হামিদ মীর
যারা ১৪ আগস্টে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালন করেন, তাদের কিছু কথা সবসময় মনে রাখা উচিত। যদি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ অখণ্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব কবুল করতেন, তাহলে পাকিস্তান কখনো প্রতিষ্ঠা লাভ করত না। অখণ্ড ভারতে ব্রিটিশ সরকারের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কংগ্রেস নেতা মহাত্মা গান্ধীর প্রস্তাবের আলোকে কায়েদে আজমকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কায়েদে আজম এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ভেবে দেখুন, যদি আজকের পাকিস্তানের কোনো রাজনীতিবিদ কায়েদে আজমের স্থানে হতেন তাহলে তিনি কী এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতেন?
১৪ আগস্টে পাকিস্তানের অধিবাসীদের সেই ষড়যন্ত্রের কথা মনে করা উচিত, যা কায়েদে আজমের বিরুদ্ধে করা হয়েছিল, যাতে পাকিস্তান অস্তিত্ব লাভ না করে। আমরা এটি তো জানি যে, ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ বার্ষিক সভায় মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করে। কিন্তু এটি জানি না যে, এ দাবির পর কংগ্রেস কিভাবে বিভিন্ন মতাদর্শের মুসলমানদের কায়েদে আজমের বিরুদ্ধে ব্যবহার এবং তাকে পাকিস্তানের দাবি থেকে সরাতে চাপ দিতে শুরু করে।
কিছু মানুষ বলবেন, আমাদের পাকিস্তানের ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি রাখা উচিত এবং পুরনো কথা ভুলে যাওয়া উচিত। জি হ্যাঁ, আমাদের পুরনো বিদ্বেষ ও দ্ব›দ্ব ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু যখন কিছু মানুষ ইতিহাসকে বিকৃত করা থেকে বিরত না হয়, তখন ইতিহাসকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করা জরুরি। যে মুসলমানরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন, আমি তাদের নিয়ত নিয়ে সন্দেহ করি না। কিন্তু তাদের মধ্যে কিছু সম্মানিত ব্যক্তি বিরোধিতার যে ভাবভঙ্গি ধারণ করেছিলেন, তা সঙ্গত ছিল না। কংগ্রেসের অন্যতম নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কতিপয় মুসলমান নেতাকে কায়েদে আজমের বিরুদ্ধে এক প্ল্যাটফর্মে সমবেত করার চেষ্টা করেন। ২৩ মার্চ, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের জবাব দিতে ২৭ এপ্রিল, ১৯৪০ সালে দিল্লিতে আজাদ মুসলিম কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। ওই কনফারেন্সে যে দলগুলোর নেতা উপস্থিত ছিলেন তার মধ্যে মজলিসে আহরার, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, অল ইন্ডিয়া মুমিন কনফারেন্স, অল ইন্ডিয়া শিয়া কনফারেন্স, খোদায়ি খেদমতগার, জমিয়তে আহলে হাদিস ও বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি শামিল ছিল। ২৩ মার্চ, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের সাথে মিলে তাকে প্রলুব্ধ করার ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। তিনি নিজে মুসলিম কনফারেন্সে যোগদান করেননি, তবে তার দল কৃষক প্রজা পার্টির প্রতিনিধি কৃষকের সেখানে উপস্থিতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বিশাল সফলতা ছিল। ওই কনফারেন্সে ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ স্লোগান দেয়া হয়। তবে ওই স্লোগান সাধারণ মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কিছু দিন পর ব্রিটিশ সরকার এ কে ফজলুল হককে ভাইসরয়ের ডিফেন্স কাউন্সিলে অন্তর্ভুক্ত করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অখণ্ড ভারতের ভ‚মিকা পর্যালোচনা ও দেখভালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কায়েদে আজম ডিফেন্স কাউন্সিলে এ কে ফজলুল হকের অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি জানান। কেননা তিনি মুসলিম লীগের ভোটে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। মুসলিম লীগের সাথে দ্ব›েদ্বর ফলে এ কে ফজলুল হককে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়। কংগ্রেসও তার সাথে প্রতারণা করে। কংগ্রেস এক দিকে কায়েদে আজমকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল, অন্য দিকে ব্রিটিশ সরকারের সাথেও ডাবলগেম খেলছিল। কংগ্রেস নিজেদের সেকুলার বলত, অথচ বাস্তবে এক হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল।
কায়েদে আজম বুঝে ফেলেছিলেন, কংগ্রেস মূলত সেকুলারিজমের আড়ালে এক হিন্দু রাষ্ট্র গঠন করতে চাচ্ছে। কংগ্রেস নেতাদের ধারণা ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের কাছে ব্রিটিশের পরাজয় ঘটবে। কংগ্রেস ব্রিটিশের সম্ভাব্য পরাজয় সামনে রেখে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়। এটি মূলত অসহযোগ আন্দোলন ছিল। কংগ্রেস চেষ্টা করছিল, মুসলিম লীগও এতে শামিল হোক। কিন্তু কায়েদে আজম রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে সহিংসতার পথ অবলম্বনের বিরোধী ছিলেন। তিনি ১৯২০ সালেও এ কারণে কংগ্রেস ছেড়েছিলেন যে, গান্ধী সত্যাগ্রহের নামে অরাজকতা ছড়াতে চেয়েছিলেন। ১৯৪২ সালেও কায়েদে আজম গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন জানাতে অস্বীকৃতি জানান। কংগ্রেস এক দিকে পাকিস্তান দাবির বিরোধিতা করছিল, অন্য দিকে অসহযোগ আন্দোলনে মুসলিম লীগকে ব্যবহার করতে চাচ্ছিল। কায়েদে আজম ভাঙচুরের রাজনীতি থেকে দূরে থেকে মুসলিম লীগকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। কেননা তার ধারণা ছিল, গান্ধীর ডাবলগেম বেশি দীর্ঘায়িত হবে না।
কংগ্রেসপন্থী মুসলমানরা কায়েদে আজমের ওপর বেশ ক্ষুব্ধ ছিল। তারা কায়েদে আজমকে ব্রিটিশ এজেন্ট বলা শুরু করে দেয়। মজলিসে আহরারের নেতা মাওলানা হাবিবুর রহমান লুধিয়ানবি তো এ ঘোষণা দিয়ে দিলেন যে, ভারতের স্বাধীনতার পর কায়েদে আজমের বিরুদ্ধে গাদ্দারির মামলা করা হবে। খাকসার আন্দোলনও কায়েদে আজমের বিরুদ্ধে তৎপর হয়ে ওঠে। ২৬ জুলাই, ১৯৪৩ সালে মুহাম্মদ রফিক সাবির নামে এক যুবক মুম্বাইয়ে কায়েদে আজমের বিশ্রামাগারে ঢুকে খঞ্জর দিয়ে তার ওপর আত্মঘাতী হামলা করে বসে। লাহোরের মোজাঙ্গের অধিবাসী মুহাম্মদ রফিক সাবির মুম্বাইয়ে খাকসারদের দফতরে বহু সময় অতিবাহিত করে। কায়েদে আজম ওই হামলায় আহত হয়েছিলেন। আক্রমণকারীকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ওই হামলার কারণ ছিল সেই বিদ্বেষ, যা কংগ্রেস নেতারা কায়েদে আজমের বিরুদ্ধে ছড়িয়েছিলেন।
কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন ব্যর্থ হয়। ওই সময় জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয় এবং মিত্রবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে। কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের সাথে সমঝোতা করে নেয়। আমি এখানে কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম গ্রন্থের কথা উল্লেখ করতে চাচ্ছি। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ গ্রন্থের ১৫০ নম্বর পৃষ্ঠায় ইহুদিদের জন্য পৃথক ভ‚খণ্ডের সমর্থন দিয়ে বসেছেন। পক্ষান্তরে, কায়েদে আজম ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্রের কঠোর বিরোধিতা করেছেন। নিজেরা ফয়সালা করুন, ব্রিটিশ সরকারের সহায়তাকারী কে ছিলেন? ১৫৫ নম্বর পৃষ্ঠায় মাওলানা আজাদ ব্রিটিশ সরকারের সাথে তার অস্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গোমর ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ১৯৪৬ সালে জওয়াহেরলাল নেরেু কাশ্মিরে সমাবেশের চেষ্টা করলে গ্রেফতার হন। মাওলানা আজাদ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি ভাইসরয়ের সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, নেহরুর সাথে আমার ফোনে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিন। নেহরু একটি ডাকবাংলায় নজরবন্দী ছিলেন। মাওলানা আজাদ নেহরুর সাথে ফোনে কথা বলার পর ভাইসরয় লর্ড ওয়েভেলকে বললেন, নেহরু কাশ্মির থেকে ফিরে আসতে রাজি হয়েছেন, তাই তাকে বিমানে শ্রীনগর থেকে দিল্লি আনার ব্যবস্থা করুন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেহরু মুক্তি পেয়ে গেলেন। ভাইসরয়ের দেয়া বিমানে চড়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে দিল্লি ফিরে আসেন। এগুলো কী ছিল? মাওলানা আবুল কালাম আজাদের গ্রন্থ তার নিজের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগপত্র।
কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলন ও জেলে যাওয়া নিছক রাজনৈতিক নাটক ছিল। ১৪ আগস্টের শিক্ষা হচ্ছে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে বড় থেকে বড় লক্ষ্যও অর্জন করতে পারবেন। তবে এর জন্য জরুরি হচ্ছে, আপনি যেন কোনো বিদেশী শক্তির বা অরাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার না হন। শুধু জনগণের সমর্থনের সীমার মধ্যে নিজেদের আবদ্ধ করুন।
কায়েদে আজমের পেছনে কোনো বিদেশী শক্তি ছিল না। কোনো সেনাবাহিনী ছিল না। ছিল না কোনো মাফিয়া। তার পেছনে শুধু জনগণের সমর্থন ছিল। তিনি জনসমর্থনকে ভাঙচুর বা অসহযোগ আন্দোলনে ব্যবহার না করে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছেন। সেই সাথে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছেন। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রামই ১৪ আগস্টের মূল শিক্ষা।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
লেখক : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট



