লাইলাতুল কদর : মানবতার মুক্তির মহিমান্বিত রজনী

লাইলাতুল কদর আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অসাধারণ নিয়ামত। এ রাত আমাদের পাপ থেকে মুক্তি, আত্মার পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তাই এ রাতের মর্যাদা উপলব্ধি করে আমাদের উচিত আন্তরিক ইবাদত, তওবা ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের চেষ্টা করা। আসুন আমরা সবাই এ মহিমান্বিত রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করি এবং নিজেদের জীবনকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত করার অঙ্গীকার করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরো গুরুত্বের সাথে লাইলাতুল কদরের বরকত লাভ করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন!

পবিত্র মাহে রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের এক অনন্য সময়। এ মাসজুড়ে আল্লাহ তায়ালার অবারিত করুণা ও রহমতের বর্ষিত হতে থাকে মুমিনদের উপর। এই মহিমান্বিত মাসের মধ্যে রয়েছে এমন একটি রাত, যার মর্যাদা ও গুরুত্ব অন্য সব রাতের চেয়ে বহুগুণে বেশি। আর সেই রাত হলো লাইলাতুল কদর বা শবেকদর। মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে এ রাত বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব বহন করে। কারণ এই রাত শুধু একটি ধর্মীয় উপলক্ষ নয়; বরং এটি আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও মুক্তি লাভের এক অসাধারণ সুযোগ মুসলমানদের জন্য।

‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে। ‘লাইলাতুল’ অর্থ রাত বা রজনী এবং ‘কদর’ অর্থ মর্যাদা, সম্মান, মহিমা বা তাকদির নির্ধারণ। অর্থাৎ— লাইলাতুল কদর হলো সেই মহিমান্বিত রাত, যাকে আল্লাহ তায়ালা বিশেষ সম্মান ও মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এই রাত মানবজাতির জন্য এক মহান নিয়ামত।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন— ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জানো লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সে রাত ফজরের সূচনা পর্যন্ত।’ উপরোল্লিখিত আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, লাইলাতুল কদর এমন একটি রাত যা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং বরকতময়।

ইসলামের ইতিহাসে এ রাতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে আরো একটি কারণে। এ রাতে মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ দিকনির্দেশনা পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে। লাইলাতুল কদর শুধু একটি পবিত্র রাত নয়; বরং এটি মানবজাতির হেদায়েতের সূচনালগ্ন।

পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে— এ বরকতময় রাতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হয়। সূরা দুখানে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন— ‘এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা করা হয়’। অর্থাৎ— মানুষের জীবন, জীবিকা, ভাগ্য এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত আল্লাহ নির্ধারণ করেন। এ কারণে এই রাতকে তাকদিরের রাত হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

হাদিস শরিফেও লাইলাতুল কদরের অসংখ্য ফজিলত ও গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। নবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’ এ হাদিস মুসলমানদের জন্য এক বিশাল সুসংবাদ। কারণ মানুষের জীবনে ভুল-ত্রুটি ও পাপ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ তার অসীম দয়ার মাধ্যমে বান্দাদের জন্য এমন একটি সুযোগ দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা অতীতের গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে।

লাইলাতুল কদরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এ রাতে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তারা আল্লাহর নির্দেশ নিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসেন। সেই সাথে ইবাদতে রত বান্দাদের জন্য দোয়া করেন। বিশেষভাবে ফেরেশতাদের নেতা জিবরাইল আ:-ও এ রাতে পৃথিবীতে আগমন করেন বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। ফলে এ রাত হয়ে ওঠে রহমত, শান্তি ও কল্যাণের এক অনন্য পরিবেশ।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-পবিত্র কুরআন ও হাদিসে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি যে, রমজানের ঠিক কোন রাতে লাইলাতুল কদর। তবে রাসূলুল্লাহ সা: নির্দেশ দিয়েছেন, রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এ রাত অনুসন্ধান করতে হবে। অর্থাৎ— ২১, ২৩, ২৫, ২৭ অথবা ২৯তম রাতের যেকোনো একটিতে লাইলাতুল কদর হতে পারে। ইসলামী চিন্তাবিদদের অনেকে ২৭ রমজানকে অধিক সম্ভাবনাময় মনে করেন, তবে নিশ্চিতভাবে কোনো একটি রাত নির্ধারণ করা হয়নি। এর মাধ্যমে মুসলমানদের শেষ দশকের প্রতিটি রাতে ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। রাতটি নিশ্চিত করতে রাসূল সা: রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফে বসার পরামর্শ দিয়েছেন।

নবী সা: নিজেও রমজানের শেষ দশকে বিশেষভাবে ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে দিতেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। অনেক সময় তিনি ইতিকাফও করতেন, যাতে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আল্লাহর ইবাদতে সময় ব্যয় করা যায়। তাঁর এ আমল মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, লাইলাতুল কদরের ফজিলত লাভ করতে হলে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে।

এই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। নবী সা: হজরত আয়েশা রা:-কে একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছিলেন। যখন তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যদি তিনি লাইলাতুল কদর পেয়ে যান তাহলে কী দোয়া করবেন, তখন নবী সা: বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।’

এই দোয়া শুধু একটি বাক্য নয়; বরং এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর কাছে ফিরে আসার এক গভীর আহ্বান। কারণ মানুষের জীবনে অনেক ভুল, অন্যায় ও গুনাহ জমে যায়। লাইলাতুল কদর সেই গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তাই লাইলাতুল কদরে মুসলমানদের করণীয় অনেক। এর মধ্যে রয়েছে নফল নামাজ আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, জিকির-আসকার করা, দরুদ শরিফ পাঠ করা, তওবা ও ইস্তিগফার করা এবং বেশি বেশি দোয়া করা। একই সাথে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা এবং দান-সদকা করাও অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কারণ ইসলাম শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা ও মানবিক দায়িত্ববোধও ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লাইলাতুল কদরের প্রকৃত শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উন্নয়ন। এ রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন ঘিরে নয়; বরং আখিরাতের সফলতা সামনে রেখে জীবন পরিচালনা করা একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব।

আজকের আধুনিক পৃথিবীতে মানুষ নানা ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা ও ভোগবিলাসে মগ্ন। ফলে অনেক সময় মানুষ আধ্যাত্মিক জীবনের কথা ভুলে যায়। লাইলাতুল কদর সেই ভুলে যাওয়া সত্যকে আবার মনে করিয়ে দেয়— মানুষের জীবনে আল্লাহর স্মরণ ও আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব কতটা গভীর। এ রাত আমাদের আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। আমরা কিভাবে জীবন কাটাচ্ছি, কতটা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলছি, অন্য মানুষের অধিকার কতটা রক্ষা করছি— এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার একটি সুযোগ এনে দেয় এ মহিমান্বিত রজনী।

তবে লাইলাতুল কদরের মর্যাদা তখন পূর্ণতা পায়, যখন আমরা শুধু একটি রাত ইবাদত করে থেমে না গিয়ে সারা জীবনে কুরআনের শিক্ষাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করি। কারণ কুরআন শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; এটি মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সত্য, ন্যায়, মানবতা ও নৈতিকতার শিক্ষা কুরআনে নিহিত রয়েছে।

অতএব, লাইলাতুল কদর আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অসাধারণ নিয়ামত। এ রাত আমাদের পাপ থেকে মুক্তি, আত্মার পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। তাই এ রাতের মর্যাদা উপলব্ধি করে আমাদের উচিত আন্তরিক ইবাদত, তওবা ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের চেষ্টা করা।

আসুন আমরা সবাই এ মহিমান্বিত রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করি এবং নিজেদের জীবনকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত করার অঙ্গীকার করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরো গুরুত্বের সাথে লাইলাতুল কদরের বরকত লাভ করার এবং সে অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন!

লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক ও সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়