গাজা যখন পুড়ছে, নীরব মুসলিম বিশ্ব ও বিশ্বশক্তির দায়

প্রভাবশালী শক্তির উচিত গাজাকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ বানানো বন্ধ করা। ন্যূনতম একটি বৈশ্বিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তার নিশ্চয়তা, সব পক্ষের আইন ভঙ্গের জবাবদিহি, বন্দীদের মুক্তি ও বেসামরিক সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রত্বসহ একটি বাস্তব রাজনৈতিক পথরেখা। এর কম কিছু হলে সহিংসতা, চরমপন্থা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার চক্র চলতে থাকবে। যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো গাজা ধ্বংস হতে থাকা অবস্থায় স্বার্থের রাজনীতি চালিয়ে যায়, তবে ইতিহাস শুধু সহিংসতার নায়কদের নয়, নীরব বা সুবিধাবাদী দর্শকদের কঠোরভাবে বিচার করবে। আর যদি বিশ্বশক্তিগুলো ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগকে ‘ব্যবস্থাপনাযোগ্য’ বলে ধরে নেয়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা একে একে ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরের মতো ভেঙে পড়বে

গাজায় যা ঘটছে, তা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দেয়ার মতো এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। স্বাধীন ক্ষুধা-পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও জাতিসঙ্ঘ-সংযুক্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে, সেখানে চরম খাদ্য সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জীবিকা ধ্বংস, চলাচল ও সরবরাহে বিধিনিষেধ এবং মৌলিক সেবাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় লাখ লাখ মানুষকে অনাহার ও অপুষ্টির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো সময়ে দুর্ভিক্ষ কার্যত নিশ্চিত হয়েছে বলেও মূল্যায়নে উঠে এসেছে। যদিও পরবর্তী পর্যায়ে সীমিত পরিমাণে ত্রাণ প্রবেশে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতির কথা বলা হয়েছে, তবু গাজাকে এখনো ‘জরুরি পর্যায়ের’ খাদ্যসঙ্কটের মধ্যে রাখা হয়েছে, যেকোনো সময় পরিস্থিতি আবার ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটতে পারে। আইনি ও নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক রাষ্ট্র, মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ইসরাইল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করছে, তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করে না এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে সহায়তা করছে। তবে এ বিতর্ক এখন আন্তর্জাতিক বিচারিক পরিসরে প্রবেশ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলার পর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নির্দেশনা জারি করেছে, যেখানে গণহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এসব আদেশ এখন বৈশ্বিক বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের, বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর, ইসরাইলের সাথে সামরিক, আর্থিক বা কৌশলগত সহযোগিতার অভিযোগ অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। কারণ, যখন ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণ অনাহার, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের শিকার, তখন এ সহযোগিতা এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার বোধ তৈরি করে। তবে এখানে আমাদের সতর্ক ও নির্ভুল হওয়া জরুরি। বিভিন্ন দাবি প্রচলিত আছে; কিন্তু সব দাবি সমানভাবে যাচাইকৃত নয়। যেটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় তা হলো- ২০২৪ সালে ইসরাইলের অস্ত্র রফতানি রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে যেসব দেশের সাথে তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে, তাদের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কিছু দেশের ভ‚মিকা নিয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলেও, সেগুলোকে শক্ত ও স্বাধীন প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। তবু, বিতর্কিত অভিযোগের বাইরেও একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন থেকে যায়, গাজায় যখন বেসামরিক জনগণ এমন নৃশংস মানবিক বিপর্যয়ের শিকার, তখন মুসলিম দেশগুলোর সরকার কিভাবে একই সময়ে ইসরাইলের সাথে বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করে? এখানে বিষয়টি ‘মুসলিম বনাম ইহুদি বা খ্রিষ্টান’ নয়। রাষ্ট্র কোনো ধর্ম নয়, আর সরকারের সিদ্ধান্তের জন্য পুরো ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে দোষারোপ করাও ভুল। বাস্তবতা হলো- অনেক শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা, রাজতন্ত্র ও নিরাপত্তার স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখে। কিন্তু এ হিসাবের মূল্য দিতে হয় নৈতিকতা, জনসমর্থন ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের মাধ্যমে।

তাহলে মুসলিম দেশগুলোর করণীয় কী?
প্রথমত, তাদের হাতে থাকা প্রকৃত প্রভাব ও চাপের উপায়গুলো ব্যবহার করতে হবে। প্রতীকী বিবৃতি বা আড়ম্বরপূর্ণ সম্মেলন বোমা থামায় না, ক্ষুধার্ত শিশুদের খাবার দেয় না। যেসব দেশের সাথে ইসরাইলের ক‚টনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সমন্বিতভাবে সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করা, দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর পরিবহন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং বন্দর, আকাশপথ, ব্যাংকিং ও বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনোভাবে যেন অস্ত্র সরবরাহ সম্ভব না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। যেখানে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘনের ঝুঁকি আছে, সেখানে অস্ত্র ও সহায়তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে দাঁড়াতে হবে।

