সংখ্যালঘু নির্যাতন : ভারত বনাম বাংলাদেশ

দিল্লি থেকে উড়িষ্যা পর্যন্ত তিনি ছোটাছুটি করছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য। রীতিমতো প্রতিবাদ করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও আজ রাস্তায়।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। অভিযোগ, এর প্রতিবাদে বাংলাদেশেও নাকি কিছু মন্দির আক্রান্ত হয়েছিল। অবশ্যই আমি নিন্দা করি। কলকাতার বাংলা একাডেমিতে এ নিয়ে একটা তুলনামূকভাবে আলোচনাসভা হয়েছিল। এক সাংবাদিক অভিযোগ তুলেছিলেন, বাংলাদেশেও বহু মন্দির ধ্বংস হয়েছিল ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায়। তার সেই অভিযোগকে অত্যন্ত সাহসের সাথেই খণ্ডন করেন ভাষা ও চেতনা সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইমানুল হক। তিনি সেদিন সাথে সাথে কলকাতার সেই সাংবাদিককে বলেছিলেন, সাংবাদিক সাহেব, ভারতের জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাবরি ধ্বংসের পর বাংলাদেশে সমগোত্রীয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে সামান্য কিছু অংশ ভেঙে দিয়েছিল। গ্রামাঞ্চলে কিছু মন্দির আক্রান্ত হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সেগুলো এক সপ্তাহের মধ্যেই রিপেয়ার বা পুনর্নির্মাণ করে দিয়েছিল। ১৯৯০ সালে এরশাদের সামরিক সরকার বা ১৯৯২ সালের খালেদা সরকারও। অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবুও ঘটনাগুলোর নিন্দা করি। বাংলাদেশে ব্লগার অভিজিৎ খুনের ঘটনার অভিযুক্তরা সাজা পেয়েছে। বাবরি ধ্বংসের সাথে যুক্ত অভিযুক্ত শীর্ষ বিজেপি ও আরএসএস নেতারা ছাড় পেয়ে যান। মালেগাঁও, হায়দরাবাদের বিখ্যাত মক্কি মসজিদ বিস্ফোরণ ও সমঝোতা এক্সপ্রেসের ঘটনার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও ঘুরপথে এই বিজেপি সরকার বেকসুর খালাস দিয়েছে। এ ছাড়াও গুজরাট গণহত্যা, সেখানকার জাহিরা সেখ, বিলকিস বানু মামলা, জাতীয় কংগ্রেসের সাতবারের সংসদ সদস্য তথা প্রবীণ গান্ধীবাদী জাতীয় নেতা এহেসান জাফরি খুনের ঘটনায় দোষীরা খালাস হয়ে যায়। মুম্বাই পুলিসের সন্ত্রাস দমন শাখার সাবেক প্রধান হেমন্ত কারাকার খুনের মামলাকেও চাপা দেয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির খুন একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। কিন্তু তৎপরবর্তী বাংলাদেশে যে ঘটনাগুলো হয়েছে তারও নিন্দা করি। এমনকি দীপু দাসের খুনের ঘটনার নিন্দা জানাই। কিন্তু দীপু দাসের খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মবলিঞ্চিংকে তীব্রভাবে ঘৃণা করি। কিন্তু ভারতে এ যাবৎ এই বিজেপির জমানায় মব করে যত খুন হয়েছে অভিযুক্তদের কি গ্রেফতার করা হয়েছে? কোনো সাজা হয়েছে? ভারতে এই নির্যাতনে যত খুন হয়েছে তার একটি পরিসংখ্যান দেয়া যেতে পারে।

৭ এপ্রিল ২০১৭, মহম্মদ সাকিল, ঝাড়খণ্ডের সোসো গ্রাম। ১৭ এপ্রিল ২০১৭, আজহার শেখ, বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ। ৩০ এপ্রিল ২০১৭, রিয়াজ উদ্দিন, নওগাঁও, আসাম। ৩০ এপ্রিল ২০১৭ আবু হানিফা, নওগাঁও, আসাম। ২ মে ২০১৭, গুলাম মহম্মদ, উত্তর প্রদেশ। ১৮ মে ২০১৭, সেখ সাজ্জাদ, পূর্ব সিংভুম, ঝাড়খণ্ড। ১৮ মে ২০১৭, সেখ হালিম, পূর্ব সিংভুম, ঝাড়খণ্ড। ১৮ মে ২০১৭, সেখ সিরাজ, পূর্ব সিংভুম, ঝাড়খণ্ড। ১৮ মে ২০১৭ নাইম সেখ, পূর্ব সিংভুম, ঝাড়খণ্ড। ১৬ জানুয়ারি ২০১৮, সাকির আলী, শাস্ত্রিনগর, রাজস্থান। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, আকবর তাম্বলি, শ্রীরামপুর, মহারাষ্ট্র। ২৮ মার্চ ২০১৮, শিবগাতুল্লøাহ রাশিদি, আসানসোল, পশ্চিমবঙ্গ। ১৯ জুন ২০১৮, তৌহিদ আনসারি, রামগড়, ঝাড়খণ্ড। ২ জানুয়ারি ২০১৯, কাবুল মিয়া, আরারিয়া, বিহার। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, মহম্মদ নিশার, পোখারিয়া, বিহার।

১৫ মে ২০১৯, নাইম আহমেদ শাহ, ভাদেরওয়া, জম্মু। ১৫ মে ২০১৯, ইয়াকির হুসাইন, ভাদেরওয়া, জম্মু। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, আকবরি হুসাইন, দিল্লি। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, হামজা, দিল্লি। ২৬ ফেব্রুয়ারি, আমিন আলি, দিল্লিø। ২৬ ফেব্রুয়ারি, বুকরে আলী, দিল্লি। ১৮ জুন ২০২০, ইসরার সাহারানপুর, উত্তর প্রদেশ।

২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫, মহাম্মদ আখলাখ, দাদরি। ১ এপ্রিল ২০১৭, পেহেলু খান, রাজস্থান। ১৭ জুন ২০১৯, তাবরেজ আনসারি, ঝাড়খণ্ড। ৬ ডিসেম্বর ২০১৭, আফরাজুল, রাজস্থান। ফেব্রুয়ারি ২০২৩, নাসির খান, রাজস্থান। ফেব্রুয়ারি ২০২৩, জুনাইদ খান, রাজস্থান। ২৭ আগস্ট ২০২৪, সাবির আলি, হরিয়ানা। ২০ জুলাই ২০২১, আকবর আলি, আলওয়ার, রাজস্থান। ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ফয়জল খান। ডিসেম্বর ২০১৭, তালিম খান, রাজস্থান। ২৯ জুন ২০১৭, আলিম উদ্দিন, রামগড়, ঝাড়খণ্ড। ২ ডিসেম্বর ২০১৭, জান্নাত আরা, তামিলনাড়ু। এপ্রিল ২০২৩, মোহা: আসাদা, উত্তর প্রদেশ। এপ্রিল ২০২৩, গুলাম আহমেদ, উত্তর প্রদেশ। এপ্রিল ২০২৫, গুলফাম, উত্তর প্রদেশ। এপ্রিল ২০২৫, শাহিদ, উত্তর প্রদেশ। জানুয়ারি ২০১৮, আসিফা বানু, কাঠুয়া মহারাষ্ট্র্র। ৩১ জুলাই ২০২৩, আজগর আব্বাস শেখ, পালঘর, মহারাষ্ট্র। ৩১ জুলাই ২০২৩, আব্দুল কাদের ভাই, পানামের, খালিদ আনসারি, চান্দৌলি জেলায়। ৩১ জুলাই ২০২৩, মহাম্মদ হুসেন, পালঘর, মহারাষ্ট্র। ৩ এপ্রিল ২০২৫, জাহানুর হক, কোচবিহার,পশ্চিমবঙ্গ। ২৫ এপ্রিল ২০২৫, মহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, গুজরাট। ১১ মে ২০২৫, জাকির কুরেশি, ছাপড়া, বিহার (আশঙ্কাজনক অবস্থায় তার বন্ধু নেহাল) ৫ ডিসেম্বর ২০২৫, মহাম্মদ আথার হোসেন, নওদা, বিহার।

এই দেশে এরকম ১৯০-এর বেশি মবলিঞ্চিং হয়েছে গেরুয়া জঙ্গি রামবাহিনীদের দ্বারা। আজ যারা শুধু বাংলাদেশ নিয়ে কেঁদে ভাসাচ্ছেন তারা খোঁজ নিয়ে দেখুন তো, এদের বেলায় বিচার চেয়েছিলেন কিনা? আর ভারতীয় আইন এদের বিচার দিয়েছে কি না?

আমি উপরের দিনগুলোতেও লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে ছিলাম, আজ বাংলাদেশের লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধেই রয়েছি। কিন্তু সত্য যেটা সেটা হলো- বাংলাদেশে এই ঘটনায় দোষীদের বা অভিযুক্তদের গ্রেফতার এবং বিচারও করা হয়। ভারতে পুরস্কৃত করা আর সম্মান জানানো হয়। এখন ভারতে বিচারব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা হচ্ছে। ভারতে ধর্মভিত্তিক ও ভাষাভিত্তিক মবলিঞ্চিং সমানভাবেই চলছে বঙ্গভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর। প্রথমত যদি সে বঙ্গভাষী ও ধর্মীয়ভাবে মুসলিম হন তাহলে তো আর রেহাই নেই। আফরাজুল-আখলাখদের দিয়ে শুরু। আর মুর্শিদাবাদের জুয়েল রানা দিয়ে শেষ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বিজেপি শাসিত রাজ্যে রীতিমতো মবলিঞ্চিং সমান হারেই চলছে। এই ঘটনা সব থেকে বিচলিত করেছে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, প্রাক্তন রেলপ্রতিমন্ত্রী ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা অধিররঞ্জন চৌধুরীকে।

দিল্লি থেকে উড়িষ্যা পর্যন্ত তিনি ছোটাছুটি করছেন পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য। রীতিমতো প্রতিবাদ করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও আজ রাস্তায়। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর করেও কোনো বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা জঙ্গি পায়নি বিজেপি সরকার। তাই বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর বিজেপি সরকারের কোপ বেশি। এটিই বাস্তবতা।

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি