শিশুর জন্য নিরাপদ সামাজিক মাধ্যম

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে ইন্টারনেটের ব্যবহার ক্রমশই বাড়ছে। এ যুগে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন ভাবাই যায় না। বড়রা নিষিদ্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ সম্পর্কে সাবধান থাকলেও শিশুরা তা পারে না— নিছক কৌতূহলের কারণে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারে শিশুদের আইনি সুরক্ষার বিকল্প নেই। একই সাথে প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতনতা ও সতর্কতা

গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫, দৈনিক বণিক বার্তায় একটি খবর প্রকাশিত হয়। ছোট সাদামাটা খবর। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। যেসব অভিভাবক ছোট শিশুদের হাতে সেলফোন তুলে দেন তাদের জন্য এটি সতর্কবার্তা। খবরটি ছিল— সেলফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে অভ্যন্তরীণ একটি গবেষণা মেটা বন্ধ করে দিয়েছে। মটলি রাইস নামের একটি আইনি প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের স্কুল ডিস্ট্রিক্টের পক্ষে মেটা, গুগল, টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাটের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার বিষয়বস্তু ছিল— শিশুদের ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ লুকানো। মামলার আরজিতে বলা হয়— সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো সচেতনভাবে তাদের পরিষেবার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কিত তথ্য ব্যবহারকারীদের কাছে লুকিয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষার ব্যাপারে। অভিযোগে আরো বলা হয়— ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে প্রকারান্তরে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সাথে স্কুলছাত্রদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে কোম্পানিগুলো।

মূলত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণাকাজ শুরু করেছিল মেটা। গবেষণায় ব্যবহারকারীদের ভেতর একাকিত্বের অনুভূতি ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য উঠে আসায় মেটা সে গবেষণার কাজ বন্ধ করে দেয়।

বস্তুত; ডিজিটাল জীবনাচার বদলে দিয়েছে আমাদের স্বাভাবিক জীবনধারাকে। এর ব্যবহারের সুবিধা ও সহজলভ্যতার আড়ালে শিশুদের মানসিক বিপর্যয়ের কথা তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না— যেহেতু তা এক দিনে ঘটে না। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন তাদের মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বণিক বার্তা আয়োজিত ‘শিশুদের অনলাইন যৌন-হয়রানি ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা’ সম্পর্কিত গোলটেবিল আলোচনায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী; বিশেষ করে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে আসে। এতে দেখানো হয়, বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক শিশু অনলাইনে যৌন-হয়রানি ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে সৃষ্টি করছে মানসিক অস্থিরতা। বৈঠকে উপস্থাপিত এক তথ্যে দেখা গেছে, সেলফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে সমীক্ষা এলাকার কিশোর-কিশোরীদের ৩০ শতাংশ পর্নোগ্রাফিক টেক্সট এবং ২১ শতাংশ পর্নোগ্রাফিক ভিডিও পাচ্ছে। শিশুস্বাস্থ্যের ওপর ডিজিটাল মাধ্যমের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে বহু সমীক্ষা হয়েছে। করোনাকালীন অনলাইন ক্লাসের একটি আবশ্যিক যৌক্তিকতা ছিল। কিন্তু করোনা-পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার একদিকে শিশুদের প্রতিষ্ঠানবিমুখ করেছে, সৃষ্টি করেছে সামষ্টিক প্রতিভা বিকাশ ও কর্ম-উদ্যোগের স্থবিরতা। দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই, খাওয়ার সময় শিশু সেলফোন নিয়ে ব্যস্ত এমন দৃশ্য অতি সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যখন ১৩ বছর বয়সের আগে শিশুদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে, বাজারজাতকরণে আইন করা হচ্ছে, তখন আমাদের অবস্থা উল্টো। কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা ছাড়াই শিশুদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে সেলফোন, ট্যাব— ইত্যাদি। আরো ভয়াবহ চিত্র হচ্ছে অবারিত অনুমতির (unlimited access) কারণে তাদের সামনে খুলে যাচ্ছে নিষিদ্ধ জগতের অলিগলি। শিশুর ওপর এর মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাব কী হতে পারে সহজেই অনুমেয়।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে ইন্টারনেটের ব্যবহার ক্রমশই বাড়ছে। এ যুগে ইন্টারনেট ছাড়া জীবন ভাবাই যায় না। বড়রা নিষিদ্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাপ সম্পর্কে সাবধান থাকলেও শিশুরা তা পারে না— নিছক কৌতূহলের কারণে। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট ব্যবহারে শিশুদের আইনি সুরক্ষার বিকল্প নেই। একই সাথে প্রয়োজন অভিভাবকদের সচেতনতা ও সতর্কতা। এ ব্যাপারে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কমিটি তৈরি করে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবিধান বা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া দরকার। প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন ও কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। না হলে, কোটি কোটি শিশুর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]