একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য এবং নির্বাচিত সদস্যদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভোটে নির্বাচিত ৫০ জন মহিলা সদস্য, সর্বমোট ৩৫০ সদস্য সমন্বয়ে সংসদ গঠিত। প্রত্যক্ষ ভোটে উন্মুক্ত ৩০০ সদস্যের বেলায় নারী-পুরুষ ভেদাভেদের আবশ্যকতা নেই।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে ২০১১ সালে আনীত পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে বিধান করা হয়েছে, তাতে বলা আছে- মেয়াদ অবসানে সংসদ বিলুপ্তির ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
উপরোক্ত বিধানটি কার্যকর পূর্ববর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনবিষয়ক যে বিধান ছিল তা ১৯৯৬ সালে আনীত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছিল। এ বিধানে বলা ছিল— মেয়াদ অবসানে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে বিধান ছিল তা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত বিধানের অনুরূপ। ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রবর্তন পূর্ববর্তী যে ছয়টি সংসদ গঠিত হয়েছিল, এর কোনোটি মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারায় সংসদের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা দেখা দেয়নি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হলে নির্বাচন কমিশনের সাথে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে মনোনয়ন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা আছে। তা ছাড়া একজন ব্যক্তি দলের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন বা স্বাক্ষর গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মনোনীত ব্যক্তির ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার একজন ভোটার নির্বাচনের জন্য সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের দফা (১) এর অধীন সদস্য হওয়ার যোগ্য যেকোনো ব্যক্তির নাম প্রস্তাব বা সমর্থন করতে পারবেন।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬ দফা (১)-এ বলা হয়েছে— কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হলে এবং তার বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে এ অনুচ্ছেদের দফা (২)-এ বর্ণিত বিধান সাপেক্ষে তিনি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন।
রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রম শেষ হওয়ার পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী বা ব্যক্তি নির্বাচন কমিশন বরাবরে আপিল দায়ের করতে পারেন। নির্বাচন কমিশন দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির কার্যক্রম গ্রহণ করে এবং এর মাধ্যমে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সচরাচর দেখা যায়, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণ পর্বের ২১ দিন আগে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে অবতীর্ণ হন।
আচরণ বিধিতে প্রচারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল বা তার মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী সমান সুযোগ লাভ করার কথা বলা থাকলেও প্রায়ই দেখা যায়, সভা বা মিছিলের ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বর্তমান আচরণবিধি অনুযায়ী নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবস্থার নিষিদ্ধ হলেও নির্বাচনী প্রচারের নির্ধারিত ২১ দিনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের ব্যাপকভাবে রঙিন পোস্টারের ব্যবহার আচরণবিধির লঙ্ঘন হলেও এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন বা ইলেলেক্ট্রোরাল ইনকোয়ারি কমিটির পক্ষ থেকে তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষণীয় নয়।
দেয়ালে লিখনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ থাকলেও এ মাধ্যমেও প্রচারণা অব্যাহত আছে। অনুরূপ উসকানিমূলক বক্তব্য বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বিষয়ে বিধিনিষেধ থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করে বক্তব্য প্রদানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক কর্মতৎপরতা লক্ষ করা যায়।
মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেলা ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অনেকে অহরহ এটিকে উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে মাইক ব্যবহার করে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছেন।
প্রার্থীরা যেন নির্বিঘ্নে ভোটারদের কাছে গিয়ে প্রচারণা চালাতে পারেন। একই সাথে ভোটাররা যেন কোনো ধরনের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন— বিষয়টি নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করার কথা। তবে তাদের অমনোযোগী মনোভাবের কারণে দেখা যায়, অনেক ভোটার ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে অপারগতা প্রকাশ করে থাকেন।
আমাদের সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনে স্বাধীন থাকার কথা বলা থাকলেও দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কখনো মুক্তভাবে কাজ করতে পেরেছে, তেমনটি পরিলক্ষিত হয়নি।
বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার অন্তর্বর্তী সরকার হলেও এটির নিরপেক্ষতা যেন কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না হয় সে বিষয়ে সচেষ্ট হওয়া জরুরি; কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো উপদেষ্টার অতিউৎসাহী কার্যকলাপ অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ভোট অনুষ্ঠানের দিন প্রতিটি পোলিং অফিসারের কক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একজন এজেন্ট দেয়ার কথা থাকলেও অতীতে দেখা গেছে, দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় বিরোধী প্রার্থীদের এজেন্টদের পোলিং অফিসারের কক্ষে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি বা প্রবেশ করলেও কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তাদের জোরপূর্বক বের করে দেয়ার নজির আছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় এক বা একাধিক প্রজেকশন মিটিংয়ের আয়োজন করে সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে বক্তব্য পেশ করার সুযোগ দেয়া হলে দেখা যাবে, একই মঞ্চ থেকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ বিভিন্ন প্রার্থী ভোটারদের উদ্দেশে তাদের বক্তব্য দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে এক দিকে প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের সাশ্রয় হবে, অন্য দিকে প্রার্থীরা নির্বিঘ্নে সহমর্মিতার সাথে নির্বাচনী প্রচারকার্য চালিয়ে যেতে পারবেন। তা ছাড়া এর মাধ্যমে যেকোনো নির্বাচনী এলাকায় সহিংসতা পরিহার সম্ভব।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে দেখা যায়, নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা টিভি-বিতর্কে অংশগ্রহণ করে নিজের ও দলের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যান। এসব দেশে টিভি-বিতর্কে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নিজের পক্ষে এবং অপরকে ঘায়েল করার যে বক্তব্য দেয়া হয়; তাতে জনমত অনেকটা প্রভাবিত হয়। আমাদের দেশে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় এ ধরনের ব্যবস্থা করা গেলে আশা করা যায়, তা ভোটারদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আমাদের দেশে বর্তমানে ১৮ বছর বয়স হলে একজন ব্যক্তি ভোটার হওয়ার জন্য যোগ্য। বর্তমানে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের প্রত্যেক ব্যক্তি মোবাইল ব্যবহার করে থাকেন। নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ প্রার্থীরা মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে ভোট প্রার্থনা করতে পারেন। এতে করে প্রার্থীদের আর ভোটারের বাড়িঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার আবশ্যকতা দেখা দেয় না। এতে একজন প্রার্থীর ব্যয়, পরিশ্রম ও সময়ের সাশ্রয় হবে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তা জনমনে দারুণ আশার সঞ্চার করবে। পাশাপাশি স্বল্প ব্যয়ে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে তার বক্তব্য ভোটারের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষে মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং, সহকারী রিটার্নিং, প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসাররা দায়িত্ব পালন করেন। রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার সচরাচর প্রশাসনের জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ এবং বেসরকারি বিভাগ থেকেও নিয়োগের বিধান আছে। নিয়োগদান-পরবর্তী তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। তাদের সবার নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও কারো কারো বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্নেœর অভিযোগ পাওয়া যায়। এমন ধরনের অভিযোগ নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করে। সুতরাং এমন অভিযোগে কোনো কর্মকর্তা যেন অভিযুক্ত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেমন— সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও ভিডিপির ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। এসব বাহিনীর প্রতিটি সদস্য নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়। তাই প্রতিটি বাহিনীর নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত সদস্যদের নিজেদের সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে প্রত্যয়ী হতে হবে।
আশা করা যায়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বাত্মকভাবে নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করলে সহিংসতা রোধ করে ভোটারদের নিরাপত্তা বিধান সফল হবে, যা প্রকারান্তরে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক



