ম্যাডামকে যেমন দেখেছি

খালেদা জিয়াই এ দেশে প্রথম নারী শিক্ষার উন্নয়নে উদ্যোগী হন। মেয়েদের হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল পর্যন্ত বিনা খরচায় শিক্ষাদানের প্রথা চালু করেন তিনি। দেশের উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ছিলেন। তিনিই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে নারী প্রো-ভিসি নিয়োগ দেন। একজন নারীকে প্রথম সরকারি কর্মকমিশনের মতো উঁচু স্তরের প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেন

প্রফেসর ড. শহীদ উদ্দিন আহমেদ
লক্ষ কোটি জনতাকে কাঁদিয়ে অসংখ্য ভক্তকে শোকসাগরে ভাসিয়ে চিরতরে চলে গেলেন প্রিয় নেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়া। তাকে নিয়ে আজকের এই সামান্য স্মৃতিচারণ।

২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে লন্ডন যাই অসুস্থ ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে দেখতে। লন্ডন পৌঁছে ম্যাডামের ব্যক্তিগত চিকিৎসক প্রফেসর ডা: জাহিদকে ফোন দিয়ে ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা জানতে চাই। বলি, ম্যাডামকে দেখতে যেতে চাই। উত্তরে ডা: জাহিদ বললেন, ম্যাডামের সাথে দেখা করা খুবই রেস্ট্রিকটেড। তখন তাকে বললাম, আমি তাকে দেখতে না পারলেও অন্তত লন্ডন ক্লিনিকে গিয়ে রোগমুক্তি কামনায় গেট-ওয়েল কার্ড দিয়ে আসতে চাই। তিনি যেতে বললেন।

সে দিন ছিল ২০২৪-এর ২৩ জানুয়ারি। আমি সহধর্মিণীকে সাথে নিয়ে লন্ডন ক্লিনিকে পৌঁছাই। ম্যাডামের রোগমুক্তি কামনায় আমাদের পক্ষ থেকে একটি গেট-ওয়েল কার্ড ও ফুল ম্যাডামের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য ডা: জাহিদের হাতে তুলে দিই। এগুলো নিয়ে ডা: জাহিদ গিয়ে ম্যাডামকে আমার নাম বলেন। ম্যাডাম এ অসুস্থ শরীরেও আমাকে চিনতে পেরে আমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে ডা: জাহিদকে অনুমতি দেন।

আমরা ডা: জাহিদের কাছে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম; কিন্তু ডা: জাহিদ তড়িঘড়ি করে ফিরে এসে আমাদের ম্যাডামের কক্ষে নিয়ে গেলেন। ম্যাডাম জানতে চাইলেন, আমরা কেমন আছি? তার সাথে শুভেচ্ছাবিনিময়ের এক ফাঁকে আমার স্ত্রী জিজ্ঞাসা করল, ম্যাডাম, আপনাকে যে এত কষ্ট দিলো সে এখন কোথায়?

আমরা তার উওর শুনে স্তম্ভিত। তিনি একবারের জন্যও তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটিও মন্দ কথা বললেন না। শুধু বললেন, ‘আল্লাহ দেখবেন।’

আজ তার ইন্তেকালে মনে খুবই কষ্ট পাচ্ছি। বেশি কষ্ট পাচ্ছি এটা ভেবে যে, তার সাথে আমার অনেক দিন দেখা হয়নি, দেশে ছিলাম না বলে। কিন্তু এতদিন পর, নানা রোগে জর্জরিত অবস্থায়ও তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন। এ স্নেহ আমি কোথায় রাখব!

ম্যাডাম খালেদা জিয়া ছিলেন নির্ভীক নেত্রী। উল্লেখ করার মতো তার অনেক সাহসী কর্মকাণ্ডের উদাহরণ আছে। এর মধ্যে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই।

নব্বই-এর গণ-অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী সময়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় একদিন সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ছিল। ম্যাডামের আহ্বানে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সে সময়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়া সব দলের মধ্যে কেবল বিএনপিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বেশি যোগাযোগ রাখত। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে আমরা মিছিল নিয়ে সচিবালয়ের দিকে এগোচ্ছিলাম। মিছিল সচিবালয়ের কাছাকাছি পৌঁছতেই শুরু হলো পুলিশের টিয়ার শেল নিক্ষেপ। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল।

শুনলাম ম্যাডাম খালেদা জিয়া জনতার মিছিলের নেতৃত্বে সামনের কাতারে ছিলেন। তিনি টিয়ার গ্যাস শেলের আঘাতে আহত হয়েছেন। আমি ঝুঁকি নিয়ে ম্যাডামকে দেখতে সামনের দিকে এগিয়ে যাই। দেখি, ম্যাডাম আহত অবস্থায়ও জনতাকে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছেন। জনগণের মনের সাহস যাতে ভঙ্গ না হয় সে জন্য তিনি আহত হয়েও পিছিয়ে যাননি বা থেমে যাননি। এই অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়ও তার মনোবল ও দৃঢ়তা দেখে অভিভূত হই।

প্রশাসনে থেকে দলমত নির্বিশেষে প্রতিষ্ঠানের আইন অনুসারে দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজাগ। বিশেষ মহলের বাধা এড়িয়ে তিনি যখন আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেন, আমি ওই পদে যোগ দিয়ে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যাই। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার প্রতি তার কোনো উপদেশ আছে কি না জানতে চাই। তিনি বলেন, ‘আপনাকে যোগ্য বিবেচনা করেই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুসরণ করে ন্যায়নীতির সাথে দায়িত্ব নির্বাহ করবেন।’ আমি তার ন্যায়নিষ্ঠা দেখে অভিভূত।

ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ রয়েছি। কারণ বরাবর তার আস্থা অর্জন করতে পেরেছি। আমি যখন কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে তখন প্রো-ভিসির পদ শূন্য হয়। এই পদে প্রার্থী ছিলাম না; বরং এক বন্ধু সহকর্মীর প্রতি সমর্থন ছিল। কিন্তু তার সাথে আর একজন অধ্যাপক রেসে অবতীর্ণ হন। বিশ্বস্ত সূত্রে আমি যতটুকু জানতে পেরেছি, দু’জনের তীব্র তদবিরে ম্যাডাম বিরক্ত হয়ে তাদের কাউকে নিয়োগ না দিয়ে তার দফতরকে নির্দেশ দেন আমাকে নিয়োগ দিতে। আমি নিয়োগ দেয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে এ খবর জেনে অতি আশ্চর্য হলাম। লজ্জায় পড়ে গেলাম। কারণ রেসে প্রতিদ্বন্দ্বী সহকর্মী বন্ধুরা আমাকে ভুল বুঝতে পারেন।

কিন্তু ম্যাডামের আশীর্বাদ উপেক্ষা করে না বলার মতো অশোভন কাজ করাও আমার জন্য গর্হিত আচরণ হবে বিধায় আমি গ্রেসফুলি পদটি গ্রহণ করি। আমার এমন অনুভূতি হয় যে, আমি ম্যাডাম খালেদা জিয়ার আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছি।

প্রো-ভিসি পদে থাকার সময়ে ম্যাডাম একবার আমাকে তার সাথে দেখা করতে খবর পাঠান। যাওয়ার পর তিনি আমার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগে কোনো বৈষম্য করা হয় কি না জানতে চান। আমি একটু বিব্রত বোধ করি। বুঝতে পারি, তার কাছে খবর আছে। কারণ আমি দু-একবার নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি হিসেবে এ প্রবণতার মুখোমুখি হয়েছি; যদিও এ প্রবণতার প্রশ্রয় কখনো দিইনি। এর পেছনে তাদের যুক্তি ছিল যে, নারী শিক্ষকদের বিভাগের সব কাজে সবসময় পাওয়া যায় না। পারিবারিক কারণে তারা থাকতে পারেন না। বিশেষ করে, সন্ধ্যার পর বা রাতে জরুরি কাজেও তাদের পাওয়া কঠিন হয়ে যায়; কিন্তু ম্যাডাম এ কথায় সন্তুষ্ট হননি। তিনি বললেন, এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। এ ধরনের প্রবণতাকে প্রশ্রয় দেয়া ঠিক হবে না। খালেদা জিয়াই এ দেশে প্রথম নারী শিক্ষার উন্নয়নে উদ্যোগী হন। মেয়েদের হায়ার সেকেন্ডারি লেভেল পর্যন্ত বিনা খরচায় শিক্ষাদানের প্রথা চালু করেন তিনি। দেশের উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ছিলেন। তিনিই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে নারী প্রো-ভিসি নিয়োগ দেন। একজন নারীকে প্রথম সরকারি কর্মকমিশনের মতো উঁচু স্তরের প্রতিষ্ঠানে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেন।

বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে লিখে শেষ করা যাবে না। নানা কাজে তার সংস্পর্শে এসে অনেক চমৎকার স্মৃতি আমরা বহন করছি। আজ প্রার্থনা করি, আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।

লেখক : সাবেক প্রো-ভিসি ও ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়