বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার

মহীয়সী এই নেত্রীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা এত গভীর ছিল, বাংলাদেশের তিনজন সম্মানিত আলেম, শায়খ আহমাদুল্লাহ, ড. মিজানুর রহমান আজহারী ও মাওলানা মামুনুল হক, তার কফিন বহন করে কবরে রাখেন। সাবেক নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আলেমদের এই সর্বোচ্চ সম্মান এক বিরল দৃষ্টান্ত। এটি তারই অর্জন ছিল।

প্রফেসর ড. শাহজাহান খান
বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে বাংলাদেশ হারিয়েছে তার একজন অকৃত্রিম অভিভাবক, প্রেরণার উৎস, ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামের প্রতীক, জাতীয় ঐক্যের বিশ্বস্ত আশ্রয়, গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী এবং সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্বকে। তার মৃত্যুর পর সাধারণ জনগণ স্পষ্টভাবে তাদের প্রিয় নেত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়া আমাদের জাতীয় পরিচয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের সুস্পষ্ট ছাপ রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা সত্যিকার অর্থে অনুধাবন এবং প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

জুলাই ৩৬ আন্দোলনের নেতারা তাকে জানিয়েছিলেন, অপসারিত ফ্যাসিবাদী সরকারের কারাগার থেকে তাকে মুক্ত করতে পেরে তারা গর্বিত। আমাদের হারিয়ে যাওয়া জাতীয় মর্যাদা ও স্বাধীনতার মতোই, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের মাধ্যমে বেগম জিয়া মুক্তি লাভ করেন। যদি তরুণরা বন্দুক ও গুলির সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে দমনমূলক শাসন উৎখাত না করত, তবে তার জানাজায় কতজন মানুষ অংশ নিত তা কেউ জানে না। দেশের ইতিহাসে তার শেষ বিদায় ছিল শোকাহত মানুষের অংশগ্রহণে সর্ববৃহৎ সমাবেশ। তার জানাজায় লাখ লাখ মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যও বার্তা ও শিক্ষা বহন করে।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বীর উত্তমের মৃত্যুর পর একজন গৃহিণী থেকে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। গণতন্ত্রের প্রতি সর্বোচ্চ দৃঢ়তা, অটল দেশপ্রেম, সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিরলস প্রচেষ্টা, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নে নেতৃত্ব, বিদেশী আধিপত্য ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং জাতীয় স্বার্থের চ্যাম্পিয়ন হওয়াই তাকে বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত করে।

বেগম খালেদা জিয়া জীবনে কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। তার রাজনৈতিক জীবনে তিনি যে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তার সবগুলোতেই বিজয়ী হয়েছেন— গ্রাম ও শহর উভয় এলাকায়।

বেগম জিয়া রাজনীতিতে আসেন বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সফল নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে। শহীদ জিয়ার অতুলনীয় সততা ও অতুল দেশপ্রেমের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি। তিনি স্বামীর সেই রাজনীতির ধারাই অব্যাহত রাখেন, যা ভিন্নমতাবলম্বী ও বিভক্ত রাজনৈতিক নেতারা ও জনগণকে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর অভিন্ন পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করেছিল; উন্নয়নমুখী রাজনীতি প্রবর্তন করেছিল; মেধাবীদের অন্তর্ভুক্ত করেছিল; বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সর্বজনীন মানবাধিকারের বিকাশ ঘটিয়েছিল; মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করতে ভূমিকা রেখেছিল এবং সংবিধানে ইসলামী বিশ্বাসের স্বীকৃতি অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করলেও, পরবর্তীতে নিজস্ব যোগ্যতায় দলীয় সীমার ঊর্ধ্বে উঠে সব জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী চেতনার মানুষের নেত্রীতে পরিণত হন। তিনবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনসহ দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত মানুষের সর্বোচ্চ আস্থা, অতুল শ্রদ্ধা ও হৃদয়নিঃসৃত ভালোবাসা তার নির্বাচনী ফলাফলে ও জানাজার জনস্রোতে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিগত সরকারের সময় সবচেয়ে নির্যাতিত নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন সেই শাসনামলে, যা তাকে দীর্ঘদিনের বাসভবন থেকে উৎখাত করেছিল, যে বাসভবনটি তার স্বামী সেনাপ্রধান থাকাকালে সরকার কর্তৃক বরাদ্দ ছিল। কোনো প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই তাকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়। পতিত সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়ন, চরম অবিচার ও বিতর্কিত বিচার তাকে মানুষের হৃদয়ের আরো কাছাকাছি নিয়ে আসে।

তার জানাজায় বিপুল সংখ্যক বিদেশী প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তার অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার স্থায়ী প্রভাব ও অবিস্মরণীয় অবদানের সাক্ষ্য।

মহীয়সী এই নেত্রীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা এত গভীর ছিল, বাংলাদেশের তিনজন সম্মানিত আলেম, শায়খ আহমাদুল্লাহ, ড. মিজানুর রহমান আজহারী ও মাওলানা মামুনুল হক, তার কফিন বহন করে কবরে রাখেন। সাবেক নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আলেমদের এই সর্বোচ্চ সম্মান এক বিরল দৃষ্টান্ত। এটি তারই অর্জন ছিল।

বেগম জিয়ার প্রস্থান সামগ্রিকভাবে বিএনপি এবং বিশেষ করে দলটির নেতা তারেক রহমানের জন্য তার স্বতন্ত্র দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও চির উজ্জ্বল নেতৃত্বের ব্যক্তিগত গুণাবলি অক্ষুণ্ন রাখার সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জ রেখে গেছে।

প্রকৃতপক্ষে, বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব, দেশের প্রতি অঙ্গীকার, বাংলাদেশের জন্য তার অবদান ও নেতৃত্বশৈলী তাকে নিজ দলের সীমানার বহু ঊর্ধ্বে এক কালজয়ী নেত্রীতে পরিণত করেছে। তিনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একজন গভীরভাবে প্রিয় ও আন্তরিকভাবে সম্মানিত জাতীয় নেত্রীতে পরিণত হয়েছেন, যা সব অনুমান ও প্রত্যাশাকে অতিক্রম করে তার জানাজায় মানুষের সমুদ্রসম উপস্থিতিতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণীয় বিদায়ের চূড়ান্ত বার্তা হলো, মানুষ যাই করার চেষ্টা করুক না কেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যাকে ইচ্ছা তাকে সম্মান ও মর্যাদা দান করেন।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি এবং ইমেরিটাস প্রফেসর, সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া।

[email protected]