২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগ এমন একটি রায় দিয়েছেন, যা বাংলাদেশের সংবিধান এবং রাজনীতি, উভয়ের গতিপথ আমূল বদলে দিয়েছে। এ রায়ে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার অর্থ হলো, এখন থেকে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একটি অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে।
স্মরণযোগ্য যে, ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের এক বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে ব্যবস্থাটি বাতিল করা হয়েছিল। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিটি ত্রুটিমুক্ত ছিল না, তবু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল এ ব্যবস্থায় আস্থা রাখত। এটি বাতিলের পর জাতীয় নির্বাচনগুলো একপক্ষীয় হয়ে পড়ে, যা গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে মূল ভূমিকা রেখেছিল।
সম্প্রতি ঘোষিত ওই রায়টি কেবল ত্রয়োদশ সংশোধনীর পুনরুজ্জীবন নয়, বরং তার চেয়েও গভীর কিছু। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ পূর্ণাঙ্গ রায়টি জনসমক্ষে আসার পর এটি এখন স্পষ্ট যে, আপিল বিভাগ এ সুযোগে কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার বা ‘সাংবিধানিক ক্ষমতা’র পরিধি ও স্বরূপ পুনর্মূল্যায়ন করেছে। এ ক্ষেত্রে আদালত ভারতের প্রচলিত সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে বাংলাদেশের নিজস্ব সাংবিধানিক ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত একটি নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। আপিল বিভাগের মতে, সংবিধান প্রণয়নকারী এ মৌলিক শক্তি সর্বদা ‘জনগণের হাতে’ ন্যস্ত থাকে। এমনকি এ শক্তির সরব প্রয়োগ সবসময় না থাকলেও, তা কখনো নিঃশেষ হয়ে যায় না। এটি জনগণের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করে। সময়ের প্রয়োজনে বা পরিস্থিতির দাবিতে পুরো সাংবিধানিক কাঠামোকে নতুন রূপ দেয়ার সক্ষমতা রাখে। আদালত কিভাবে এ ‘সংবিধান প্রণয়ন ক্ষমতা’-এর ধারণা ব্যাখ্যা করেছেন এবং ভবিষ্যতে এর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, বক্ষমান নিবন্ধে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের আগে পর্যন্ত, সাংবিধানিক ক্ষমতা বা ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ (কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার) সম্পর্কে আমাদের ধারণা মূলত অষ্টম সংশোধনীর রায় এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তখন পর্যন্ত মনে করা হতো, সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো এমন এক ক্ষমতা, যা একটি বিপ্লবের পরপর সেই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা সংস্কারে জনগণ প্রয়োগ করে।
বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ দিন ধরে এ বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, জনগণ একবার এ ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি সংবিধান কাঠামো তৈরি করলে, তা আর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা সম্ভব নয়। জনগণের হাতে থাকা এ গাঠনিক শক্তির মধ্যে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগের যাবতীয় ক্ষমতা পুঞ্জীভূত থাকে। এখানে এ তিন ক্ষমতার মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট বিভাজন থাকে না, কারণ ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতি সংবিধান প্রণয়ন ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ভারতীয় আইনশাস্ত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংবিধান প্রণয়নের সময় জনগণের হাতে থাকা এ সংবিধান প্রণয়ন ক্ষমতাটি পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ— নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ (পার্লামেন্ট) এবং বিচার বিভাগের মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়। এ বিভাজনের পর, খোদ জনগণ কিংবা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ আর কখনো সেই আদি গাঠনিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারে না। ধারণাটি এমন যে, সংবিধান তৈরির মাধ্যমে সেই মূল গাঠনিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। একই সাথে তা খণ্ডিত অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ফলে সংসদ যখন পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংশোধন করে, তখন তারা কোনো ‘গাঠনিক শক্তি’ প্রয়োগ করে না; বরং শুধু ‘সীমিত সংশোধনী ক্ষমতা’ (লিমিটেড অ্যামেন্ডিং পাওয়ার) ব্যবহার করে। