ফিরোজ আলম
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৩১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে জারি করা গেজেট অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক স্কুলের ও উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হলো স্নাতক (স্নাতক ডিগ্রি)। আর ডিগ্রি কলেজের ক্ষেত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। এমপিওভুক্ত দাখিল মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা ফাজিল বা স্নাতক ডিগ্রি। আলিম ও সমমানের মাদরাসার সভাপতির জন্য কামিল বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রয়োজন। ফাজিল বা স্নাতক ডিগ্রি এবং কামিল মাদরাসার সভাপতির জন্য কামিল বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির জন্য ন্যূনতম স্নাতক (ব্যাচেলর ডিগ্রি)। কারিগরি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা সাধারণত এইচএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট) পাস বা সংশ্লিষ্ট কারিগরি ডিপ্লোমা থাকতে হয়। কিন্তু স্কুল-কলেজ-মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছাড়া অন্য সদস্যদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার উল্লেখ নেই। লক্ষণীয় যে, দেশের ৯৫ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দোকানদার, চা বিক্রেতা, ধূমপায়ী, মাদকাসক্ত, চিহ্নিত চাঁদাবাজরা ম্যানেজিং কমিটির দাতা সদস্য, বিদ্যোৎসাহী সদস্য, অভিভাবক সদস্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে শুধু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৪ লাখের কাছাকাছি। কয়েক বছর আগে ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে বলা হয়েছিল, বিশ্বে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সর্বোচ্চ। প্রতিবেদন বলছে, দেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা চার লাখ ১০ হাজারের বেশি। একদিকে স্নাতকধারী লাখ যুবক বেকারত্বের গ্লানি বহন করছেন; অন্যদিকে অষ্টম শ্রেণী পাস, কম শিক্ষিতরা এখনো স্নাতকধারী শিক্ষকদের পরিচালনা করছেন।
অ বা কু-শিক্ষিতদের প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটিতে থাকলে যে সমস্যা হতে পারে-
ক. প্রতিষ্ঠান সভাপতি শিক্ষিত আর বাকি সদস্যরা দোকানদার, চা বিক্রেতা, ধূমপায়ী, মাদকাসক্ত, চিহ্নিত চাঁদাবাজ কিংবা কম শিক্ষিত হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
খ. অতীতের মতো প্রায় শিক্ষকরা লাঞ্ছিত হবেন প্রতিষ্ঠান প্রধান কিংবা অযোগ্য ম্যানেজিং কমিটি এসব সদস্যের হাতে।
গ. কম যোগ্যতার ম্যানেজিং কমিটির কারণে শিক্ষার গুণগত মান হুমকির মুখে পড়ছে, পড়বে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় প্রযুক্তির সহায়তায় যেখানে দিন দিন শিক্ষার মান উন্নতির দিকে যাওয়ার কথা, সেখানে বহু স্কুলের শিক্ষার মান কোন দিকে যাচ্ছে তা বোঝার ক্ষমতাও নেই বহু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির।
ঘ. কম শিক্ষিত এসব ম্যানেজিং কমিটির কারণে শিক্ষাদানে অরুচি বাড়ছে, আরো বাড়বে শিক্ষকদের। শিক্ষকরা যেখানে নামী-দামি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর নিয়ে শিক্ষকতা করতে আসেন, তাদের পরিচালকরা স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় শিক্ষকদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে, করবে এটি স্বাভাবিক।
ঙ. কম শিক্ষিত ম্যানেজিং কমিটি অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে, বাড়াবে প্রতিনিয়ত। কারণ, বিদ্যালয় হলো নিজেকে গড়ার এবং উপযুক্তভাবে বিকশিত করার সঠিক স্থান। অথচ হাজারো পরিচালনা পর্ষদ সদস্য আছেন যারা অক্ষরজ্ঞানহীন, ধূমপায়ী, ফৌজদারি মামলার আসামি, দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারি কিংবা এর চেয়ে ভয়ঙ্কর নিন্দনীয় দোষের অধিকারী।
চ. কম যোগ্যতার এসব তথাকথিত ম্যানেজিং কমিটি শিক্ষার চেয়ে অর্থ-বিত্তকে উৎসাহিত করবে। এমনকি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এমন চিন্তার উদ্রেক ঘটাবে যে, জীবনে শিক্ষা অর্জন নয়, বিত্ত অর্জন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষা অর্জনে শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচালক হতে পারেন। কিন্তু বিত্ত অর্জনকারী সরাসরি শিক্ষকদের পরিচালক হতে পারবেন। এমন মোক্ষম সুযোগ হারানো বোকামি নয় কি?
ছ. বহু সরকারি কিংবা এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সংসদ সদস্য, সচিব, জেলা প্রশাসক, এডিসি জেনারেল, ইউএনও, এসিল্যান্ডসহ যোগ্য দক্ষ শিক্ষানুরাগী শিক্ষাবিদ ম্যানেজিং কমিটির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ম্যানেজিং কমিটির লোকদের যোগ্যতা নির্ধারিত না হওয়ায়, কিংবা অক্ষরজ্ঞানহীন, ধূমপায়ী, ফৌজদারি মামলার আসামি, দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারি, কিংবা তার চেয়ে ভয়ঙ্কর নিন্দনীয় দোষের অধিকারীরা পরিচালনা পরিষদে থাকলে উপরোল্লিখিত শিক্ষাবিদদের জন্য অনেকটা অসম্মানজনক হবে সন্দেহ নেই। উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটিতে থাকতে চাইবেন না; কিংবা চাইলেও অপমানবোধ করবেন।
জ. যেখানে প্রতি জেলায় কয়েক হাজার করে শিক্ষিত স্নাতকধারী বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সেখানে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের যোগ্যতা নির্ধারণ না থাকা হাস্যকর নয় কী?
সমালোচনাকারীরা হয়তো বলবেন, স্নাতকধারী শিক্ষিত বেকাররা কী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যথার্থ হবেন? তাদের জন্য বলি- অক্ষরজ্ঞানহীন, ধূমপায়ী, ফৌজদারি মামলার আসামি, দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারি, কিংবা তার চেয়ে ভয়ঙ্কর নিন্দনীয় দোষের অধিকারী ব্যক্তির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়ার তুলনায় স্নাতকধারী বেকারের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়া কয়েকগুণ অতি উত্তম বলে আমাদের কাছে মনে হয়। কারণ, প্রতিষ্ঠানে কমশিক্ষিত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়ার পেছনের গল্পে থাকবে নোঙরা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অর্থনৈতিক ফায়দা হাসিল কিংবা সামাজিক আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিষ্ঠান-প্রধানদের নোঙরা আধিপত্য বিস্তার।
কারো কারো যুক্তি হলো- অনেকে বিদ্যালয়ের স্থান দান করেন তাদের অগ্রাধিকার দিতে। যেখানে যোগ্যতা নির্ধারণের প্রয়োজন নেই। গ্রাজুয়েট বড় বেশি হয়ে যায়। কেউ যদি গ্রাজুয়েট হতে হবে- এটিকে চ্যালেঞ্জ করেন তাহলে সমস্যা দেখা দেবে। তাই এ পদের জন্য কিছুটা কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিও নির্বাচিত বা মনোনীত হতে পারেন। ওই সব লোকের বক্তব্য এ যুগে মেনে নিলে অচিরে হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে। কারণ সম্পদ যার যত বেশি হবে, বিদ্যালয়ে প্রভাব তার তত বেশি হবে। এটি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করবে, সন্দেহ নেই। তবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতাদের জন্য আলাদা সম্মান রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে, শিক্ষকদের সম্মানজনক পেশা সৃষ্টিতে, অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা দূর করতে, ধূমপায়ী, মাদকাসক্ত, দুর্নীতিবাজ, অস্ত্রধারী কিংবা তার চেয়ে নোঙরা পরিবেশ সৃষ্টিকারীদের দূরে রাখতে, শিক্ষাবিদদের সম্মান ঠিক রাখতে, ’২৪ পরবর্তী আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে এবং শিক্ষকদের ভাতে নয়- সম্মানে মারা বন্ধ করতে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা যেমনি স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর হয়েছে। তেমনি ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদেরও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার বিধান থাকাটা সময়ের দাবি। এমনটি না হলে তারুণ্যের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন এবং উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, আয়েশা রা: মহিলা কামিল মাদরাসা, সদর, ল²ীপুর ও মহাসচিব, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, বিএমজিটিএ।