দ্বিতীয়ত, গাজাকে দাতব্য প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি রাজনৈতিক ও মানবিক জরুরি সঙ্কট হিসেবে দেখতে হবে। অর্থাৎ- সমন্বিত ক‚টনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, অবাধ মানবিক সহায়তা প্রবেশ, হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সুরক্ষা এবং ত্রাণকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের পথ বন্ধ করার লক্ষ্যে। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি বেসামরিক জনগণের টিকে থাকার জন্য খাদ্য, পানি, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আইনি জবাবদিহিকে সমর্থন করা কোনো ঐচ্ছিক বা ক‚টনৈতিক বিলাসিতা নয়, এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব, তা যত অস্বস্তিকর, সংবেদনশীল বা স্বার্থবিরোধী হোক না কেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কিংবা জাতিসঙ্ঘ-সমর্থিত অন্যান্য আইনগত কাঠামো কেবল শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য নয়; এগুলো তৈরি হয়েছে দুর্বল ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায়। যখন এ প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দেশনা দেয় বা অস্থায়ী আদেশ জারি করে, তখন সেগুলো উপেক্ষা করা মানে শুধু একটি আদালতকে নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইনের পুরো কাঠামোই অকার্যকর করে তোলা। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের নির্দেশনা কার্যকর করার দাবি ধারাবাহিকভাবে, সমন্বিতভাবে ও প্রকাশ্যে তুলতে হবে। কেবল একবার বিবৃতি দিয়ে থেমে গেলে চলবে না। ক‚টনৈতিক ফোরাম, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ, আঞ্চলিক জোট ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিষয়টি পুনরাবৃত্তি করে তুলতে হবে। মুসলিম দেশগুলোর উচিত এককভাবে নয়, যৌথভাবে অবস্থান নেয়া, যাতে এ দাবি কোনো বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে নয়; বরং একটি সম্মিলিত নৈতিক অবস্থান হিসেবে প্রতিভাত হয়। জবাবদিহি মানে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, জাতি বা ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া নয়। এটি ‘ইসরাইল বনাম ফিলিস্তিন’ বা ‘মুসলিম বনাম অমুসলিম’-এই সরল ও বিভ্রান্তিকর বিভাজনের ঊর্ধ্বে। জবাবদিহি মানে হলো- যে কেউ, যে রাষ্ট্রই হোক না কেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করলে তার জন্য প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আজ যদি এ নীতিতে আপস করা হয়, কাল সেই একই যুক্তি মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবহার হবে। সুতরাং আইনের শাসনের পক্ষে দাঁড়ানো আসলে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- নির্বাচিত নীরবতা ও দ্বৈত মানদণ্ড। যখন মুসলিম বিশ্ব আন্তর্জাতিক আইনের কথা শুধু তখন তোলে, যখন ভুক্তভোগী মুসলিম; কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে নীরব থাকে, তখন সেই অবস্থান বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। বৈশ্বিক সম্মান চাইলে নীতিগত ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। আইন সবার জন্য সমান, এই নীতিকে মুখে নয়, আচরণে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মুসলিম বিশ্ব যদি সত্যি নৈতিক নেতৃত্ব দাবি করতে চায়, তবে তাকে আবেগের ভাষা থেকে নীতির ভাষায় আসতে হবে। পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক মূল্যবোধ ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে কথা বলতে হবে। এতে হয়তো স্বল্পমেয়াদে ক‚টনৈতিক অস্বস্তি বা রাজনৈতিক চাপ তৈরি হবে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক শক্তির একমাত্র পথ।

চতুর্থত, ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন নিরসনে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিভাজন ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে দুর্বল করে, পুনর্গঠন ও প্রতিনিধিত্বকে জটিল করে তোলে। বেসামরিক সুরক্ষা ও বৈধ প্রতিনিধিত্বের ওপর ভিত্তি করে একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক কাঠামো ছাড়া কোনো টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

বিশ্বের অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর করণীয় কী?
যুক্তরাষ্ট্র ও প্রধান ইউরোপীয় শক্তিগুলোর ইসরাইলের ওপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি, তাই তাদের দায়িত্বও বেশি। বিষয়টি ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করা নয়; বরং এই নিরাপত্তা নীতিগুলো যেন আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মধ্যে থাকে এবং বেসামরিক জনগণের ব্যাপক দুর্ভোগ যেন স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেয়া না হয়, তা নিশ্চিত করা। সামরিক সহায়তার শর্ত আরোপ, ব্যবহার-পরবর্তী নজরদারি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা এবং ত্রাণ প্রবেশে কার্যকর চাপ- এসব বাস্তব উপায়। জাতিসঙ্ঘ ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোকেও মানবিক সহায়তা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে তা পূর্বানুমেয়, সুরক্ষিত ও রাজনৈতিক বাধার বাইরে থাকে। আগের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যখন সহায়তা প্রবেশ বাড়ে, তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও ঠেকানো যায়; কিন্তু এ উন্নতি খুব ভঙ্গুর। সবশেষে, চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সব প্রভাবশালী শক্তির উচিত গাজাকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চ বানানো বন্ধ করা। ন্যূনতম একটি বৈশ্বিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তার নিশ্চয়তা, সব পক্ষের আইন ভঙ্গের জবাবদিহি, বন্দীদের মুক্তি ও বেসামরিক সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রত্বসহ একটি বাস্তব রাজনৈতিক পথরেখা। এর কম কিছু হলে সহিংসতা, চরমপন্থা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার চক্র চলতে থাকবে। যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো গাজা ধ্বংস হতে থাকা অবস্থায় স্বার্থের রাজনীতি চালিয়ে যায়, তবে ইতিহাস শুধু সহিংসতার নায়কদের নয়, নীরব বা সুবিধাবাদী দর্শকদের কঠোরভাবে বিচার করবে। আর যদি বিশ্বশক্তিগুলো ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগকে ‘ব্যবস্থাপনাযোগ্য’ বলে ধরে নেয়, তবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা একে একে ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরের মতো ভেঙে পড়বে।

লেখক : গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]