চাই দেশপ্রেমিক সাংবাদিকতা

দেশকে স্বাধীন রাখতে গেলে, ইসলামী মানস গড়ে তুলতে হলে স্বাধীন এবং দেশপ্রেমিক গণমাধ্যমের প্রাসঙ্গিকতা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও শুধু থাকবে না, বরং এর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে।

গণমাধ্যমই নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সব। এটি আগেও যেমন সত্য ছিল, এখন আরো বেশি প্রভাব বিস্তারি হয়েছে। গণমাধ্যম এখনকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে লাভ করেছে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য ও গতিশীলতা।

এমন একটা সময় ছিল যখন রেডিও-টিভি বা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেত। একটা দৃষ্টান্ত দিই : স্যার এডমান্ড হিলারি ও শেরপা তেনজিং যেদিন ইতিহাসে প্রথম বিশ্বের সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন সেদিন এহেন একটি প্রধান বিশ্বসংবাদ বিশ্ববাসীকে জানতে দেয়া হয়নি। খবরটা ছাপা হয়েছিল এভারেস্ট জয়ের তিন দিন পর। কেননা তিন দিন পরই ছিল ব্রিটিশ মহারানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেক (করোনেশন)। এভারেস্ট জয়ের খবর ব্রিটিশ মহারানীর সিংহাসন আরোহণের খবরটিকে ম্øান করে দেবে এমন আশঙ্কায় পৃথিবীর বড় বড় বার্তা সংস্থা ও প্রধান প্রধান সংবাদপত্রকে খবরটা প্রকাশ করতে বারণ করা হয়েছিল। তৃতীয় দিনে বিশ্বব্যাপী দু’টি খবর বের হয়েছিল : Mount Everest Conqured এবং Elizabeth-II Crowned!

কিন্তু এখন দুনিয়া বদলে গেছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই জামানায় সামাজিক মাধ্যমের বদৌলতে যখনই যা কিছু ঘটছে মুহূর্তের মধ্যেই আমরা তা জানতে এবং দেখতে পাচ্ছি। এখন মানুষের হাতে হাতে টেলিডিলান, হাতে হাতে খবরের কাগজ, হাতে হাতে এপি, এএফপি, রয়টার্স, বøুমবার্গ। মোবাইল থাকা মানেই আপনি বিশ্ব তথ্য তরফে সংযুক্ত। ফলে একালে খবর চেপে রাখার সুযোগ নেই। দুঃশাসন, দুর্নীতি, দুর্ঘটনা, অপশক্তির কোনো তৎপরতা দিয়েই ঘটনা ঢেকে রাখা বা ধামাচাপা দিয়ে ফেলার আর অবকাশ নেই। ফলে লাভ হয়েছে মানুষের। মানুষ নিমেষেই জানতে পারছে সব কিছু। ঘটনা ঘটামাত্রই রটনা হয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র এবং ইনসাফ তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়েই অবাধ, ত্বরিত এবং সেন্সরযুক্ত। কোনো বড় জাগরণের কে বা কারা ‘মাস্টারমাইন্ড’ সেটা বুঝতে মানুষের এখন এতটুকু বেগ পেতে হচ্ছে না। আর এই তথ্যবিপ্লব সফল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ময়কর উত্থানের ফলেই। এই তথ্য-বিপ্লবের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে দুঃশাসনের অবসান। ২০২৪ সালে দেশে যে জগত-কাঁপানো ছাত্র-জনতার জাগরণ ঘটে গেল এবং এখনো আগ্রাসী ভারতের যে প্রকাশ্য ও গোপন ষড়যন্ত্রে আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রতি হুমকি এবং পতিত স্বৈরাচারের যত অপরাধ-অপকর্ম সে সবই আমরা জানতে ও দেখতে পাচ্ছি চোখের নিমেষেই। ফলে অবাধ তথ্য-বিপ্লবকে ‘স্যালুট জানাতেই হবে।

১৯৭১-এর স্বাধীনতার পর স্বাধীনতার সুফল থেকে জাতিকে ঠকানো হয়েছে, বঞ্চিত করা হয়েছে। এ দেশের রাজনৈতিক স্বৈরাচার স্বাধীনতার প্রথম প্রহর থেকেই মানুষের সাথে জোচ্চুরি শুরু করে। মানুষ চেয়েছে স্বাধীনতা; কিন্তু কার্যত পেয়েছি পরাধীনতার নব্য উপনিবেশবাদ। ভারতের আগ্রাসনে বিলুপ্ত হায়দ্রাবাদ, কাশ্মির, ভুটান, সিকিমের মানুষেরও যেটুকু, স্বাধীনতা অবশিষ্ট ছিল, এ দেশের ভারতীয় বশংবদ আওয়ামী-বাকশালীরা সেটুকু অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হয় যুদ্ধ করে, বুকের রক্ত ঝরিয়ে, মা-বোনের সম্ভ্রম বিকিয়ে লাভ করা স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষকে।

আমাদের দেশ ও জাতিকে শত শত বছরের মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতি থেকে সরিয়ে ভারতের টাটা, বিড়লা, মফতলাল, বাজাজ, গোয়েংকাদের শুধু বাজারেই পরিণত করা হয়নি, আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ইতিহাসের ধারা-পরম্পরা, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং শিক্ষা পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এনে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ নামে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় রাম-রাজত্বের রঙে রঞ্জিত করা হয়েছে। ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে এ দেশের বৃহত্তর জনগণের মুসলিম আত্ম-পরিচয়। এই বিজাতীয় নব্য-ব্রাহ্মাণ্যবাদী ঔপনিবেশিকতার সাথে যুক্ত হয়েছিল গণতন্ত্রের তাগিদে জন্ম নেয়া একটি জঘন্য একদলীয় খুনি স্বৈরাচার।

আমাদের গর্ব ও গরবের সেনাবাহিনীকে ম্লান করে ভারতীয় বাহিনীর একই পোশাকে এবং মানসিকতায় পিষ্ট রক্ষীবাহিনী, যে বাহিনীর হাত দিয়ে মুজিব ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে প্রায় ৪০ হাজার জাসদ ও বামপন্থী ছাত্র-কর্মীকে। আওয়ামী দুর্বৃত্তাচার এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সে দিন গর্জে উঠেছিল দৈনিক গণকণ্ঠ, সাপ্তাহিক হককথা, হলিডে, ওয়েভ, মশাল প্রভৃতি পত্রিকা। সরকারসমর্থিত আর সব পত্র-পত্রিকা পালন করেছিল নীরবতা অথবা দিয়েছিল দুঃশাসনের প্রতি সমর্থন। তবে সরকারি মালিকানায় থেকেও সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ ওই সময় দেশ জাতি ও জনস্বার্থে বেশ প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করে। এরশাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের সময় পত্র-পত্রিকাগুলোর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

দেশের সৎ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকার নীতি আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে বাম ঘরানার ‘প্রথম আলো’ এবং ডেইলি স্টার একটি বিশেষ শ্রেণীর মুখপত্র হিসেবে উদয় হয়। বাম-রাম-নাস্তিক ও ভারতপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক সেবাদাসত্বে তারা কলঙ্কিত করে এ দেশের মুক্ত বাক-স্বাধীনতাকে। এই কুচক্রী মহলকে খেয়ে না খেয়ে সমর্থন দিতে থাকে এই বাজার দখলকারী করপোরেট এবং এনজিওসহ সব এস্টাবলিশমেন্ট। অথচ আজ পর্যন্ত বড় বিনিয়োগে, সৎ ও জাতীয়তাবাদী সংবাদপত্রসেবীদের নিয়ে এর বিপরীতে কোনো শক্তিশালী মিডিয়া গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

এই শূন্যতাও খানিকটা পূরণ করছে আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, সংগ্রাম, ইনকিলাব- এ ধরনের শিকড়-দরদি কিছু গণমাধ্যম। অনেকেরই অঙ্গীকার আছে। তবে তাদের সাধ্য সীমিত। প্রচার সংখ্যা নগণ্য হওয়ায় তাদের সংবাদ বা সম্পাদকীয় অভিমত জাতীয় পর্যায়ে ভূমিকা রাখতে পারে না বা পারছে না। স্বৈরাচার কর্তৃক নিষিদ্ধ টেলিভিশন ও সংবাদপত্রগুলোর পুনঃপ্রকাশ এ সময় খুবই দরকার ছিল। কারণ ২০২৪ গত হলেও ছাত্র-জনতার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। বরং ভারতীয় আগ্রাসন এবং আওয়ামী-বাকশালী ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক আস্ফালন ও রাম-বাম-নাস্তিক কুচক্রীদের সাংস্কৃতিক দুরভিসন্ধি ঠেকাতে সত্যিকারের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধসম্পন্ন গণমাধ্যমের আবশ্যকতা এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক এবং অনিবার্য বলেই মনে হয়।

দেশকে স্বাধীন রাখতে গেলে, ইসলামী মানস গড়ে তুলতে হলে স্বাধীন এবং দেশপ্রেমিক গণমাধ্যমের প্রাসঙ্গিকতা ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও শুধু থাকবে না, বরং এর প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে। আমরা যদি আমাদের

স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং জাতিগত ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে দিতে না চাই, যদি আধিপত্যবাদী শক্তির আগ্রাসনের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে না চাই, তাহলে আমাদের পূর্ব-পুরুষদের সমস্ত অর্জন ধরে রাখতেই হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক