জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ ঘনিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দু’টি নির্বাচনী জোট প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে আবিভর্‚ত হয়েছে। তারা তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা তুলে ধরেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে সেগুলোর প্রতিফলন ঘটবে। বিএনপি অতীতে কয়েকবার নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী থেকে ২০০১ সালে গঠিত চারদলীয় জোট সরকারে দু’জন মন্ত্রী ছিলেন; সে হিসেবে রাষ্ট্রপরিচালনায় তাদের আংশিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে জামায়াতের বেশ কিছু সংসদ সদস্য ছিলেন এবং তারা সংসদীয় রাজনীতি সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। কোনো ইসলামী দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে পাশ্চাত্য মিডিয়া ও সরকারের পক্ষ থেকে একটি বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়- তারা ক্ষমতায় গিয়ে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে কি না। দেশের অভ্যন্তরে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার পক্ষ থেকেও একই প্রশ্ন তোলা হয়। ২০০১ সালে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী হলে তাকে একজন মার্কিন সাংবাদিক একই প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি তার জবাবে বলেছিলেন- জনগণ যখন চাইবে তখন শরিয়াহ আইন প্রণয়ন করা হবে।
আমাদের কাছে মনে হয়, শরিয়াহ আইন ও তার বাস্তবায়ন সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের বিভ্রান্তি রয়েছে। সেটি শুধু পশ্চিমা সমাজে নয়; আমাদের দেশের ইসলামপন্থীদের মধ্যেও অস্পষ্টতা রয়েছে।
শরিয়াহ একটি আরবি ও কুরআনিক শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে- জীবনের পথরেখা। এর সারমর্ম হচ্ছে- ন্যায়, দয়া, কল্যাণ ও প্রজ্ঞা। শরিয়াহর উদ্দেশ্য হচ্ছে- জনগণের কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে তাদের ঈমান-আকিদা, জীবন, বুদ্ধিবৃত্তি, সন্তান-সন্ততি ও সম্পদের সংরক্ষণ করা এবং তার মাধ্যমে মানুষ ন্যায়, পবিত্রতা ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন পরিচালনায় নির্দেশনা পায়। আল কুরআনের সূরা জাসিয়ার ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ শরিয়াহ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তারপর আমি তোমাকে শরিয়ার একটি পথের ওপর স্থাপন করেছি; সুতরাং তুমি তার অনুসরণ করো।’
‘মহানবী সা: মক্কি যুগে মানুষের আকিদা-বিশ্বাস ও নীতিনৈতিকতা পরিশুদ্ধকরণে অধিকতর মনোযোগ দেন। মাদানি যুগে মুসলিমরা যখন সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকল এবং ছোট্ট পরিসরে হলেও একটি মুসলিম কমিউনিটি প্রতিষ্ঠিত হলো, তখনই তাদের ব্যক্তিগত ইবাদত-বন্দেগি এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে নানা আইন-কানুন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে এ যুগে রাসূলুল্লাহ সা: তাদের লেনদেন, চুক্তি ও ক্রয়-বিক্রয়, অপরাধের বিভিন্ন শাস্তি, যুদ্ধ এবং অমুসলিমদের সাথে আচরণ প্রভৃতি বিষয়ে (শরিয়াহ) বিধান জারি করেন।’ (ড. আহমদ আলী, তুলনামূলক ফিকহ-২০১৮)
মাদানি যুগে শরিয়াহর বিধিবিধান প্রণয়নের কাজটি রাসূল সা:-এর ওহিপ্রাপ্ত নির্দেশনার সাথে সম্পর্কিত ছিল। তখন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিধিবিধান প্রবর্তন, এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং তা বাস্তবায়নে কোনো প্রকার সমস্যার উদ্ভব হলে নবী সা: নিজে তার উপযুক্ত নির্দেশনা দিতেন। মদিনাবাসী ও ইসলামী সমাজের যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো সমস্যা নিয়ে রাসূল সা:-এর কাছে যেতেন এবং তিনি তার তাৎক্ষণিক সমাধান দিয়ে দিতেন। লোকেরা নির্দ্বিধায় তা মেনে চলত। রাসূল সা:-এর জীবদ্দশায় শরিয়াহর বিধিবিধান লিখে রাখার প্রয়োজনীয়তা কেউ সেভাবে উপলব্ধি করত না। তবে আল কুরআন যেহেতু সব আইনের প্রধান উৎস, সেহেতু তা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হতো। বিলম্বে হলেও রাসূল সা:-এর হাদিসের বিরাট অংশও লিপিবদ্ধ হয়। হাদিস লিপিবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে ইসলামী আইনের আরেকটি উৎস ইজমা সম্পর্কেও বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
ড. আহমেদ আলীর মতে, ‘নবুয়তের যুগে ইসলামী ফিকহ সম্পূর্ণ বিদেশী আইন-কানুনের প্রভাবমুক্ত ছিল। কেননা রাসূল সা: ছিলেন উম্মি, যিনি কখনো কোনো উস্তাদের সামনে বসে লেখাপড়া শেখেননি। উপরন্তু তিনি এমন একটি জাতির মধ্যে বড় ও লালিত-পালিত হন, যাদের না সম্পর্ক ছিল রোমান আইনের সাথে, না অন্য কোনো আইনের সাথে। তবে রাসূল সা: যে সমাজে বসবাস করতেন, সেখানে ব্যবসাবাণিজ্য, লেনদেন, কৃষি, বিয়েশাদি ও দণ্ডবিধি প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবশ্যই কিছু প্রথা ও রীতি প্রচলিত ছিল। তন্মধ্যে কোনো কোনোটিকে রাসূল সা: বহালও রেখেছেন, কোনোটিকে সংশোধন করেছেন, আবার কোনোটিকে রদ করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহর যুগে ইসলামী শরিয়াহ পরিপূর্ণতা অর্জন করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি তা কার্যত বাস্তবায়নও করেছেন।’ রাসূল সা:-এর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে শরিয়াহর বিধিবিধান পূর্ণতা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পরিপূর্ণ করলাম এবং আমি তোমাদের জন্য দ্বীনরূপে ইসলামকে মনোনীত করলাম। (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াত-৩)
বস্তুত কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে শরিয়াহর বিধিবিধানের মূলনীতিগুলো নির্ধারিত হয়ে যায়। তবে লক্ষণীয়, রাসূল সা:-এর কাছে এক দিকে যেমন শরিয়াহর বিধান-সংক্রান্ত ওহি এক দিনে নাজিল হয়নি, তেমনি রাসূল সা: তাঁর জীবদ্দশায় আল্লাহর নির্দেশে বিভিন্ন বিধানগুলো ক্রমান্বয়ে কার্যকর করেছেন। মাক্কি জীবনে এরূপ শরয়ি বিধান কার্যকর করার দৃষ্টান্ত নেই। শুধু মাদানি জীবনে প্রধান প্রধান শরয়ি বিধান বাস্তবায়ন করা হয়। ‘এর সুফল দাঁড়িয়েছিল এই যে, পরবর্তী সময়ে যতই নতুন নতুন ঘটনা ও পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে, ইসলামী আইনের পরিসর ক্রমান্বয়ে ততটাই ব্যাপ্তি লাভ করেছে এবং এভাবে ফিকহ শাস্ত্র অতি বিস্ময়করভাবে ব্যাপক, গভীর ও সর্বজনীন জ্ঞানের আধাররূপে পরিগণিত হয়।’ (আহমেদ আলী)
খোলাফায়ে রাশেদা ও পরবর্তী যুগে বহু ভ‚খণ্ড মুসলিম খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হতে থাকে। সেসব এলাকার বিভিন্ন জাতির নিজস্ব কিছু আইন-কানুন ও প্রথা প্রচলিত ছিল। এসবের মধ্যে যেগুলো ইসলামের মৌলিক বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ছিল মুসলিমদের জন্য তা প্রযোজ্য ছিল না। পরবর্তী সময়ে সামাজিক উন্নতি ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ফলে নানাবিধ রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হয়, যার শরিয়াহভিত্তিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। রাসূল সা:-এর সাহাবিদের মধ্যে যারা জীবিত ছিলেন তারা শরিয়াহ বিধান-সম্পর্কিত জ্ঞানে সমৃদ্ধ ছিলেন। তারা নিজেদের চিন্তা-গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে এমন নিখুঁত সমাধান দেন, যার ফলে অন্য কোনো উৎস থেকে কোনো কিছু ধার করার প্রয়োজন হয়নি। মূলত সাহাবিরা কোনো বিষয়ে কুরআন ও হাদিস থেকে সুস্পষ্ট ও সরাসরি দলিল না পেলে ফকিহদের সম্মিলিত অভিমত (ইজমা) এবং ফকিহদের ব্যক্তিগত গবেষণাপ্রসূত অভিমত (কিয়াস) অনুযায়ী ফয়সালা করতেন। পরবর্তী মুসলিম স্কলাররাও এ নীতি-পদ্ধতি চালু রাখেন। উমার রা: কুরআন ও হাদিস থেকে সুস্পষ্ট ও সরাসরি দলিল না পেলে আবু বকর রা:-কে অনুসরণ করে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের জমায়েত করে তাদের পরামর্শ চাইতেন এবং কোনো বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করলে সে অনুযায়ী ফয়সালা দিতেন। এর ফলে ‘পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সর্বসম্মতভাবে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো, তা ইসলামী শরিয়তে একটি অকাট্য আইনের মর্যাদা লাভ করে।’ কিয়াসের ক্ষেত্রে নানা ব্যক্তির গবেষণার ফল বিভিন্ন রকম হওয়ার ফলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ইমামের অনুসারে বিভিন্ন মাজহাবের উদ্ভব হয়। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মাজহাবের অনুসারীদের প্রাধান্য দেখা যায়। তবে এর মধ্যে ইসলামের মৌলিক বিষয় তথা কুরআন-সুন্নাহর ব্যাপারে বড় কোনো বিরোধ নেই।
বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে শরিয়াহর বিধিবিধান আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপকভাবে কার্যকর রয়েছে। এখানে সিভিল আইনের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পারিবারিক আইন চালু রয়েছে। বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে সন্তানের জন্মের পর আজান দেয়া, আকিকা করা, সুন্দর নাম রাখা, সালাম দেয়া, মা-বাবাকে মান্য করা, বিয়ে, স্ত্রী ও সন্তানের খোরপোষ, ওয়ালিমা, তালাক, মিরাস বণ্টন, হেবা, ওসিয়ত, ওয়াক্ফ, কর্জে হাসানা, জাকাত আদায়, দান-খয়রাত, মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফন, ধর্মীয় শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় শরিয়াহ অনুসারে সম্পাদন করা হয়ে থাকে। এসব বিষয় আমাদের সংস্কৃতিরও অঙ্গ হয়ে গেছে। অন্য দিকে বাংলাদেশে শরিয়াহ-ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশ জনপ্রিয়। কয়েক ডজন পূর্ণাঙ্গ ও আংশিক ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছে। এ ছাড়া বীমা খাতেও শরিয়াহ-ভিত্তিক বীমা কোম্পানি চালু রয়েছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শরিয়াহ নীতি অনুসরণ নিশ্চিত করতে শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা হয়ে থাকে। অন্য দিকে ইসলামী সামাজিক অর্থায়ন তথা জাকাত, সদাকা, ওয়াক্ফ তহবিল শরিয়াহ মোতাবেক ব্যবহার করে অসহায় দরিদ্রদের সহায়তা করা হচ্ছে।
আমাদের সিভিল ল পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ধরনের আইন থেকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এসব আইনের সাথে ইসলামী শরিয়াহর বিরাট সামঞ্জস্য রয়েছে। যেসব আইন মানুষের কল্যাণে তৈরি করা হয়, তার সাথে ইসলামের তেমন সংঘর্ষ নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, পাশ্চাত্যের বহু আইন মূলত ইসলামী শরিয়াহ আইনের মর্ম থেকে ধার করা হয়েছে। পাশ্চাত্যের আইনগুলোর ভিত্তি হচ্ছে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকদের একটি সামাজিক চুক্তি। পক্ষান্তরে ইসলামী আইন হচ্ছে মহান আল্লাহর আদেশ। ইসলামী দর্শনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন করে থাকে। শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভি (রহ:) জাহিলি যুগে আরবে প্রচলিত ভালো নিয়ম-কানুন ও প্রথাগুলোকে ইসলামী শরিয়াহর উপকরণ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বাংলাদেশে শরিয়াহ আইনের গভীরতা ও গুরুত্ব এতটা বেশি যে, বিভিন্ন সেক্যুলার রাজনৈতিক দলও তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে শরিয়াহ-বিরোধী আইন পাস না করার অঙ্গীকার করে থাকে।
শরিয়াহ আইন সব মুসলিম দেশে কমবেশি চালু রয়েছে, কোনো কোনো দেশে পৃথক শরিয়াহ আদালতও রয়েছে। এমনকি যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও মুসলিম নাগরিকদের জন্য শরিয়াহ আইন ও আদালত রয়েছে।
যারা শরিয়াহ আইনের বাস্তবায়নের ব্যাপারে উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তারা মূলত মারাত্মক অপরাধের শাস্তির বিষয়টিকে বিবেচনা করে থাকেন। বিশেষ করে চুরি, হত্যাকাণ্ড, অঙ্গহানি, জেনা প্রভৃতি বিষয়ে ইসলামী শরিয়াহ যে কঠোর বিধিবিধান দিয়েছে তা কিভাবে কার্যকর করা হবে, সে সম্পর্কে জানতে চান। পাশ্চাত্যের কোনো কোনো দেশে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করা হয়েছে। সৌদি আরবের মতো প্রকাশ্যে কতল বা আফগানিস্তানের মতো জেনার প্রকাশ্য শাস্তি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলে থাকেন।
শরিয়াহ-ভিত্তিক প্রধানত চারটি আইন রয়েছে : যেমন- কিসাস, দিয়াত, হুদুদ, তাজির (দৃষ্টান্তমূলক আইন)। আমাদের দেশে এগুলো হুবহু কার্যকর নেই। তবে সিভিল আইনে মারাত্মক অপরাধের জন্য যে মৃত্যুদণ্ড, কারাদণ্ড, জরিমানা ইত্যাদি শাস্তির বিধান রয়েছে সেগুলো শরিয়াহর আইনের সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ বা সাংঘর্ষিক তা বৈশ্বিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা আছে। বিশেষ করে তাজিরের আওতায় দেশের নাগরিকদের কল্যাণে দেশের পার্লামেন্ট যেকোনো আইন, বিধিবিধান প্রণয়ন করতে পারে। যেসব মুসলিম দেশে এসব বিষয়ে শরিয়াহ আইন কার্যকর রয়েছে, আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখতে পারি। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন হবে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ গাজী শামছুর রহমান যে মন্তব্য করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইসলামী আইন বিধিবদ্ধকরণ বোর্ডের সভাপতি হিসেবে ‘বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন’ শীর্ষক পুস্তকের মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘ইসলামী আইনের উপরে দুরপনেয় কলঙ্ক লেপন করিয়া ইহাকে এই দেশ হইতে বিতাড়ন করা হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। ইসলামী আইন বিধিবদ্ধ হইলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হইবে, ইহার অবয়ব কলঙ্ক-কালিমায় লিপ্ত নয়; বরং ইহা সর্বকালীন উপযোগিতার দীপ্তিতে ভাস্বর।’ তিনি আরো বলেন, ‘সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কোথাও সমগ্র ইসলামী বিধান বিধিবদ্ধ করা হয়নি। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর- প্রভৃতি দেশে খণ্ডাকারে ইসলামী আইন বিধিবদ্ধ হইয়াছে মাত্র। বাংলাদেশে বিয়ে, বিয়েবিচ্ছেদ, অভিভাবকত্ব প্রভৃতি কয়েকটি বিষয়ে বিধিবদ্ধ আইন বিদ্যমান। কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি ইসলামী আইন অনুসারী নহে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড, ইহার অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি পরিচালনার জন্য এই পর্যন্ত যেসব আইন প্রণীত হইয়াছে উহা ইসলামী শরিয়াহর আলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যাইতে পারে। এই জন্য আধুনিক আইনের পণ্ডিত, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ও ফকিহ আলেমদের সমন্বয়ে এক বা একাধিক কমিটি গঠন করিয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার এই কাজ সম্পন্ন করা যাইতে পারে।’ আগামী জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যদি বাংলাদেশে কোনো ইসলামী দল ক্ষমতায় আসতে পারে, তাহলে তারা গাজী শামছুর রহমানের পরামর্শ মতো কাজ করতে পারেন। তড়িঘড়ি করার মতো কাজ এটি নয়।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব



