ভারতে আরএসএস ও করপোরেট মদদপুষ্ট সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকারের আমলে দাঙ্গা, গণহত্যা, বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটা বিশেষ সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, লিঞ্চিং ও মাওবাদী-বামপন্থী-মুসলিম বা সংখ্যালঘুদের মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পুরার পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে বুলডোজার কালচার বা সংস্কৃতি নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর শিকার ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আদিবাসী সম্প্রদায়। এর ফলে ছত্রিশগড়ের বা মধ্যপ্রদেশের আদিবাসী অধ্যুষিত শতাধিক বস্তি মাওবাদী হিসেবে অভিযোগ এনে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একই অপসংস্কৃতি বা রাজনীতি সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর চাপানো হয়েছে। দিল্লির শাহিনবাগসহ অনেক মুসলিম বস্তি এই রাষ্ট্রীয় প্রবণতার শিকার। গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে মুসলিম এলাকার দোকানপাট ও বাড়িঘর। এই বুলডোজার রাজনীতি বা সংস্কৃতি নিছক একটি আইনি বিষয় হিসেবে থেমে থাকেনি। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক। এমনকি শাসনব্যবস্থার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার আগে তাদের শাস্তি দেয়ার এক বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে; যা ভারতের আইন, মানবাধিকার ও সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক নিয়ে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একটি ধ্বংসাত্মক কাজের যন্ত্র হিসেবে বুলডোজার রাজনীতির বা কালচারের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং বিচারবহির্ভূত সাজার প্রতীক হিসেবে পরিণত হওয়ার ঘটনা কিন্তু রাতারাতি হয়নি। কথাটি দুঃখের ও উদ্বেগের হলেও এ বুলডোজার কালচারের প্রচলন সবচেয়ে বেশি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্য উত্তরপ্রদেশে বেশি। এক্ষেত্রে যোগী আদিত্যনাথ বড় ভূমিকা রেখেছেন।
এ কথা অস্বীকার করা যায় না, ‘বুলডোজার বাবা’ হিসেবে যোগী আদিত্যনাথ বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। তার সরকার উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত অপরাধী ও মাফিয়া বিকাশ দুবে ও মুখতার আনসারির অবৈধ সম্পত্তি ধ্বংসে বুলডোজার ব্যবহার করে। যোগী আদিত্যনাথের পদক্ষেপটি নাকি অপরাধ দমনের কঠোর বার্তা হিসেবে প্রশংসিত। তার এ কাজ কঠোর প্রশাসকের ভাবমর্যাদা তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এ বুলডোজার রাজনীতি বা কালচার ব্যাপকভাবে যোগীর রাজ্যে প্রসারিত হয়। সরকারের সমালোচক, সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারী এবং বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর এ কালচার বা রাজনীতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে এ ধরনের বিচারবহির্ভূত ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ সাধারণ মানুষের এক শ্রেণীর কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় একে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি। ‘বুলডোজার’ ভাবমর্যাদাটি বিজেপির জন্য একটি সফল নির্বাচনী কৌশলে পরিণত হয়। বিশেষ করে ২০২২ সালে উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে যোগী আদিত্যনাথের নির্বাচনী সমাবেশগুলোতে বিজেপি সমর্থকরা বুলডোজারকে খেলনার মতো ব্যবহার করে আনন্দ উপভোগ করত। উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের সাফল্যের পর ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যেও এ মডেল প্রয়োগ করা হচ্ছে; যেমন— মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় , দিল্লি, হরিয়ানা বা গুজরাট। এ রাজ্যগুলোতে মুসলিম ও আদিবাসীদের বস্তি ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে বুলডোজার দিয়ে। মধ্যপ্রদেশের একসময়ের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানকে তো ‘বুলডোজার মামা’ বলা হতো।
এই বুলডোজার সংস্কৃতির উৎস কী? এর মডেল কোথা থেকে আমদানি করেছে বিজেপি? আমাদের সামনে যে তথ্য রয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি বুলডোজার কালচার মডেল গ্রহণ করেছে জায়নবাদী ইসরাইলের কাছে থেকে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ইসরাইলি মডেল দ্বারা অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত। ইসরাইল ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতিটি ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিল। ইসরাইল এটিকে ফিলিস্তিনের উপর ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করে আসছে। ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর থেকে সব কিছু ধ্বংস করার যে নীতি গ্রহণ করেছিল বা এখনো করে আসছে, তার মুখ্য উদ্দেশ্য হলো— ফিলিস্তিনি জনসংখ্যাকে নির্দিষ্ট ছিটমহলে বেঁধে রাখা। তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ বলবৎ করা। ফিলিস্তিনিদের জীবনকে অস্থির করে দেয়া, যাতে অন্যত্র পালিয়ে যান তারা। মোদ্দা কথা, ফিলিস্তিনবাসী যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ইসরাইলের এ নীতির নাম ‘হাফরাদা’। হিব্রু ভাষায় এর অর্থ— ‘বিচ্ছেদ’ বা ‘বিচ্ছিন্নতা’। এ নীতিই হলো বিজেপি-শাসিত ভারতে ‘বুলডোজার কালচার’। অনেকে ‘বুলডোজার রাজনীতি’ও বলে। ‘হাফরাদা’ নীতির সাহায্যে ইসরাইল ফিলিস্তিনের লাখ লাখ বাড়িঘর, জনপদ ও বস্তি ধ্বংস করেছে। ইসরাইলের বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রায়ই ‘প্রহসনমূলক’ বলে অভিহিত করা হয়। কথাটি দুঃখের হলেও সত্য যে, ভারত ও ইসরাইল দুই দেশই আইন ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে একটি বিশেষ ধর্ম সম্প্রদায় বা জাতিকে নিশানা করেছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু থেকে মাঝখানে অটলবিহারি বাজপেয়ি পরে মনমোহন সিং পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ছিল একনিষ্ঠ সংহতি ও সহানুভূতি। কিন্তু ২০১৪ সালে এই মোদির আমল থেকে সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। ফিলিস্তিন নয়, ইসরাইল এখন ভারতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইসরাইলের সাথে ভারতের অস্ত্রচুক্তি হয়েছে।
ভারতে বুলডোজার কালচারকে যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে স্বীকার করে না, তবু এর প্রয়োগের সময় ও ধরন থেকে এর শাস্তিমূলক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায়। ভারতের এ বুলডোজার সংস্কৃতির লক্ষ্য শুধু আইন প্রয়োগ নয়, এটি বিজেপির একটি রাজনৈতিক বার্তা। এক রকম রাষ্ট্রীয় ধ্বংসযজ্ঞ।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টার ন্যাশনালের মতে, ভারতে এ বুলডোজার অভিযানগুলো অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিশানা করেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট, জনপদ, ব্যবসায়, উপাসনালয়গুলোর উপর। আজ ভারতে বিজেপি-শাসিত বিভিন্ন রাজ্যগুলোত দুই শতাধিক মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। শুধু ২০২২ সালে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ভারতের অসম, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও দিল্লিতে এসব অভিযানে কমপক্ষে ১২৮টি সম্পত্তি ধ্বংস করা হয়েছে। বিজেপি-শাসিত রাজ্যে অনেক মুসলিম ও আদিবাসী বস্তি ধ্বংস করা হয়েছে। অনেক মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ জীবিকা ও বাসস্থান হারিয়েছেন। আর তার পরের পরিস্থিতি আরো করুণ। এই ধ্বংসযজ্ঞের যন্ত্রটি এতটা সর্বব্যাপক যে, বুলডোজার নির্মাতা ব্রিটিশ বহুজাতিক কোম্পানি জেসিবির মতো যেন বুলডোজার প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। বিজেপি আবার এটিকে ‘জেহাদি কন্ট্রোল বোর্ড’ বলে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— শুধু রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের মধ্যে এ অভিযান সীমাবদ্ধ নেই। হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় নেতা ও হিন্দু রক্ষা বাহিনীর মতো বিজেপির অঙ্গসংগঠনগুলো এই বুলডোজার কালচার ব্যবহার করে মুসলিমদের সব কিছু গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। হুমকিও দিচ্ছে। ভারতের নাগরিক সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞরা এর তীব্র বিরোধিতা করছেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ, নিন্দা ও সমালোচনা করলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। বুলডোজার কালচার আছে সেই বুলডোজারে।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি



