শবেবরাত : মর্যাদা ও ফজিলত

প্রতীকী ছবি

মুফতি রাহমাতুল্লাহ তক্বী বিন আবদুল গনি
শব ফার্সি শব্দ, যার অর্থ রাত। বরাত আরবি শব্দ, যার অর্থ মুক্তি পাওয়া, নাজাত পাওয়া বা রক্ষা পাওয়া। তাই আরবিতে শবেবরাতকে বলা হয় লাইলাতুল বারাআত। এই রাতে অনেক বান্দার গুনাহ ক্ষমা করা হয়। এ জন্য এই রাতকে শবেবরাত বলা হয়। যেহেতু হাদিসে লাইলাতুল নিসফি মিন শাবান এসেছে, তাই লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান বলা উত্তম। অনেকে শবেবরাত বলাকে বিদয়াত মনে করেন। এটি সঠিক নয়, যেমনিভাবে সালাতকে ‘নামাজ’ বললে, সওমকে ‘রোজা’ বললেও দোষের নয়; ঠিক তেমনি লাইলাতুন নিসফি মিন শাবানকে সাধারণভাবে ‘শবেবরাত’ বললেও সমস্যা নেই। শবেবরাতের আমলের বিধান হলো— সেই রাতে আমল করা এবং পরদিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। অর্থাৎ— আমলগুলো হলো নফল। ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদা নয়। অতএব প্রতিটি আমল যথাযথ স্থানে রেখে পালন করাই প্রত্যেক মুমিনের করণীয়।

শবেবরাতের রাতে নবী করিম সা: দীর্ঘ সময় নামাজ আদায় করতেন। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা: বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ সা: নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি সিজদায় এত দীর্ঘ সময় থাকলেন যে, আমার ধারণা হলো— তিনি হয়তো ইন্তেকাল করেছেন। তখন আমি উঠে গিয়ে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়ালাম। তা নড়ে উঠল। এরপর আমি ফিরে এলাম। নামাজ শেষ করে তিনি বললেন, ‘হে আয়েশা (বা হুমাইরা)! তুমি কি মনে করেছিলে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন?’ আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম! বরং আমি মনে করেছিলাম আপনি দীর্ঘ সিজদার কারণে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি বললেন, ‘তুমি কি জানো, এটি কোন রাত?’ আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটি শাবানের মধ্যরাত্রি। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের দিকে দৃষ্টি দেন। অতঃপর তিনি ক্ষমা করেন তাদের, যারা ক্ষমার উপযুক্ত; রহম করেন তাদের, যারা রহমতের উপযুক্ত; আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতে ছেড়ে দেন।’ (ইবনে মাজাহ-১৩৮৯, মুসনাদে আহমাদ-২৬০১৮)

নবী করিম সা: এই রাতে কী আমল করেছেন আমরা তা হাদিস থেকে জানার চেষ্টা করব। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘শাবানের মধ্যরাত এলে তোমরা জেগে থাকো (অর্থাৎ ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করো) এবং দিনে রোজা রাখো; কেননা, আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের সময় দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন— কে আছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব; কে আছে রিজিক প্রার্থনাকারী, আমি তাকে রিজিক দেবো; কে আছে বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে আরোগ্য দেবো, ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ—১৩৮৮) এই হাদিসের সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও ফজিলত বর্ণনার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য।

শাবান মাসে নবী করিম সা: বেশির ভাগ সময় রোজা রেখে কাটাতেন। আম্মা আয়েশা রা: বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে রোজা পালনে সবচেয়ে প্রিয় মাস ছিল শাবান। এরপর তিনি শাবান মাসকে রমজানের সাথে যুক্ত করে রোজা রাখতেন।’ (সুনান আবু দাউদ-২৪৩১)

আম্মা আয়েশা রা: আরো বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সা:-কে কখনো কোনো মাসে সম্পূর্ণ রোজা রাখতে দেখিনি, রমজান ছাড়া। আর আমি তাঁকে শাবান মাসে যত বেশি রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য কোনো মাসে তত বেশি রাখতে দেখিনি।’ (বুখারি-১৯৬৯, মুসলিম-১১৫৬) হজরত উসামা ইবন জায়দ রা: বলেন, ‘আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি শাবান মাসে অন্য মাসের তুলনায় বেশি রোজা রাখেন কেন? তিনি বললেন, ‘এটি এমন এক মাস, যা রজব ও রমজানের মাঝখানে হওয়ায় মানুষ অবহেলা করে; অথচ এই মাসে আমলগুলো বিশ্বজগতের রব আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আর আমি পছন্দ করি আমার আমল তখন পেশ হোক, যখন আমি রোজাদার থাকি।’ (সুনানে নাসায়ি-২৩৫৭, মুসনাদ-২১৭৫৩)

নবী করিম সা: যেহেতু আইয়ামে বিজের রোজা এবং শাবান মাসে বেশির ভাগ সময় রোজা রাখতেন; তাই ১৫ তারিখে রোজা রাখা ফজিলতপূর্ণ।

আম্মা আয়েশা রা: বলেন, ‘এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ সা:-কে পেলাম না। তাঁকে খুঁজতে বের হলাম। দেখি, তিনি জান্নাতুল বাকিতে আকাশের দিকে মাথা তুলে দোয়া করছেন। তিনি বললেন, ‘হে আয়েশা! তুমি কি আশঙ্কা করেছিলে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করবেন?’ আমি বললাম, ‘আমি ধারণা করেছিলাম আপনি হয়তো অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে গেছেন।’ তখন তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা শাবানের মধ্যরাতে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের ভেড়ার লোমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করে দেন।’ (সুনানে তিরমিজি-৭৩৯)

উপরের হাদিসগুলোতে যেসব আমলের কথা বলা হয়েছে সেগুলো ছাড়া অন্য সব কর্মকাণ্ড যেগুলো শবেবরাত ঘিরে করা হয় তা সুন্নত পরিপন্থী। বিদয়াত। ভিত্তিহীন। এসব কুসংস্কার ও অহেতুক কাজের সাথে শরিয়তের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। যেমন— বাতি জ্বালানো, আলোকসজ্জা করা, নতুন কাপড় পরিধান করা, হালুয়া রুটি বা বিশেষ ধরনের খাবার তৈরি করা, আগরবাতি জ্বালানো ইত্যাদি।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল, শবেবরাত বা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ রাত। এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। শবেবরাতের আমলগুলো নফল। সেটি নফলে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। নফল কখনো সুন্নতে মুয়াক্কাদা ওয়াজিব এবং ফরজের পর্যায়ে যাবে না। ইসলামী শরিয়তে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফল, প্রতিটি আমলের মর্যাদা ও গুরুত্ব ভিন্ন ভিন্ন। শরিয়তের দৃষ্টিতে প্রতিটি আমলকে নিজস্ব স্তর ও অবস্থান অনুযায়ী পালন করা অপরিহার্য। একটির মর্যাদা অন্যটির ওপর আরোপ করা কিংবা শরিয়ত নির্ধারিত এ ক্রমবিন্যাস লঙ্ঘন করা কখনো শরিয়তসম্মত নয়।

ইসলামের মূলনীতি হলো— নফল কখনো ফরজের সমান নয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘আমি তোমাদের কোনো বিষয়ে নিষেধ করলে তা পরিহার করো, আর কোনো বিষয়ে আদেশ করলে তা সাধ্যানুযায়ী পালন করো।’ (বুখারি-৭২৮৮, মুসলিম-১৩৩৭) অতএব নফল বা সুন্নত আমলকে ফরজের ওপর প্রাধান্য দেয়া কিংবা ফরজের ন্যায় বাধ্যতামূলক গুরুত্বারোপ করা সুস্পষ্ট ভুল। একই সাথে তা গুনাহের কারণ হতে পারে। প্রতিটি আমলকে তার নির্ধারিত স্থান ও মর্যাদা অনুযায়ী পালন করা শরিয়তের দাবি। এ নীতির আলোকে বলা যায়, শবেবরাত ঘিরে যেসব আমল করা হয়, সেগুলো মূলত নফল আমল। এসব নফল আমল কখনো ফরজ, ওয়াজিব কিংবা সুন্নতে মুয়াক্কাদার মতো বাধ্যতামূলক মর্যাদা বহন করে না। শবেবরাতের আমল ও রোজা শবেবরাতের স্থানে রেখে পালন করতে হবে। এসব নফল আমলের অজুহাতে যদি ফরজ, ওয়াজিব কিংবা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ অবহেলিত হয়, তবে তা মারাত্মক ভুল ও গুনাহের কাজ।

পরিতাপের বিষয় হলো— আমাদের সমাজে অনেকে সারা বছর নামাজ রোজার প্রতি তেমন যত্নশীল থাকেন না; অথচ শবেবরাত এলে হঠাৎ করে এমন গুরুত্ব আরোপ করা হয়, যেন এক রাতের আমল দ্বীনের সব কিছু। দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, কেউ ওই রাতের নফল ইবাদতে মশগুল হয়ে ফজরের নামাজ পর্যন্ত ছেড়ে দেন। অথচ বাস্তবতা হলো— হাজার বছর নফল ইবাদত করলেও তা একটি ফরজ, ওয়াজিব কিংবা সুন্নতে মুয়াক্কাদার সমতুল্য হতে পারে না। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হলো— বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করা এবং সবার আগে ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ পালনের প্রতি সর্বোচ্চ যত্নবান হওয়া। নফল ইবাদত অবশ্যই করা যাবে, তবে তা কখনো মূল ইবাদতের বিকল্প বা সমপর্যায়ে নয়। আল্লাহ আমাদের প্রতিটি আমল কুরআন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী করার তৌফিক দান করুন। সব ধরনের বিদয়াতি কর্মকাণ্ড করা থেকে বিরত রাখুন। হিফাজত করুন। আমিন।

লেখক : ইমাম ও খতিব, রসূলবাগ জামে মসজিদ ব্যাংক কলোনি, মুগদা, ঢাকা