সম্ভবত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম আমরা এমন একটি দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম— নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী দলের নেতা তারেক রহমান সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামের সাথে। সঙ্ঘাত, অবিশ্বাস এবং চরম দ¦ন্দ্বে অভ্যস্ত আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই সাধারণ সৌজন্য আচরণ গভীর প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশের বিজয়ী রাজনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে সৌজন্য প্রদর্শনের বদলে শত্রুতা দেখিয়েছে। নির্বাচন মানেই ছিল অভিযোগ, উত্তেজনা, রাস্তার অস্থিরতা এবং তীব্র মেরুকরণ। সেই প্রেক্ষাপটে এই ধরনের একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ রাজনীতির ভাষা ও ভঙ্গিতে আশাপ্রদ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এটি দেখায় যে গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্থায়ী শত্রুতার সমার্থক নয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা সম্ভব।
এ ধরনের পদক্ষেপের গুরুত্ব অনেক। এটি শুধু শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য নয়, তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছেও একটি বার্তা পৌঁছে দেয়। যখন শীর্ষ নেতারা সংযম, পরিপক্বতা ও সম্মান প্রদর্শন করেন, তখন তা নিচের স্তরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। উপর মহলের সৌজন্য নিচের স্তরের সঙ্ঘাত কমাতে সহায়তা করতে পারে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা বহুবার সহিংসতায় রূপ নিয়েছে— সেই বাস্তবতায় এ ধরনের প্রতীকী উদ্যোগ স্থিতিশীলতার পথে সহায়ক হতে পারে। জুলাই বিপ্লবের পর জনগণ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা কেবল মুখ বদল দেখতে চায় না, তারা মানসিকতা ও আচরণের পরিবর্তন দেখতে চায়। নেতৃত্বের পরিবর্তন যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনে প্রতিফলিত না হয়, তবে সেই পরিবর্তন স্থায়ী হয় না। মানুষ এখন এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে ক্ষমতার লড়াই থাকবে; কিন্তু তা হবে নীতির ভিত্তিতে; যেখানে বিরোধিতা থাকবে; কিন্তু তা হবে শালীনতার সাথে; যেখানে সমালোচনা থাকবে; কিন্তু তা হবে তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল।
রাজনীতিতে সহিংসতা, প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন ও বিভাজনমূলক বক্তব্য একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন মানেই উত্তেজনা, মতবিরোধ মানেই শত্রুতা— এই মানসিকতা থেকে জাতি বেরিয়ে আসতে চায়। জনগণ চায় রাজনৈতিক দলগুলো বুঝুক যে ভিন্নমত গণতন্ত্রের শক্তি, দুর্বলতা নয়। মতাদর্শগত পার্থক্য থাকবে— এটিই স্বাভাবিক; কিন্তু সেই পার্থক্য যেন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য হুমকি না হয়। মানুষ চায় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হোক কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে, উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তিতে, সুশাসনের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। তারা আর দেখতে চায় না ঘৃণার রাজনীতি, বিভাজনের কৌশল বা একে অপরকে অযোগ্য প্রমাণ করার জন্য অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত চরিত্রহনন, মিথ্যা প্রচার বা উত্তেজনাপূর্ণ বয়ান জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে— এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তি চায় জনগণ।
তারা চায় সংসদ হোক বিতর্কের মঞ্চ, রাস্তা নয় সংঘর্ষের ক্ষেত্র। তারা চায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়ে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ রক্ষক হিসেবে কাজ করুক। তারা চায় বিরোধী দলকে কোণঠাসা না করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হোক। কারণ একটি সুস্থ গণতন্ত্রে শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলও অপরিহার্য। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ চায় রাজনৈতিক ভাষা মানবিক হোক। মতভেদ থাকুক; কিন্তু তা যেন বিদ্বেষে রূপ না নেয়। বিতর্ক থাকুক; কিন্তু তা যেন ব্যক্তি আক্রমণে পরিণত না হয়। রাজনীতি যেন মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতির মাধ্যম হয়, ভয়ের কারণ নয়। রাজনীতিবিদরা যেন বুঝতে পারেন— তারা প্রতিদ্বন্দ্বী-শত্রু নন, তারা মতভিন্ন; কিন্তু জাতীয় স্বার্থে সহযাত্রী। জুলাই বিপ্লব একটি প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে— একটি নতুন রাজনৈতিক নীতিমালার, যেখানে শালীনতা, সহনশীলতা, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তি হবে মূল ভিত্তি। এখন সময় সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার। কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রূপান্তরই পূর্ণতা পায় না। গণতন্ত্র তখনই পরিণত হয়, যখন রাজনৈতিক নেতারা বোঝেন, আজকের প্রতিপক্ষ আগামী দিনের জাতীয় স্বার্থে সহযোগী হতে পারে। সৌজন্য সাক্ষাৎ বা পারস্পরিক সম্মান কোনো রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে না; বরং গণতান্ত্রিক বৈধতাকে শক্তিশালী করে। এটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ, অনিশ্চয়তার নয়। এটি দেখায় যে শাসন পরিচালনা প্রতিহিংসা নয়, সংলাপ ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমেও সম্ভব।
যদি এই উদ্যোগ বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন রূপ দিতে পারে। কল্পনা করা যায় এমন একটি পরিবেশ, যেখানে ভিন্ন মতাদর্শের নেতারা শত্রুতা ছাড়া আলোচনায় বসেন; সংসদীয় বিতর্ক রাস্তার সংঘর্ষের বিকল্প হয়; নীতিগত মতভেদ ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয় না এবং নির্বাচনী বিজয় প্রতিপক্ষের অপমানের কারণ হয় না। এমন পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়, অর্থনৈতিক আস্থা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বাড়াবে। তারেক রহমানের এই পদক্ষেপ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নেতৃত্ব শুধু নীতিনির্ধারণ করবে না; নেতৃত্ব উদাহরণ সৃষ্টি করা। সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে দৃঢ় আদর্শ বজায় রেখেও রাজনৈতিক ভদ্রতা সম্ভব। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধারাবাহিকতা। একটি ভালো সূচনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা নিয়মিত চর্চায় পরিণত হবে— সঙ্কটের সময়েও, মতবিরোধের সময়েও।
বাংলাদেশ আজ সত্যিই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, গণ-আন্দোলন, রাজনৈতিক পালাবদল— সব মিলিয়ে জাতি যেন এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে। এই মুহূর্তে জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা আর পুরনো দ্বন্দ্ব, প্রতিহিংসা ও বিভাজনের রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না। তারা এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে চায়, যেখানে রাজনীতি হবে উন্নয়নের হাতিয়ার— সঙ্ঘাতের নয়। মানুষ আজ উন্নয়ন চায়; কিন্তু কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; তারা চায় মানবিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি, যুবসমাজের কর্মসংস্থান— এ সব বিষয় এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। জনগণ চায় বাস্তব ফলাফল, প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নয়। তারা ন্যায়বিচার চায়— নির্বাচনী ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক ন্যায়বিচার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। আইনের শাসন এমন হতে হবে, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। বিচারব্যবস্থা হতে হবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ, যাতে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে তাদের অধিকার সুরক্ষিত। প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা— এটিই আজকের চাহিদা।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখন একটি জরুরি প্রয়োজন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে। জনগণ চায় স্থিতিশীলতা, যাতে ব্যবসায়-বাণিজ্য স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয় এবং প্রবাসী আয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়। একটি সুসংহত অর্থনৈতিক নীতি ছাড়া রাজনৈতিক পরিবর্তন অর্থবহ হবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— মানুষ জাতীয় ঐক্য চায়। বিভাজনের রাজনীতি দীর্ঘদিন সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের আলাদা করে দেখা, এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় দেশ। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করলেও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে ন্যূনতম ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে। জনগণ চায় নির্বাচনে হোক প্রতিদ্বন্দ্বিতা— এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকুক সহযোগিতা, এটিই গণতন্ত্রের পরিপক্বতা। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে নীতিগতভাবে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থে একসাথে কাজ করবে— এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, বৈদেশিক নীতি— এসব মৌলিক বিষয়ে একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য থাকা উচিত।
অন্তহীন প্রতিহিংসার চক্র থেকে বেরিয়ে এসে যদি সহযোগিতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে সেটিই হবে প্রকৃত পরিবর্তন। ইতিহাস দেখায়, যেসব দেশ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন নিশ্চিত করতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথেই এগোতে পারে— যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। এই সন্ধিক্ষণ তাই শুধু একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত নয়; এটি একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষার সময়। জনগণ প্রস্তুত নতুন অধ্যায়ের জন্য। এখন দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের— তারা কি প্রতিহিংসার পথ বেছে নেবে, নাকি ঐক্য, উন্নয়ন ও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। ইতিহাসের পাতা সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
সৌজন্য দুর্বলতা নয়; এটি আত্মবিশ্বাসের শক্তি। সম্মান প্রদর্শন আত্মসমর্পণ নয়; এটি স্থিতিশীলতার ভিত্তি। যদি এই রাজনৈতিক পরিপক্বতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তবে বাংলাদেশ স্থিতিশীল ও পরিণত গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে— যেখানে ক্ষমতার পালাবদল শান্তিপূর্ণ হবে, বিরোধী মত সম্মান পাবে এবং শাসন হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখন প্রত্যাশা— এই ইতিবাচক পরিবর্তন ভবিষ্যতে বহুগুণে বৃদ্ধি পাক। এটি যেন এককালীন ঘটনা না হয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা হয়। জাতি তাকিয়ে আছে। জনগণ প্রস্তুত। তারা চায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব— এই শুভসূচনাকে মর্যাদা, সংযম ও গণতান্ত্রিক সম্মানের স্থায়ী চর্চায় রূপ দেবে।
লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক