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে, সংবিধান একবার চূড়ান্তভাবে প্রণীত হয়ে গেলে গাঠনিক শক্তির কার্যকারিতা কার্যত শেষ হয়ে যায়। এ ছাড়া তা আর কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
ভারতীয় আইনশাস্ত্রে বর্ণিত এ মতবাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোকে কেবল আদি দলিলের মধ্যে বন্দী করে ফেলে। এ যুক্তি অনুযায়ী, সংবিধান তৈরির সেই আদি মুহূর্তে জনগণ তাদের পূর্ণ গাঠনিক শক্তি নিঃশেষ করে দিয়েছিল, যার ফলে পরবর্তী সময়ে কোনো মৌলিক পরিবর্তন বা সংযোজন অসম্ভব হয়ে পড়ে। সংসদ যখনই সংবিধান সংশোধন করে, তা কোনোভাবে জনগণের আদি গাঠনিক শক্তির সমকক্ষ হয় না। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে পরিবর্তনের ক্ষমতা মাত্র। এ আইনি সীমাবদ্ধতার দরুন সংসদ মূল সংবিধানের স্তম্ভগুলো যেমন উপড়ে ফেলতে পারে না; তেমনি নতুন কোনো মৌলিক স্তম্ভ তৈরির সামর্থ্যও নেই।
ভারত স্বাধীনতার পর থেকে কোনো বড় ধরনের বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়নি, তাই ‘গাঠনিক শক্তি’ ও ‘মূল কাঠামো’র ভারতীয় ব্যাখ্যা তাদের জন্য হয়তো প্রাসঙ্গিক; কিন্তু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ দেশ বারবার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক মানচিত্র বদলেছে। প্রতিটি অভ্যুত্থানের পর সংবিধানে এমন সব মৌলিক সংস্কার দাবি করা হয়েছে, যা আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতীয় মতবাদ আমাদের এই নতুন ‘মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো’ ধারণ করার সুযোগ দেয় না, কারণ তা শুধু আদি সংবিধানের ওপর একক গুরুত্ব আরোপ করে। যদি আমরা আমাদের গণ-আকাঙ্ক্ষাকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে চাই, তবে স্বীকার করতেই হবে যে, সংবিধান রচনার পরেও জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা শেষ হয়ে যায় না। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগ ঠিক এই বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, যা আমাদের সংবিধান চর্চায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
২০২৫ সালের ২০ নভেম্বরের রায়ে আপিল বিভাগ ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের অনুসৃত পদ্ধতি থেকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মৌলিক দূরত্ব বজায় রেখেছেন। উলফগ্যাং বোয়েনফোর্ড এবং লুসিয়া রুবিনেলির মতো সংবিধান তাত্ত্বিকদের লেখনীর ওপর ভিত্তি করে আদালত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ‘সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে এর গাঠনিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায় না, বরং তা জনগণের মাঝে সুপ্ত অবস্থায় বিরাজ করে’। এ যুক্তিতে আদালত সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন যে, ১৯৯৬ সালে একটি গণ-আন্দোলনের পর যে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল, তা আসলে জনগণের ‘গাঠনিক শক্তি’র একটি বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ, আদালত ধারণাটি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে, ১৯৭২ সালে মূল সংবিধান প্রণয়নের সাথে গাঠনিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আরো পরিষ্কার করে বলা যায়, আদালত মনে করেন, জনগণের সেই গাঠনিক শক্তি সুপ্ত আকারে জনগণের কাছে থেকে গিয়েছিল। একই সাথে ১৯৯৬ সালে তা পুনরায় জাগ্রত ও প্রযুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, আদালত মনে করেন যে, যেহেতু ব্যবস্থাটি সরাসরি জনগণের গাঠনিক শক্তিতে উদ্ভূত হয়ে সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভে পরিণত হয়েছিল, তাই ২০১১ সালে আদালতের পক্ষে এটি বাতিল করা ছিল একটি গুরুতর আইনি ভুল। কারণ বিচারিক ক্ষমতা হলো গাঠনিক শক্তির তুলনায় একটি ‘ক্ষুদ্রতর শক্তি’। এ ছাড়া তা কখনো গাঠনিক শক্তির সিদ্ধান্ত নাকচ করতে পারে না।
আপিল বিভাগ এ রায়ে দু’টি সুদূরপ্রসারী আইনি মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রথমত, গাঠনিক শক্তি সর্বদা জনগণের হাতে সংরক্ষিত থাকে। যেকোনো উপযুক্ত সময়ে, বিশেষ করে গণ-আন্দোলন বা গণ-অভ্যুত্থানের পর, তা প্রয়োগ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এ দেশে বারবার গণ-অভ্যুত্থান আমাদের সাংবিধানিক ইতিহাসের ভুল সংশোধন করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ব্যাখ্যাটি মূলত ওই ধরনের আন্দোলনগুলোকে একটি আইনি সার্থকতা ও সাংবিধানিক বৈধতা দান করে। দ্বিতীয়ত, আদালত এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, মূল সংবিধান প্রণয়নের পরেও সংবিধানে নতুন কোনো ‘মৌলিক কাঠামো’ তৈরি করা সম্ভব, যদি সেই পরিবর্তনগুলোর পেছনে জনগণের জোরালো সমর্থন থাকে। গাঠনিক শক্তির মাধ্যমে একবার এ ধরনের মৌলিক কাঠামো তৈরি হয়ে গেলে, সংসদের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা কিংবা আদালতের বিচারিক ক্ষমতার মতো ‘ক্ষুদ্রতর শক্তিগুলো’ তাতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
আপিল বিভাগের এ রায়ের প্রভাব জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। সংবিধান সংস্কার কমিশনসহ অন্য কমিশনগুলো যেসব সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব করছে, তার অনেকগুলো মূলত সেই গণ-আন্দোলন থেকে উঠে আসা গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এর মধ্যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ছিল অন্যতম প্রধান দাবি। হাইকোর্ট বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার মতো প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্যই হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। এ পরিবর্তনগুলো যদি সততা ও বিশ্বস্ততার সাথে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে বলা যেতে পারে যে, এগুলো জনগণের ‘গাঠনিক শক্তি’ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রবর্তিত হয়েছে। সে কারণে পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগের কোনো হস্তক্ষেপ বা আইনি চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে থাকবে এ মৌলিক সংস্কারগুলো।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের যে দাবিগুলো বর্তমান সরকার বাস্তবায়ন করতে চাইছে না, সেগুলোর পরিণতি কী? এ ধরনের ব্যর্থতা প্রকৃতপক্ষে সংবিধান প্রণয়ন বা গাঠনিক ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হবে, যে ক্ষমতা জনগণ বর্তমান সরকারের ওপর ন্যস্ত করেছে। এ ধরনের অপব্যবহার আদালতের মাধ্যমে বিচারযোগ্য কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে; বাস্তবে মনে হয়, এ ধরনের প্রশ্ন বিচারিক পর্যালোচনার আওতার বাইরে থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এ নয় যে, এর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না; বরং ইতিহাস বলছে, এ ধরনের অপব্যবহার নতুন করে আরেকটি গণ-আন্দোলন বা গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দিতে পারে, যার উদ্দেশ্য হবে জনগণের সেই সংবিধান প্রণয়ন ক্ষমতা পুনরায় সক্রিয় করা। একই সাথে জুলাই আন্দোলনে উত্থাপিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। তাই বর্তমান সরকারের উচিত হবে জনগণের অর্পিত এ সংবিধান প্রণয়ন ক্ষমতার অপব্যবহার না করা। জুলাই সনদে উল্লিখিত সংবিধান সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকা।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি



