মধ্যপ্রাচ্যে আবারো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ভারসাম্যে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা পাঁচ শ’ ছাড়ানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘খুব কঠিন বিকল্প’ বিবেচনার কথা বলেছেন। এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের কাছে দেয়া এই বক্তব্য নিছক কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি নয়, বরং এটি সম্ভাব্য সামরিক উত্তেজনার রাজনৈতিক বার্তা।
পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ভূখণ্ডে হামলা চালায়, তবে পাল্টা আঘাত আসবে শুধু ইসরাইলের ওপর নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনার ওপরও। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে তিনি ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্য কার্যত একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপরেখা তুলে ধরছে।
অভ্যন্তরীণ আন্দোলন : অর্থনীতি থেকে রাজনৈতিক বিদ্রোহ
বর্তমান আন্দোলনের শিকড় মূলত অর্থনৈতিক সঙ্কটে। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও মুদ্রার অবমূল্যায়নে সাধারণ মানুষের জীবন চরম চাপে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে জীবিকার দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুতই রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন শহরে এখন শাসনবিরোধী স্লোগান শোনা যাচ্ছে। অর্থাৎ এই আন্দোলন কেবল মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
সরকারের কঠোর দমননীতি, ইন্টারনেট বন্ধ রাখা এবং হতাহতের তথ্য গোপন করার চেষ্টায় পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য মতে, নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। এতে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। একই সাথে পশ্চিমা বিশ্বে নতুন করে ‘হস্তক্ষেপ’ বিতর্ক উসকে উঠছে।
ট্রাম্পের বার্তা : চাপ নাকি প্রস্তুতি
ট্রাম্পের ‘খুব কঠিন বিকল্প’ শব্দচয়ন কৌশলগতভাবে দ্ব্যর্থক। এতে সামরিক প্রস্তুতি, নিষেধাজ্ঞা জোরদার, সাইবার অপারেশন কিংবা সীমিত বিমান হামলার ইঙ্গিত থাকতে পারে। আবার এটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে, যাতে তেহরান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই দিকেই চাপে থাকে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি হামলা মানে শুধু ইরানের সাথে সঙ্ঘাত নয়; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্থিতিশীলতার দ্বার উন্মোচন। হরমুজ প্রণালী, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামো এতে বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
ইরানের ডিটারেন্স ও প্রক্সি শক্তি
ইরানের সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারির মূল লক্ষ্য সরাসরি যুদ্ধ উসকে দেয়া নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক বার্তা পাঠানো, যাতে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে, এমনকি সীমিত সামরিক পদক্ষেপও দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তেহরানের কৌশলগত শক্তির বড় ভিত্তি হলো তাদের বিস্তৃত প্রক্সি নেটওয়ার্ক। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইরাক ও সিরিয়ার শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুথি বাহিনী শুধু আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার নয়। এরা প্রয়োজনে একযোগে বহু ফ্রন্টে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এতে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা সহজেই বহুমুখী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
অন্য দিকে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। এসব ঘাঁটির ওপর আঘাত মানে কেবল দুই পক্ষের সঙ্ঘাত নয়, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি হওয়া। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও যেকোনো সামরিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতায় ইরানের ডিটারেন্স কৌশল মূলত যুদ্ধ ঠেকানোর মনস্তত্ত্বে দাঁড়িয়ে আছে, শত্রুপক্ষকে সম্ভাব্য ক্ষতির মাত্রা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সঙ্ঘাতের দাম বাড়িয়ে দেয়া।
ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ : সঙ্কেত কী
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার মুহূর্তে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ফোনালাপ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আলোচনায় ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপের বিষয় ছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবু এই যোগাযোগ ইঙ্গিত দেয়, ওয়াশিংটন এবং তেলআবিব বিষয়টিকে কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ সঙ্কট হিসেবে দেখছে না, বরং এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
ফোনালাপ ইঙ্গিত দেয় যে, উভয়পক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইসরাইল উদ্বিগ্ন যে, ইরান ঘিরে যেকোনো উত্তেজনা তাদের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করবে, বিশেষ করে লেবানন, গাজা ও সিরিয়ার প্রক্সি বাহিনীর সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রও কৌশলগত বিকল্পগুলো যাচাই করছে, যেমন কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা সীমিত সামরিক পদক্ষেপ।
সংক্ষেপে, ফোনালাপটি শুধু কূটনৈতিক বিনিময় নয়; এটি ইঙ্গিত দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই সঙ্কটকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বা সুযোগ হিসেবে দেখছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে উভয়পক্ষের প্রতিক্রিয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।
রেজা পাহলভির আহ্বান : প্রতীকী না বাস্তব
নতুন মাত্রা যোগ করেছে নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভির আহ্বান। তিনি ইরানিদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘রাস্তা ছাড়বে না। আমি শিগগিরই তোমাদের পাশে থাকব।’ এই বক্তব্য আন্দোলনকে প্রতীকীভাবে ‘শাসন পরিবর্তনের কল্পনা’র সাথে যুক্ত করেছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবে উৎখাত হওয়া পাহলভি রাজবংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি পশ্চিমা নীতিনির্ধারণী মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। তবে বাস্তবে ইরানের অভ্যন্তরে তার সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল। ফলে তার আহ্বান আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করলেও তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক রূপান্তরের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং দেশটির অধিকাংশ জনগণ তাকে ইরানের জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে পশ্চিমের পুতুল হিসাবে বিবেচনা করে ।
শাসন কতটা টেকসই
ইরানের শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং বাসিজ মিলিশিয়ার মতো শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো। এই বাহিনীগুলো কেবল সামরিক শক্তি নয়; অর্থনীতি, প্রশাসন এবং রাজনীতির প্রতিটি স্তরে প্রোথিত। তারা জনগণের প্রতিবাদ দমন, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি প্রয়োগে অত্যন্ত কার্যকর। ইতিহাস দেখিয়েছে, এমন সুসংহত নিরাপত্তাকাঠামো ভাঙা অত্যন্ত কঠিন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এই বাহিনীর ভূমিকা ইরানের শাসন সংরক্ষণে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। বর্তমান বিক্ষোভে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণী ও মতাদর্শের মানুষ যুক্ত হলেও নেতৃত্বের অভাব এবং রাজনৈতিক ঐক্যের অনুপস্থিতি শাসন পরিবর্তনের পথ জটিল করে তোলে। একক রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়া আন্দোলনে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলা কঠিন। বিভিন্ন গোষ্ঠী ভিন্ন লক্ষ্য ও নীতি নিয়েই কাজ করছে, ফলে কোনো সুসংগঠিত বিপ্লবী কর্মসূচি গড়ে উঠতে পারেনি।
সংক্ষেপে, ইরানের শাসন বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও টেকসই। শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন শাসনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও আন্দোলন ক্রমে বেড়েই চলেছে, তবে সম্পূর্ণ শাসন পরিবর্তন বা বিপ্লবের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে সীমিত। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ বা বিদেশী চাপও সীমিত প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ অভ্যন্তরীণ ঐক্যহীনতা এবং সুসংহত নিরাপত্তা কাঠামো রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করছে।
বিদেশী হস্তক্ষেপ : সুযোগ না ঝুঁকি
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিদেশী হস্তক্ষেপের সুযোগ ও ঝুঁকি উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস দেখিয়েছে, বাইরের শক্তি সবসময় প্রত্যাশিত ফল দিতে পারে না। ১৯৫৩ সালে ইরানে বিদেশী মদদে সরকার উৎখাতের ঘটনা আজো জনমনে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অনুভূতি ও গভীর অবিশ্বাস জাগিয়ে রাখে। একইভাবে, ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতাও প্রমাণ করে, বাইরের হস্তক্ষেপ প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা, গৃহযুদ্ধ ও সামাজিক বিভাজনের জন্ম দেয়।
আজকের ইরানেও একই সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও সরাসরি শাসন পরিবর্তন ঘটানো বাস্তবে কঠিন। শক্তিশালী নিরাপত্তাকাঠামো, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং আন্দোলনের নেতৃত্বহীনতা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষা করছে। তাই বিদেশী হস্তক্ষেপ মূলত সীমিত প্রভাব ফেলে- প্রধানত কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সীমিত সামরিক সমর্থনের মাধ্যমে।
অন্য দিকে বাইরের হস্তক্ষেপের রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি পদক্ষেপ নিলে ইরানের জনগণ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলবিরোধী মনোভাব আরো তীব্রভাবে গ্রহণ করতে পারে। বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের সম্ভাবনা বেড়ে যায়, যা কেবল ইরান নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলে।
বিদেশী হস্তক্ষেপ কৌশলগতভাবে সীমিত সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ আন্দোলন ও কূটনৈতিক সংযমই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা : তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভূমিকা
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তি সমীকরণের একটি কেন্দ্র্রীয় খেলোয়াড়। শিয়া-ধর্মীয় নীতি, ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরান সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক দিকে এটি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করছে, অন্য দিকে শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো- আইআরজিসি ও বাসিজ মিলিশিয়া রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষা করছে।
ভূরাজনৈতিক জটিলতার একটি বড় দিক হলো তুরস্ক ও পাকিস্তানের অবস্থান। তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং ইরানের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানও ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও কৌশলগত কারণে ইরানের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও শক্তি সমীকরণে। এই দু’টি দেশ ইরানের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া রাশিয়া ও চীনের সাথে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পরিকল্পনাকে জটিল করে। ফলে কোনো একক সিদ্ধান্ত বা সামরিক পদক্ষেপ দিয়ে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন। প্রতিটি আঞ্চলিক খেলোয়াড়ের স্বার্থ ও অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
সংক্ষেপে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সঙ্কট কেবল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক শক্তি, রাশিয়া ও চীনের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এই সঙ্কটকে আরো জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। স্থিতিশীল সমাধান কেবল কূটনৈতিক সংলাপ ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্ভব।
উপসংহার
ইরানে চলমান আন্দোলন শাসনব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্ক সঙ্কেত। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তাৎক্ষণিক শাসন পরিবর্তনের সম্ভাবনা সীমিত। কারণ শক্ত নিরাপত্তাকাঠামো, নেতৃত্বের অভাব, সামাজিক বিভাজন এবং বিদেশী হস্তক্ষেপের ঝুঁকি আন্দোলনকে পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবে রূপ নিতে বাধা দিচ্ছে।
একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। একটি ভুল হিসাব পুরো অঞ্চলকে নতুন সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তায়।
এই বাস্তবতায় কূটনৈতিক সংযমই একমাত্র টেকসই পথ। নচেৎ ইরান সঙ্কট শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; গোটা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত



