মোহাম্মাদ ওয়ালিউদ্দিন তানভীর
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাণিজ্য অনেক দিন ধরেই কূটনীতির শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু সাম্প্র্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ভারত শুল্ক সমঝোতা দেখায়, আজকের বিশ্বে বাণিজ্য নীতি কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়— এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, কৌশলগত আস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন। ৬ ফেব্রুয়ারির যৌথ ঘোষণায় ওয়াশিংটন এবং নয়াদিল্লি যে সমঝোতার কথা জানিয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা কমানোর পদক্ষেপ হলেও এর ভেতরে রয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা এবং বৃহত্তর কৌশলগত হিসাব।
চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক কমিয়েছে। পারস্পরিক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৮ শতাংশে এবং ভারতের রাশিয়ান তেল কেনার কারণে আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক তুলে নেয়া হয়েছে। ফলে ভারতের ওপর কার্যকর মোট শুল্কের চাপ ৫০ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিনিময়ে ভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং রাশিয়ার তেল কেনা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে।
প্রথম নজরে এটি দুই দেশের সম্পর্কের পুনরুদ্ধার বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি অস্থায়ী সমঝোতা, যা ভবিষ্যতে আরো জটিল আলোচনার সূচনামাত্র।
একটি অসম্পূর্ণ চুক্তি
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি এখনো চূড়ান্ত নয়। মার্চে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হওয়ার কথা, যার ভিত্তিতে পরে একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি গড়ে উঠবে। এই ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কৌশল ভারতের দীর্ঘদিনের আলোচনার ধারা প্রতিফলিত করে, যেখানে দিল্লি দ্রুত সিদ্ধান্তের বদলে সময় নিয়ে সমঝোতা গড়ে তুলতে চায়।
তবে সবচেয়ে বড় অস্পষ্টতা রয়ে গেছে রাশিয়ার তেল নিয়ে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত ডিসকাউন্টে বিপুল রাশিয়ান তেল কিনেছে। একসময় তা ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছে। বর্তমানে তা কমে প্রায় ২৫ শতাংশে এসেছে; কিন্তু ভারত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।
বেসরকারি কিছু রিফাইনারি ইতোমধ্যে রাশিয়ান তেল থেকে সরে এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলো এখনো সেই পথ অনুসরণ করেনি। মস্কোও জানিয়েছে, দিল্লি তাদের কাছে এমন কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা এবং দিল্লির বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে।
ভারতের জন্য এটি এক সূক্ষ্ম কূটনৈতিক সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাশিয়ার সাথে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্কও সহজে ছিন্ন করার মতো নয়।
জ্বালানি ও বৈশ্বিক বাজার
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। ফলে তার জ্বালানি নীতির পরিবর্তন বৈশ্বিক বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটনের ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভাব্যভাবে ভেনিজুয়েলা ভারতের জন্য বিকল্প সরবরাহকারী হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি এত সরল নয়। ভেনিজুয়েলার উৎপাদন এখনো নিষেধাজ্ঞা এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সীমিত। আর তাদের তেলের গুণগত বৈশিষ্ট্য ভারতের সব রিফাইনারির জন্য উপযোগী নয়।
অন্যদিকে মার্কিন তেল আমদানি বাড়ানো সম্ভব হলেও তা রাশিয়ান তেলের মতো সস্তা নাও হতে পারে। ফলে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ জটিল করে তুলছে।
ট্রাম্পের বাণিজ্য দর্শন
এই চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য দর্শন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। ভারতের কাছ থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি পাওয়া সেই উদ্বেগের রাজনৈতিক প্রতিফলন।
কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। বর্তমানে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। যদিও প্রতিরক্ষা, জ্বালানি এবং প্রযুক্তি খাত অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সংখ্যাটি বাড়ানো সম্ভব, তবুও এটি একটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য।
সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হলো কৃষি। ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। দিল্লি বলছে, মৌলিক খাদ্যশস্য এই চুক্তির আওতার বাইরে থাকবে। তবুও কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং বিরোধী দলগুলো বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে।
আস্থার সঙ্কট
চুক্তির ঘোষণায় দুই নেতা বন্ধুত্বপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করলেও সম্পর্কের ভেতরে আস্থার কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের আগের মন্তব্য, যেখানে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে ‘ফবধফ বপড়হড়সু’ বলেছিলেন, দিল্লিতে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছিল। একই সাথে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময় ট্রাম্পের অবস্থানও নয়াদিল্লিতে সন্দেহ তৈরি করেছে। ফলে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ককে নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে।
ভারতের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস
গত কয়েক মাসে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে সুস্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নয়াদিল্লি আবারো তার পুরনো নীতি, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন জোরদার করছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত দ্রুত নতুন বাণিজ্য চুক্তি করছে। ওমান, নিউজিল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের সাথে চুক্তি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথেও বড় সমঝোতা হয়েছে। পাশাপাশি কানাডা, ইসরাইল, কাতার এবং পেরুর সাথে আলোচনা চলছে।
একই সাথে দিল্লি সক্রিয় কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে— রাশিয়া, ইউরোপ, ব্রিকস দেশ এবং কোয়াড অংশীদারদের সাথে সমান্তরাল যোগাযোগ রেখে। এই কৌশলের লক্ষ্য পরিষ্কার, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া।
একটি পরিবর্তিত সম্পর্ক
গত তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান প্রশাসন ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখেছে। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্কনীতি সেই ধারা কিছুটা বদলে দিয়েছে।
এর ফলে ভারত এখন আরো সতর্ক এবং বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করছে।
বিশ্ব যখন ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন নয়াদিল্লি বুঝতে পারছে বন্ধুত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিকল্প পথ রাখা আরো গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে তাই আবারো ফিরে আসছে একটি পুরনো নীতি :
সব পক্ষের সাথে সম্পর্ক রাখা; কিন্তু কারো ওপর নির্ভরশীল না হওয়া।
লেখক : যুক্তরাজ্য প্রবাসী আইনজীবী



