে পররাষ্ট্রনীতির মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান। অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ভিত্তি শক্তিশালী করতেও চান। আদেশে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকায় তৈরি সামরিক সরঞ্জাম ‘বিশ্বের সেরা।’ এতে বলা হয়, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থকে এগিয়ে নিতে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে এবং দেশে ও মিত্রদের মধ্যে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করতে অস্ত্র স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে আরো সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা উচিত। নতুন এই নির্দেশনার আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশী অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে।

সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের ক্ষমতার লড়াই, সর্বোপরি কোন দেশ প্রধান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হবে, সেটি নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। সৌদি আরব আমিরাতের আঞ্চলিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য মিসর এবং সোমালিয়ার সাথে সামরিক চুক্তির পরিকল্পনা করছে। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ভূঅর্থনৈতিক দ্বন্দ্বে বিশ্ব এক বিশৃঙ্খল পরিস্থতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। ট্রাম্প যে তার এ একতরফা ও হটকারী নীতির মাধ্যমে বিশ্বব্যবস্থা তছনছ করে দিচ্ছেন, তা বুঝতে কারো বাকি নেই। প্রশ্ন হয়ে থাকছে, এর প্রতিক্রিয়া কি তার দেশে পড়বে না?

১৯৪৫ সালের পর জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান গঠনে নেতৃত্ব দেয়া যুক্তরাষ্ট্র অতুলনীয় সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তিতে বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার হাতিয়ারও। এগুলো এক দিকে আমেরিকার প্রভাব নিশ্চিত করে, মিত্রদের আয়ত্তে রাখতেও কাজে দেয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও ভাবায়। সেখানে এখন যোগ হয়েছে ট্রাম্পের মুখের ভাষা শক্তি। হুমকি-ধমকির তুফান তুলে ফেলছেন। আবার প্রশংসায় ভাসিয়ে মাথায় তুলে আছাড় দিতেও সময় নেন না। যুগে যুগে পরাশক্তিগুলো দুর্বল হয়েছে শক্তির অভাবে নয়। বরং শক্তির অপব্যবহার করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দেশও ভেঙে পড়েছে শক্তির অভাবে নয়। বরং অতি শক্তির প্রভাব ও ভয় দেখানোর পরিণতিতে। দশকের পর দশক যুক্তরাষ্ট্র উন্মুক্ত বাজারের পক্ষে ছিল। অন্য অর্থনীতিগুলোকে আমেরিকার সাথে ভিড়তে বাধ্য করেছে। ট্রাম্পের শুল্ক আর বাণিজ্যযুদ্ধ এখন সেই দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী করে তুলেছে। বিকল্প পথ খুঁজছে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভাবছে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নিয়ে। এশীয় দেশগুলো আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদার করছে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ থেকে শুরু করে নতুন উন্নয়ন ব্যাংক পর্যন্ত বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে।

এ অবস্থাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে রাশিয়া। বাড়াচ্ছে নিজের প্রভাব বলয়। তুরস্ক, ভারত, ব্রাজিলের মতো মাঝারি শক্তিগুলোও নড়াচড়া দিচ্ছে। ছোটরা এমন কি দুর্বল মিত্ররাও শত্রুকে শুধু ভয় করে। অনুসরণ করে না। কৌশলের বদলে দাম্ভিকতা এবং নেতৃত্বের বদলে জবরদস্তি বেছে নিয়ে তিনি আমেরিকার নিরাপত্তার ভিত্তিই দুর্বল করছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি মানে কে কত জোরে হুমকি দেয় তা নয়, বরং কতজন বিশ্বাস করে যে তার পাশে দাঁড়ানো সার্থক। যে কারণে ট্রাম্পের নীতি দেশটিকে ধীরে ধীরে গুরুত্বহীনতার দিকে নিচ্ছে। এমন সন্ধিক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ কানাডার পণ্যের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক বাতিলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। ২১৯-২১১ ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবটি পাস হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত ওই প্রস্তাবে ছয়জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাও সমর্থন জানিয়েছেন। আপাতত এ অনুমোদন অনেকটা প্রতীকী। অপেক্ষা ভবিষ্যতের। প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটেও পাস হতে হবে। এরপর এটিকে আইনে পরিণত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার ওপর একের পর এক শুল্ক আরোপ করেছেন। সম্প্রতি তিনি কানাডা প্রস্তাবিত চীনের সাথে বাণিজ্যচুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন।

প্রতিনিধি পরিষদের অধিবেশনে ভোট চলাকালে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটে কোনো রিপাবলিকান যদি শুল্কের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তবে নির্বাচনের সময় তাকে এর গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ কংগ্রেসে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন এ পরিষদে প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা ঠেকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটে কোনো রিপাবলিকান শুল্কের বিরুদ্ধে ভোট দিলে নির্বাচনের সময় তাকে এর গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হয়। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের অল্প ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন রিপাবলিকান সদস্য দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের উত্থাপিত প্রস্তাবকে সমর্থন জানানোর কারণে এটি সহজে পাস হয়ে যায়। এর আগে, কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। আগামী ১ আগস্ট থেকে এ শুল্ক কার্যকর হবে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সব পণ্যের ওপর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়তি শুল্ক বসানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপরও নতুন শুল্ক আরোপ করেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তামা আমদানির ওপরও বসিয়েছেন ৫০ শতাংশ শুল্ক।

ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা লাজারো জানিয়েছেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র এ মাসেই ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করবেন। এ সময় দেশটির ওপর আরোপিত ২০ শতাংশ শুল্ক ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সমসাময়িক এ সময়েই ভারতের সাথেও বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ভারতের সাম্প্রতিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবেই ওয়াশিংটন তড়িঘড়ি করে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এ ছাড়া ব্রিকস জোটের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলা এবং মার্কিন ডলারের আধিপত্য ধরে রাখার বিষয়টিও এই চুক্তির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে ফোনালাপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির ঘোষণা দেন। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশই বিভিন্ন পণ্যের শুল্ক কমাতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি, কৃষি ও শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ও সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইন শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া শুল্ক পদ্ধতি সহজ করা, মেধাস্বত্ব রক্ষা ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বাণিজ্য চুক্তিটি শুধু অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে গভীর ভূরাজনীতিও কাজ করছে। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত ব্রিকস জোটের প্রভাব কমানো এবং ডলারের আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ট্রাম্প ভারতের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমনকি ডলার-কেন্দ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কাজ করা দেশগুলোর ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন। ভারতের দেশীয় রাজনীতিতে এ চুক্তি নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিরোধী দলগুলো যুক্তি দিচ্ছে, ট্রাম্প পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলার পণ্য কেনার যে লক্ষ্যমাত্রার কথা বলছেন, তা বর্তমান ৪৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানির তুলনায় অবাস্তব। তারা সতর্ক করে বলছেন, এমন প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে উল্টে দিতে পারে এবং কৌশলগত স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন করতে পারে। কৃষি খাত নিয়ে ভারতে বিশেষ সংবেদনশীলতা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি আইনপ্রণেতাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, আলোচনা চলাকালে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে। এ ছাড়া জ্বালানি খাত নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে।

বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা উল্টে দেয়া থেকে শুরু করে পশ্চিম গোলার্ধ এবং তার বাইরে সামরিক হামলা চালানো পর্যন্ত ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইন এবং অন্যান্য জাতির সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন। অন্যদের ওপর চড়াও হওয়াকে তিনি আইনে নিয়ে এসেছেন। এর জেরে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি প্রাধান্য পাচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]