এই তীব্র শীতের মধ্যেও সুন্দরবনে বসবাসরত জীববৈচিত্র্যের সংগঠন (বাঘ, বানর, হরিণ, কুমির- সংক্ষেপে বাবাহকু) প্রধান সুন্দর মিয়া এক জরুরি বৈঠক ডেকেছেন তার হরিনাঘাটা অবকাশ কেন্দ্রে। বাবাহকুর প্রেসিডিয়াম প্রধান, রাজকীয় বাঘ সম্প্রদায়ের বর্ষীয়ান নেতা সুন্দর মিয়া মানবালয়ে অত্যাসন্ন নির্বাচন পূর্বকালে যে অস্থির মস্তিষ্কপ্রসূত প্রবণতা প্রবাহিত হচ্ছে তাতে বিব্রত ও বিচলিত বোধ করছেন। প্রেসিডিয়াম প্রধানের সচিবালয় থেকে গতকাল সন্ধ্যায় জারিকৃত সার্কুলারে প্রত্যেক গোত্র বা সম্প্রদায় থেকে একজন করে শীর্ষ নেতৃত্বকে জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। বৈঠকে বাবাহকুর উচ্চকক্ষ সংসদ ‘বনে জঙ্গলে’র অধ্যক্ষ শিয়ালেন্দু মামাইয়াকে বিশেষ বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মানব লোকালয়ে বর্তমানে জোট বাঁধতে গিয়ে পক্ষ-বিপক্ষীয়করণের যে রশি টানাটানি চলছে তার স্বরূপ তুলে ধরে শিয়ালেন্দু সুন্দর মিয়ার সাথে আলাপের সূত্র ধরে একটি পেপার তৈরি করেছেন। বাবাহকুর মিডিয়া সেল থেকে শিয়ালেন্দুর বক্তব্যের সারৎসার সম্প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কেননা, ইদানীং ভাইরালের ভয়ে আগে থেকেই ভেরিফায়েড ভার্সন জারিতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শিয়ালেন্দু তার ভেরিফায়েড বক্তব্যে বলছেন, ‘অজ্ঞাতসারে অনেকেই নিজের কথা ও কাজে নিজেই ধরা খায়। মানবালয়ে জুলাই অভ্যুত্থান নামে খ্যাত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কিভাবে স্বৈরাচারের পতন পলায়ন পর্ব পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সবাইকে তা স্মরণে আনতে বলেন শিয়ালেন্দু। সে দেশের কবি সুকান্তর কবিতায় আছে- ‘জ্বলে পড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়’। সেখানকার পুলিশ অফিসার বুঝাচ্ছিলেন তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে, ‘স্যার একজন গুলি খেয়ে মারা গেল এটি দেখেও তার সহযাত্রী পাশের জন ভয় পায় না, সরে গেল না।’ এমন অকুতোভয়দেরকে আমরা ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করতে পারব না। সেই অকুতোভয় পরিবেশ পরিস্থিতিতে আজ যেভাবে উত্তরণ পর্যায়ে নাটকীয়তা দেখা যাচ্ছে, তাতে শিয়ালেন্দুর মনে হচ্ছে এটি স্রেফ স্ববিরোধিতার পক্ষ-বিপক্ষীয়করণের গোলকধাঁধা ছাড়া কিছু নয়। মানবালয়ের ইতিহাসের ধীমান পাঠক শিয়ালেন্দু সেখানকার ইতিহাসের কিছু মাইলস্টোন তুলে আনেন-
২৬৯ বছর আগে স্বাধীন নবাবের আত্মার আত্মীয় সিপাহসালারের সপক্ষ ত্যাগ থেকে ১৮ মাস আগে ঐতিহাসিক পলায়ন পর্যন্ত যত পটপরিবর্তন হয়েছে, তার নেপথ্যে কাজ করেছে স্ববিরোধিতায় সঙ্কুচিত হওয়া। ক্ষমতার লোভে মাত্রাতিক্রমের দোষে দুষ্ট সব নায়ক-নায়িকারা, নাট্যকার, অতি-পাতি নেতারা নিজেরাই নিজেদেরকে অতি নিরাপদ, অদম্য, অপ্রতিরোধ্য ভাবার পর্যায়ে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। মানবালয়ের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যে তিন প্রধান ব্যক্তি জঘন্যতম গণহত্যার নেপথ্যে ছিলেন, তারা তিনজনই নিজেদেরকে ভয়ডরহীন দুর্দান্ত দুঃসাহসী ভাবতেন। সেই তিনজনই নিজেদের অজ্ঞাতসারে তাদের নিরাপত্তা-বিধায়কদের হাতে প্রাণ হারান। তাদের কেউ কেউ স্ববিরোধিতায় শুধু সঙ্কুচিতই হননি, দেশ জাতির জন্য ডেকে আনেন করুণতম পরিণতি। ইতিহাসে কে কিভাবে অমর হবেন, ‘যার শেষ ভালো তার সব ভালো’ সেই উদাহরণ মানবালয়ের দুই প্রধানের দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্যে যা জুটেছে তা অনুধাবনযোগ্য।
বাবাহকু পার্লামেন্টের অধ্যক্ষ শিয়ালেন্দু প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেন, কোনো দায়িত্বশীল পদ গ্রহণের সময় সবাইকে শপথবাক্য পাঠ করতে হয়। অর্থাৎ- তিনি দায়িত্ব পালনকালে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের প্রতি সমান আচরণ করবেন- রাষ্ট্রীয় স্বার্থের নিরাপত্তা তথা গোপনীয়তা অবলম্বন করবেন। তিনি কারো প্রতি রাগ কিংবা অনুরাগের বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করবেন না। অথচ নিকট অতীতেও মানবালয়ে, বিশেষ করে যারা দলের বড় পোস্ট হোল্ড করতেন, দল-মত নির্বিশেষে সবার সাথে এমনভাবে আচরণ করতেন, তাতে দেশ অভ্যন্তরে তো বটে আমাদের এই সুন্দরবনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতো। দলের কোনো পদধারী দায়িত্বশীল পদে আসীন হলে তিনি প্রায়ই স্ববিরোধিতায় সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।
সুন্দর মিয়া শিয়লেন্দুকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে বলেন, মানবালয়ে বেসরকারি খাতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের স্বার্থে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কথা ঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল, জনগণকে লোভ দেখানো হলো- লাখো কোটি জনবলের চাকরি হবে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিলেন। সরকারি পোষক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তাদের জমি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, শুল্ক সুবিধাসহ অনেক কিছু সহায়তা করার কথা থাকলেও তার আর সাক্ষাৎ মিলল না- পক্ষান্তরে সরকার নিজেই বিশাল শিল্পনগর প্রতিষ্ঠা করল সরকারি ফ্রি খাসজমি (বিশাল চরে) এবং টাকায় (বিশ্বব্যাংক থেকে লোন নিয়ে) স্থাপন করে বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রের কোম্পানিদের জন্য স্বল্পমূল্যে বিশাল এলাকা ছেড়ে দেয়া হলো। ফলে ১০০টি বেসরকারি এসইজেড বিদেশী বিনিয়োগ প্রাপ্তিতে দারুণ প্রতিযোগিতায় পড়ে গেল। সরকারের নিজস্ব শিল্পনগর বানানোর খায়েশই যদি ছিল তাহলে বেসরকারি খাতকে এভাবে বিনিয়োগে নামিয়ে নাস্তানাবুদ কেন করা হলো। তাদের জমি সংগ্রহে প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, শুল্ক কর প্রণোদনা ও বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইন দেয়ার ব্যাপারে কেন টালবাহানা, দরকষাকষি? স্ববিরোধিতার মাত্রাটা বড্ড বেশি বেড়ে যায়নি?
মানবালয়ের পতিত সরকার সবকিছুকে ডিজিটাল করার ওপর জোর প্রচার ও গুরুত্ব দিত। দেখা গেল, সেই ডিজিটাল কার্যক্রম যেভাবে যেখানে হওয়ার কথা সেখানে না হয়ে তা সাইবার সিকিউরিটির নামে ব্যবহার অপব্যবহারের অন্ধগলিতে পলকের মধ্যে অর্থ হাতড়ানোর উপায় উপলক্ষতে পরিণত হলো। ব্যক্তিবন্দনার ইতিহাস রচনায় এই আধুনিক যুগে দামি কাগজ কালি ও বাজেট (করোনা যুদ্ধের করুণ কঠোর কালের) খরচ করে হাজার হাজার স্তুতিগ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করা হয়। সেই হাজার হাজার বই সরকারি খরচে দেশের সব প্রতিষ্ঠানকে সরকারি বাজেট দিয়ে কিনতে বাধ্য করা হয়। প্রতিটি অফিসে বিশেষ কর্নার খুলে শোভাবর্ধনের ব্যবস্থা করা হয়। অথচ এই ডিজিটাল যুগে ডিজিটালি তথ্য সংগ্রহের ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে তা শুধু ব্যয় সাশ্রয়ী হতো না, সুদীর্ঘকাল সংরক্ষণসহ এগুলো দেশে-বিদেশে প্রচার করা সহজলভ্য হতো। এভাবে জোর করে কারোর ভাবমর্যাদা ও আদর্শ প্রচারের কাজের ফলে খোদ আমজনতার হৃদয় থেকে সে নাম মুছে যাওয়ার জোগাড়। কাগজে লেখা সে নাম ছিঁড়ে গেছে, ক্ষয়ে গেছে, লাখ কোটি টাকার ম্যুরালও। স্ববিরোধিতায় সঙ্কুচিত হয়েছে জাতীয় নেতাদের পরিচিতি এবং তাদেরকে শামিল করা হয়েছিল দলীয় নেতাদের সারিতে। সব জাতীয় নেতৃত্বকে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠিয়ে যার যা অবদান এবং কীর্তিকলাপকে সেভাবে স্বীকৃতি দেয়া ও সংরক্ষণ করা আবশ্যক। নইলে আম-ছালা দুটোই যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হতে পারে, শিয়ালেন্দুর কড়া মন্তব্য।
অতিভক্তি চোরের লক্ষণ বলে একটি কথা প্রচলিত আছে মানবসমাজে। দেখা যায়, তোষামোদি ও চাটুকারিতায় অনেকেই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ফলে যার যা করার কথা তা বিনা কারণে অন্যের কথা ও কাজের চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়ে। শেষে সে নিজের দলের কিংবা সবার জন্য ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানবালয়ে বিভিন্ন পরিবর্তন প্রেক্ষাপট দেখা যায় দলীয় বাহিনী, চাটুকার, বর্ণচোরা, আত্মীয়বর্গ ও চাঁদাবাজ খয়ের খাঁ-রাই জাতীয় নেতৃত্বকে ডুবিয়েছে। এরাই সমাজে সরকারে ও রাষ্ট্রে বিভেদ এবং বৈষম্য সৃষ্টির হোতা। মাত্র কয়েক বছর আগে এটি নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছিল যে, শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণের কাজে দায়িত্বশীল প্রধান ব্যক্তিই সীমাহীন, লাগামহীন ঔদ্ধত্য দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন। মুখে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আউড়িয়েও ‘কিভাবে ঘোলা পানি পরিষ্কার করতে হয়- এটি তারা জানেন’ বলে ধমক দিয়েও সংখ্যালঘুদের সহায়-সম্পত্তি কুক্ষিগত করেছিলেন, বড় সমাবেশে ঠাণ্ডামাথায় গণহত্যা চালিয়েছিলেন। সমাজে সর্বত্র দুর্নীতির দৌরাত্ম্যে আস্থাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করে জনগণের নাম করে জনগণের সাথে প্রতারণার ফাঁদ পেতে, পাতানো নির্বাচনে ইতিহাসের সেরা স্ববিরোধিতার, প্রতারণার উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যকে ভ্রুকুটি করে রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে দলীয়করণ করে ন্যায়নৈতিকতা ও নীতিনির্ভরতার ঘাট-মাঠ পয়মাল করা হয়। আয়নাঘর সৃষ্টির মাধ্যমে চরম অমানবিক ও মৌলিক অধিকার হরণকারী আচরণ চলে। তবে ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি’- এ কথা বলে গেয়ে মানুষকে গুম করে, মৌলিক অধিকার হরণ করে, শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে, স্বাস্থ্যসেবাকে অসম্ভব করে, ন্যায়নীতিকে নৈরাজ্যের অভিসারী করে স্ববিরোধী স্বৈরাচারের গণতান্ত্রিক দাপট চালানোর চেষ্টা শেষমেশ হালে পানি পায়নি। সতর্ক থাকার জন্য একটি চুম্বক তথ্য বা পরামর্শ দিয়েছেন শিয়ালেন্দু। যারা পালিয়ে বেঁচেছে তারা সংখ্যা ও শক্তিতে কিন্তু কম নয়। তাদের কায়েমি স্বার্থবাদী সমর্থকরা একসময় ভোল পাল্টিয়ে নতুনদের ওপর দোষ চাপানোর পথ ধরবে। বারবার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে নিজেরাই নিজেদের সহায় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি করতে থাকবে। ঘরে বাইরের থেকে নানান ষড়যন্ত্র, গুপ্তচর সেজে হাঙ্গামা বাধাতে থাকবে। স্বৈরাচার একটানা বহু দিন মাস ও বছর একচ্ছত্র শাসন, সাজানো প্রশাসন, শোষণ, লুটপাট, মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে ছিল বিধায় তাদের ছত্রছায়ায় বহু সুবিধাভোগী গ্রুপ গড়ে ওঠে; তারা নিজেদের আড়াল করার জন্য পদে পদে বাধা সৃষ্টি করতে থাকবে। এমনকি, এরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে শত্রু-মিত্র সেজে নানান আত্মঘাতী পথ-পন্থা, দখলদারিত্ব কায়েম করতে শুরু করতে পারে। বৈষম্য দূরের কথা বলে এসে কেউ কেউ নিজেরাই কোটারি সৃষ্টিতে মগ্ন হতে পারে। এসব ধৈর্যের সাথে মোকাবেলা করেই সবাইকে সম্পৃক্ত করে দেশ রাজনীতি ও সমাজ সংসার অর্থনীতির সংস্কারে সাধনার প্রয়োজন হবে।
শিয়ালেন্দু এটিও পরামর্শ দিলেন, শিক্ষাই শক্তি, সুস্বাস্থ্যই শক্তি। তিনি সবাইকে যে যে পর্যায়ে আছে তার তার লেখাপড়ায় মন দিতে আজ্ঞা করলেন। বললেন, কোটাবিরোধী আন্দোলন করে যে মেধাবীদের চাকরি পাওয়ার অধিকার আদায় হলো, চাকরি পাওয়ার জন্য সেই মেধাবীরা নিজেদেরকে গড়ে না তুললে প্রতিবেশী ও দেশীয় পক্ষভুক্ত চালাকরা তা ছিনিয়ে নিয়ে যেতেই থাকবে। শিয়ালেন্দু মনে করিয়ে দিলেন, আগের শতকে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হোক এটি যে পক্ষ চাননি তারা এখনো হাল ছাড়েননি। অতএব লেখাপড়ায় ভালো করেই তাদের সে আশার গুড়েবালি ছিটানো সম্ভব হবে। শিক্ষায় শক্তিমান না হলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিজয় অর্থবহ হবে না।
লেখক : কলামিস্ট, চিন্তক



