প্রসঙ্গ : মেধা পাচার

গ্রামগঞ্জে তরুণরা নিজেরাই উড়োজাহাজ বানিয়ে আকাশে উড়িয়েছে, এরকম খবর মাঝে মধ্যেই শোনা যায়। এসব প্রতিভাবান তরুণের মেধার স্বীকৃতি দেয়া হয় না। উপযুক্ত স্বীকৃতিও সুযোগের অভাবে এই প্রতিভাগুলো হারিয়ে যায় বা দেশান্তরী হয়। এগুলো হারিয়ে যাওয়া মানেই পিছিয়ে যাওয়া। সিলিকন ভ্যালি প্রচুর বাংলাদেশী তরুণ জায়গা করে নিয়েছে নিজ মেধায়। জায়গা করে নিয়েছে নাসায়, বিমান ইঞ্চিন তৈরির প্রকল্পে। অথচ প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি ও সুবিধা পেলে এরাই দেশের উন্নয়নের গতিপথকে বদলে দিতে পারত।

মেধাপাচার বা Brain drain সবার জানা বিষয়। বিষয়টি নিয়ে এখন কেউ তেমন একটা ভাবেন না। কোনো দেশ থেকে শিক্ষিত, দক্ষ, চিকিৎসক, প্রকৌশলীদের উন্নত ও নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় অথবা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য স্থায়ীভাবে উন্নত দেশে পাড়ি জমানোকেই সাধারণত মেধা পাচার বলে। এতে উন্নত দেশগুলো লাভবান হয়। এর বিপরীতটা কিন্তু ঘটে না। উন্নত দেশের দক্ষ জনশক্তি অনুন্নত দেশে পাড়ি জমাচ্ছে এমনটা দেখা যায় না। দরিদ্র দেশের শিক্ষিত মানবসম্পদকে আকৃষ্ট করাতে উন্নত দেশগুলো বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ ধরনের একটি কর্মসূচি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিভি’ (Diversitys Vissa) লটারি। এর মাধ্যমে প্রচুর শিক্ষিত দক্ষ এবং কর্মক্ষম যুবশক্তি পৃথিবীর বহু দেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছে।

এই জনশক্তির মধ্যে যারা পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন নন, তারা বিভিন্ন অফিসে অড জব করে জীবন কাটাচ্ছেন। যারা উচ্চশিক্ষিত, মেধাসম্পন্ন ও দক্ষ তাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল কাজে লাগানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নতিতে এদের অবদানই বেশি। প্রতিভাবান, সৃজনশীল ও কর্মক্ষম জনশক্তিকে স্থানান্তরকরণ প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হচ্ছে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার জন্য বৃত্তি প্রদান। এর মাধ্যমে প্রতিভাবান এবং মেধাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীর সৃজনশীলতাকে এসব দেশ কাজে লাগিয়ে সভ্যতার মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

এ কারণে আমাদের মত দেশগুলো হয়ে পড়ে মেধাশূন্য এবং পশ্চাদপদ। দেশ পরিচালনার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ন্যস্ত হয় অপেক্ষাকৃত স্বল্প মেধাসম্পন্ন জনশক্তির ওপর। ফলে তারা জাতিকে সামনে এগোনোর স্বপ্ন দেখাতে ব্যর্থ হয়। সমগ্র জাতি আত্মপরিচয়ের হীনম্মন্যতায় ভোগে। যার প্রকাশ্য উদাহরণ, এ দেশের ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের পাঠ্যক্রমে দেশের ইতিহাস অনুপস্থিত। এমনকি দেশীয় সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার সাথে সম্পর্কহীন। এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর ভেতর অজান্তেই ডানা মেলে বিদেশপ্রীতি, দেশ সম্পর্কে হীনম্মন্যতার ধারণা। এরা লেখাপড়া শেষে উড়াল দেয় অন্য দেশে-যেখানে রয়েছে আর্থ সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। মেধা পাচারের আরেকটি মাধ্যম ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বিদেশে পাঠানো। এটা আরো সর্বনাশা। এতে একদিকে শিশুরা হারিয়ে ফেলে শেকড়ের সম্পর্ক, সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে দেশের সাথে, নিজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে। সাথে সাথে বেরিয়ে যায় দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।

মেধা পাচারকে মানব পুঁজি পাচারও বলা যেতে পারে। কেননা একজন সাধারণ শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থায়ী মানব পুঁজিতে পরিণত হয়। এই মানব পুঁজির যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদের উত্তরাধিকারী হওয়া সত্ত্বেও পৃথিবীর বহু দেশ পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল। অপর দিকে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, হলান্ড শুধুমাত্র মানব পুঁজির সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্বে তাক লাগানো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।

মেধাকে একটি সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। কৃষিজাত ও শিল্পজাত পণ্যের প্যাটেন্ট করার মতোই মেধাসম্পদকেও প্যাটেন্ট করা শুরু হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। আমাদের দেশে মেধাকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার চিন্তা সাধারণের তো দূরের কথা জাতীয় নেতারা ভাবছেন কিনা বোঝার উপায় নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে এ ধরনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

মেধাস্বত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০০০ সালে ২৬ এপ্রিলকে বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা। উদ্দেশ্য কিভাবে মেধাস্বত্ব পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক সভ্যতার বিকাশকে সাহায্য এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে বাস্তবায়ন করতে পারে। মেধাশক্তির কপিরাইট সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নতুন উদ্ভাবকদের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহ জোগানোর এই উদ্যোগকে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমে ছড়িয়ে দেয়া দরকার। একই সাথে মেধাস্বত্বকে স্বীকৃতি ও যথোপযুক্ত সুবিধাদি দিয়ে দেশের কল্যাণে ব্যবহার করার উদ্যোগ নিতে হবে। এতে করে বিদেশ নির্ভরতা কমবে।

একটি ঘটনার উল্লেখ ব্যাপারটিকে বুঝতে সাহায্য করবে। ঘটনাটি সম্ভবত ৯৮ সালের। মধ্যরাতে প্রায়ই রাজধানীর সাতমসজিদ রোডে কার রেসিং-এর আওয়াজ পাওয়া যেত। রেসে অংশ গ্রহণকারী একটি গাড়ি ছিল ফেরারি (Ferrari) ব্র্যান্ড এর। গাড়িটি চালাতেন গ্যারেজে কাজ করা একজন মেকানিক। হুবহু লোগোসহ এই গাড়িটি তিনি বানিয়েছিলেন সখের বসে। এই সখই তার ভাগ্যের চাকা বদলে দেয়। ফেরারি কোম্পানি তার সন্ধান পায় এবং তাকে কোম্পানিতে সরাসরি নিয়োগ দিয়ে নিয়ে যায়। অথচ দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই তার মেধাকে স্বীকৃতি দেয়নি, উৎসাহিত করেনি।

গ্রামগঞ্জে তরুণরা নিজেরাই উড়োজাহাজ বানিয়ে আকাশে উড়িয়েছে, এরকম খবর মাঝে মধ্যেই শোনা যায়। এসব প্রতিভাবান তরুণের মেধার স্বীকৃতি দেয়া হয় না। উপযুক্ত স্বীকৃতিও সুযোগের অভাবে এই প্রতিভাগুলো হারিয়ে যায় বা দেশান্তরী হয়। এগুলো হারিয়ে যাওয়া মানেই পিছিয়ে যাওয়া। সিলিকন ভ্যালি প্রচুর বাংলাদেশী তরুণ জায়গা করে নিয়েছে নিজ মেধায়। জায়গা করে নিয়েছে নাসায়, বিমান ইঞ্চিন তৈরির প্রকল্পে। অথচ প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি ও সুবিধা পেলে এরাই দেশের উন্নয়নের গতিপথকে বদলে দিতে পারত।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]