সমাজ ও রাষ্ট্রের আইন-কানুন, বিচার ব্যবস্থা, নীতি-নৈতিকতা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কিছু ব্যক্তি দাম্ভিকতা, অহঙ্কার ও প্রতিহিংসার বশে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে দুর্বিষহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে খেয়াল খুশি মতো নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যার দুঃসাহস দেখিয়েছে। যার প্রমাণ মেলে সম্প্রতি পৃথক দু’টি ঘটনায় একজন শিশু ও একজন শ্রমিককে কিছু দুর্বৃত্ত আগুন লাগিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায়।
আমরা এমনিতে পুরো জাতি আর্থ-রাজনৈতিক সঙ্কটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছি।
ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির ষড়যন্ত্র, নাশকতা মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছি। রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তি। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা সমুন্নত রাখতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। এমনই প্রেক্ষাপটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম অকুতোভয় নেতা ইনকিলাব মঞ্চের আহŸায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্যে রাজপথে গুলির ঘটনা এবং সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু গোটা জাতিকে শোকাহত ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে রাজপথ উত্তাল, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে চ্যালেঞ্জ ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা বিধান নিয়ে দেশবাসী বিচলিত।
দেশের রাজনৈতিক এই উত্তাল পরিস্থিতিতে ল²ীপুরে সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামের সুতারগোপ্তা মহল্লায় গভীর রাতে বিএনপির এক নেতার ঘরের দরজার বাইরে তালা লাগিয়ে ও পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটে। পেট্রোলের কারণে মুহূর্তে আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে বিএনপি নেতার সাত বছর বয়সী এক মেয়ে আয়েশা আক্তারের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এ ছাড়া তার আরো দুই মেয়ে বীথি আক্তার (১৭) ও স্মৃতি আক্তার (১৪) আগুনে দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। বিএনপি নেতা বেলাল হোসেন (৫০) নিজেও অগ্নিদগ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। আগুনে বেলাল হোসেনের ঘর ও ঘরে রক্ষিত সম্পদ সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, বিএনপি নেতার ওই ঘরের চারদিকে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে, এই আগুন আর তীব্র ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে ৭ বছরের অসহায় ছোট্ট আয়শা চিৎকার করে বলছিল আব্বু, আমাকে নাও, আমাকে নাও। আগুন লাগার পর বড় মেয়ে আর মেজ মেয়েকে টিনের ফাঁক দিয়ে ঘর থেকে বের করতে পারলেও কোনোভাবে আয়শার কাছে যেতে পারেননি মা-বাবা।
বেলাল হোসেন ল²ীপুরের ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক এবং সুতারগোপ্তা বাজারের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী। একটি পুরো পরিবারকে বর্বর কায়দায় হত্যার জঘন্য ষড়যন্ত্র এটি। সভ্য সমাজ এবং বিবেকবান মানুষের কল্পনারও বাইরে, মানুষ কতটা জঘন্য হতে পারে! কতটা বর্বর হলে ঘুমের মধ্যে থাকা একটি পরিবারকে বীভৎস কায়দায় পুড়িয়ে মারার ষড়যন্ত্র করতে পারে! অপর দিকে অনেকটা একই সময়ে ময়মনসিংহের ভালুকায় পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র অবস্থায় ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। গত ১৮ ডিসেম্বর সংঘটিত এ ন্যক্কারজনক ঘটনায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনাগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মধ্যদিয়ে সমাজের কুৎসিত ও বিকৃত রূপ ফুটে উঠেছে। আমাদের মাঝে কতটা ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতা, অন্ধ আক্রোশ ও মনুষ্যত্বহীনতা সংক্রমিত হয়েছে তার একটা চিত্র ফুটে উঠেছে। লাখো মানুষকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন ইনকিলাব মঞ্চের আহŸায়ক শরিফ ওসমান হাদি। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি শহীদ হয়েছেন; তার সেই ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখনো দূরপরাহত। কাজেই সমাজ সচেতন ও বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে যার যার অবস্থান থেকে সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা অপশক্তির খোঁজে বের করতে হবে। এদের প্রতিরোধ করতে হবে। সেই সাথে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় এমন এক সময় আসবে যখন আমরা প্রত্যেকে ব্যক্তি ও পারিবারিকভাবে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসের মুখোমুখি হবো। সমাজ ও রাষ্ট্র যদি এসব বর্বরদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে তবে আমরা অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়তে বাধ্য। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের বিকল্প নেই।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট



