জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রূপান্তরকালে এক দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্য দিকে রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোট- এই যুগপৎ রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে। বিশেষ করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রশ্নে বিএনপির দোদুল্যমানতা নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্পষ্ট সমর্থন কিংবা সুস্পষ্ট বিরোধিতা- কোনোটিই না করে দলটির এই মাঝামাঝি অবস্থান ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
সংস্কার বনাম ক্ষমতার দ্বন্দ্ব
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সম্মতি নয়; এটি জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক বৈধতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ এবং একটি নতুন সামাজিক চুক্তিকে নীতিগত স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্ন। বিএনপির দ্বিধা মূলত এখানেই- সংস্কার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করলে তা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার কৌশলকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেই হিসাব দলটি এখনো স্পষ্ট করতে পারেনি।
এই দোদুল্যমানতা বিএনপির ভেতরে একটি পুরনো দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে এসেছে- দলটি কি কেবল ক্ষমতা পুনর্দখলের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশীদার হবে?
রাজনৈতিক বয়ানের দুর্বলতা
বিএনপি দেশের অন্যতম বৃহৎ গণভিত্তির দল। ফলে গণভোটের মতো একটি জাতীয় প্রশ্নে তাদের অস্পষ্ট অবস্থান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। মাঠপর্যায়ে বিএনপি সমর্থকদের কাছেও স্পষ্ট নির্দেশনা নেই- ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন, নাকি নীরব থাকবেন। এ অবস্থান বিএনপির বয়ানকে দুর্বল করছে। যেখানে নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো সংস্কার ও গণভোটকে সামনে রেখে স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছে, সেখানে বিএনপির দ্বিধা দলটিকে রক্ষণশীল ও স্ট্যাটাস-কো রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ করে দিচ্ছে।
নৈতিক উচ্চভূমি হারানোর আশঙ্কা
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পক্ষের একটি বড় শক্তি হচ্ছে নৈতিক অবস্থান- জন-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা সংস্কারের দাবি। বিএনপি যদি এখানে স্পষ্টভাবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই নৈতিক উচ্চভূমি তাদের হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত, তরুণ ভোটার ও জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশের কাছে বিএনপির এই দ্বিধা নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তারা প্রশ্ন তুলছে- গণইচ্ছার সরাসরি প্রকাশে বিএনপির আস্থা কোথায়?
জোট রাজনীতিতে চাপ ও দরকষাকষির অবস্থান
বিএনপির অবস্থান জোট রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ১১ দলীয় জোটের শরিকদের একটি অংশ যদি তুলনামূলকভাবে ‘হ্যাঁ’র দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে বিএনপির নেতৃত্বগত কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। আসন সমঝোতা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
গণভোটে যদি ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়, তাহলে যারা শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়ার পক্ষে স্পষ্টভাবে অবস্থান নিয়েছে, তারা ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারে নৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রাধান্য দাবি করবে। বিএনপির দোদুল্যমানতা সেই দরকষাকষির ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
রাজনীতিতে তখন একটি শক্তিশালী আখ্যান দাঁড়াতে পারে- সঙ্কটকালে যারা পাশে ছিল না, তারা পরে নেতৃত্ব দাবি করতে পারে না।
রাজনৈতিক সুবিধা কী
যদি শেষ পর্যন্ত গণভোটে ‘না’ সমর্থনের পথে যায়, তাহলে তারা আদৌ কোনো রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে কি না। এ অবস্থান বিএনপির জন্য একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও, অন্য দিকে কিছু স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত লাভের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
‘না’ সমর্থনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো-
বিএনপি নিজেদের রাজনীতিকে স্পষ্টভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক ও সংসদীয় ধারায় সীমাবদ্ধ রাখতে পারবে। দলটি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে- জনগণের রায় নির্ধারিত হবে নির্বাচনের মাধ্যমেই, অতিরিক্ত সংস্কার বা গণভোটের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়া উচিত নয়।
এই অবস্থান নিয়ে বিএনপি দাবি করতে পারে- গণভোট নয়, নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রধান ও বৈধ পথ। এতে করে তারা ঐতিহ্যগত ভোটারদের কাছে নিজেদের পরিচিত রাজনৈতিক চরিত্র অটুট রাখতে পারবে।
পুরনো ভোটব্যাংক সংহত রাখার সুযোগ
বিএনপির একটি বড় সমর্থকগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে- পরিবর্তনের চেয়ে স্থিতিশীলতা, আন্দোলনের চেয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের নির্বাচনী পথ বেশি পছন্দ করে। ‘না’ সমর্থনের মাধ্যমে বিএনপি এই ভোটারদের আশ্বস্ত করতে পারে যে, দলটি কোনো অনিশ্চিত বা পরীক্ষামূলক রাষ্ট্রকাঠামোর পক্ষে নয়, তারা পরিচিত শাসনব্যবস্থার মধ্যেই ক্ষমতায় যেতে চায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও প্রথাগত সমর্থকদের মধ্যে এটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সংস্কার নিয়ে চাপ ও আওয়ামী ভোটের সমর্থন
গণভোটে ‘না’ সমর্থন বিএনপিকে একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নিতে সাহায্য করবে।
দলটি তখন বলতে পারবে, সংস্কার প্রক্রিয়া সর্বজনীন ঐকমত্যের প্রতিফলন নয়, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সব অংশের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এর মাধ্যমে বিএনপি- সংস্কারের সময়সীমা, নির্বাচন পেছানোর যৌক্তিকতা, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা এসব প্রশ্নে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারবে। বিএনপি যদি ‘না’-তে স্পষ্ট অবস্থান নেয়, তাহলে ১১-দলীয় জোটের ভেতরে নেতৃত্বের প্রশ্নে তারা নিজেদের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে।
বিশেষ করে যদি শরিকদের কেউ কেউ দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, বিএনপি তখন বলবে- জোটের মূল সিদ্ধান্তের কেন্দ্র এখনো তারাই। এটি স্বল্পমেয়াদে জোট নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণভোট-পরবর্তী সংস্কার বাস্তবায়ন যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হয়, জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে, বা নতুন জটিলতা তৈরি করে- তাহলে বিএনপি ভবিষ্যতে বলতে পারবে, ‘আমরা তখনই সতর্ক করেছিলাম’। এই দায় এড়ানোর সুবিধাটি বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত লাভ।
বিএনপি আরেকটি বড় সুবিধা মনে করছে- ‘না’ ভোটের পক্ষে থাকলে আওয়ামী বলয়ের সমর্থন পাওয়া যাবে। দীর্ঘমেয়াদের সুবিধার চেয়েও স্বল্পমেয়াদের এ সম্ভাবনা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
সুবিধার চেয়ে ঝুঁকি বেশি?
‘না’ সমর্থনে বিএনপির সুবিধাগুলো মূলত স্বল্পমেয়াদি ও কৌশলগত। এর বিপরীতে ঝুঁকিগুলো অনেক বেশি কাঠামোগত- জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তরুণ ও প্রথমবারের ভোটারদের কাছে সংস্কারবিরোধী ভাবমর্যাদা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র সংস্কারে দরকষাকষির ক্ষমতা হারানো।
চূড়ান্তভাবে, গণভোটে ‘না’ সমর্থনের মাধ্যমে বিএনপি কিছুটা লাভবান হতে পারে- নির্বাচনী রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, পুরনো আওয়ামী ভোটব্যাংক সংহত করা, অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপে রাখা- এই তিন ক্ষেত্রে।
তবে দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থান বিএনপিকে এমন একটি জায়গায় দাঁড় করাতে পারে, যেখানে দলটি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের নয়; বরং পরিবর্তন প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
ফলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ প্রশ্নে বিএনপির দোদুল্যমানতা আপাতদৃষ্টিতে কৌশলগত নীরবতা মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। স্বল্পমেয়াদে এটি ভোটার বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, মধ্যমেয়াদে দলীয় বয়ানকে দুর্বল করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিএনপির গণতান্ত্রিক পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তুলতে পারে।
আর এ কারণে রাষ্ট্র যখন একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে এগোচ্ছে, তখন স্পষ্ট অবস্থান না নেয়ার খরচ বিএনপিকে ভবিষ্যতে চড়ামূল্যই দিতে হতে পারে। রাজনীতিতে তাই প্রশ্নটি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে- বিএনপির ‘না’ কি কৌশলগত প্রজ্ঞা, নাকি এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে আত্মপ্রান্তিক হওয়ার ঝুঁকিই তৈরি করছে?
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত



