আহসান হাবিব বরুন
আমাদের রাজনীতির একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো— দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতি জনগণের সেবা নয়; বরং ভোগবাদ, তোষামোদ, দুর্নীতি-সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার আর সন্ত্রাসের আশ্রয়স্থল হয়ে আছে। আদর্শের জায়গা দখল করেছে সুবিধাবাদ, নৈতিকতার জায়গায় বসেছে লেনদেন, আর জনস্বার্থের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ব্যক্তিস্বার্থের রাজত্ব। এই ‘বস্তাপচা’ রাজনীতি মানুষ চায় না— কারণ, এতে নেই জনকল্যাণের নামগন্ধ, আছে কেবল পুরনো পচে দুর্গন্ধ ছড়ানো গতানুগতিকতা।
সময় বদলেছে। প্রেক্ষাপট বদলেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— মানুষ বদলেছে। বাংলাদেশের মানুষ আজ আর সেই মানুষ নেই, যারা কেবল স্লোগানে ভেসে যাবে, বড় বড় অর্জনের ফাঁকাবুলি শুনে বর্তমানের অন্যায় মেনে নেবে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, স্মার্টফোনের আলোয়, প্রতিটি নাগরিক আজ একেকজন পর্যবেক্ষক। কে কী বলছে, কে কী করছে— সব কিছুর হিসাব এখন জনতার হাতের মুঠোয়। কোন দল চাঁদাবাজদের আশ্রয় দিচ্ছে, কোন দল দখলবাজদের প্রশ্রয় দিচ্ছে, কোন দল ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিচ্ছে— এসব আর আড়ালে থাকে না। ফলে পুরনো রাজনৈতিক চক্কর থেকে বেরুতে না পারলে, যত বড় দলই হোক, প্রাসঙ্গিকতা হারানো অনিবার্য।
২৫-৩০ বছর আগের চিন্তা-চেতনা বা ধ্যান-ধারণা নিয়ে রাজনীতি করার এখন দিন শেষ। মানুষ বহুমুখী নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ আর রাজনৈতিক সিন্ডিকেশনে অতিষ্ঠ। বিশেষ করে রাজনৈতিক নিপীড়ন মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে তারা শুধু পরিবর্তন চায় না, মুক্তি চায়। মুক্তির দিশা দেখতে চায়। যে রাজনীতি, যে রাজনৈতিক দল সেই মুক্তির পথ দেখাতে পারবে, জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে তাকেই বেছে নেবে— এটিই বাস্তবতা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্বীকার করতেই হবে— মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে রাজনীতি করার দিন সত্যিই শেষ হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি, আত্মপরিচয়ের শেকড়। কিন্তু সেই মহান চেতনার কথা বলে, কাজে তার সম্পূর্ণ বিপরীত আচরণ— এই দ্বিচারিতা মানুষ আর সহ্য করবে না।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ক্ষমতার রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এতটাই ব্যবহার হয়েছে যে, অনেকের মনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়েছে। মুখে চেতনা, কাজে চেতনাবিরোধিতা— এই ভণ্ডামির রাজনীতি আর চলবে না।
নতুন প্রজন্ম ইতিহাস অস্বীকার করে না; কিন্তু ইতিহাস দেখিয়ে বিভ্রান্ত করাও তারা মেনে নেয় না। তারা কথায় বিশ্বাস করতে চায় না; তারা দেখতে চায় কাজ। তারা শুনতে চায় না প্রতিশ্রুতি, তারা চায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দৃশ্যমান পরিবর্তন। এই প্রজন্ম জানে— দুর্নীতি আর চাঁদাবাজি বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা। এই দুই সমস্যার মূলে আঘাত করতে না পারলে উন্নয়ন হাজারো প্রতিশ্রুতি অর্থহীন।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী মাঠে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। আমরা দেখছি— অনেক নেতা হাজারটা স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, অজস্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন; কিন্তু দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রশ্নে তারা কার্যত নীরব। এই নীরবতা কাকতালীয় নয়, এটি রাজনৈতিক আপসের ফল, সুবিধাবাদী রাজনীতির অনিবার্য পরিণতি।
এই জায়গায় এসে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের অবস্থান আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে। তিনি প্রকাশ্যে চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। জনসভা থেকে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, বাংলাদেশকে চাঁদাবাজমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। কেউ তার সাথে একমত হোন বা না হোন— একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি এ দেশের মানুষের মনোভাব বুঝতে পেরেছেন, সময়কে ধারণ করতে পেরেছেন। তিনি সমস্যার জায়গাটি চিহ্নিত করেছেন— এটিই রাজনীতির প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ডা: শফিকুর রহমান ফেনীতে অনুষ্ঠিত জনসভায় যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা অনেক মানুষের মনের কথার প্রতিফলন। তিনি বলেছেন, জনগণের ভোটে জয়ী হলে দেশের চিত্র পাল্টে যাবে, চাঁদাবাজদের হাত অবশ করে দেয়া হবে, বংশানুক্রমিক ক্ষমতার সংস্কৃতি ভাঙা হবে। ‘রাজার ছেলে রাজা হবে’-এই ধারণার বিরুদ্ধে তার উচ্চারণ নিছক স্লোগান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দর্শনের ঘোষণা। একজন রিকশাচালকের সন্তানও যোগ্যতায় এমপি-মন্ত্রী হতে পারবে— এই স্বপ্নই তো প্রকৃত গণতন্ত্রের সারকথা।
তিনি শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন, জুলাই বিপ্লবের কথা বলেছেন, সাম্য ও ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন। একই সাথে তিনি পরিবেশ, প্রকৃতির ওপর জুলুমের কথাও এনেছেন— যা প্রমাণ করে, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়; এটি জীবনের সামগ্রিক দায়বদ্ধতা। চাঁদাবাজদের ‘বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়া’র যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, তা দেশের কৃষক, পরিবহন মালিক, খুচরা ব্যবসায়ীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— তিনি প্রশাসনিক অবহেলা ও ভাগ-বাটোয়ারার কারণে চাঁদাবাজি চললেও ভবিষ্যতে তা আর সহ্য করা হবে না বলে স্পষ্ট করেছেন। কার বাবা কে, কার মা কে— তা দেখা হবে না, এই ঘোষণা সাহসী। রাজনীতিতে এই সাহসটাই আজ সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত।
অন্যদিকে, বিএনপির অবস্থান আমাকে গভীরভাবে হতাশ করেছে। সত্যি বলতে কী, তারেক রহমানের সামনে একটি সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর তিনি দেশে ফিরেছেন, ২২ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে জনসভা করছেন। এই সময়টি ছিল নতুন ধারার রাজনীতির সূচনা করার, বস্তাপচা রাজনীতির সাথে স্পষ্টভাবে বিচ্ছেদ ঘোষণার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, কোনো জনসভায় তাকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কোনো ঘোষণা দিতে দেখা যায়নি; বরং তিনি শেখ হাসিনা আমলের বিতর্কিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ রাজনীতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
এটি বোধগম্য নয়। যে কার্ড রাজনীতি মানুষ ইতোমধ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই কার্ডই কেন তিনি বেছে নিলেন? আমি আশঙ্কা করি, এই কার্ড রাজনীতি বিএনপিকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো— তারেক রহমানের আশপাশে আবারো সেই পুরনো বিতর্কিত চরিত্রগুলোর উপস্থিতি। টেন্ডারবাজ, দখলবাজ, চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি— এদের মনোনয়ন ও প্রশ্রয় নতুন প্রজন্মের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। লন্ডনের মতো আধুনিক রাষ্ট্রের রাজধানীতে দীর্ঘ সময় বসবাস করেও তিনি বাংলাদেশের পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারলেন না— এটি সত্যিই বেদনাদায়ক।
রাজনীতি কোনো জাদুঘর নয়— এখানে পুরনো ধারণা ধরে রাখার সুযোগ নেই। রাজনীতি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল। সময়কে ধরতে না পারলে, জনগণের ভাষা বুঝতে না পারলে, ইতিহাস যত বড়ই হোক— ভবিষ্যৎ থাকে না।
আজকের বাংলাদেশে মানুষ পরিষ্কারভাবে বলতে শুরু করেছে— বস্তাপচা রাজনীতি নিপাত যাক। তারা এমন রাজনীতি চায়, যেখানে আদর্শ থাকবে; কিন্তু আদর্শের নামে ভণ্ডামি থাকবে না; যেখানে ইতিহাসের সম্মান থাকবে; কিন্তু ইতিহাসের দোহাই দিয়ে বর্তমানের অন্যায় ঢেকে রাখা হবে না; যেখানে উন্নয়ন থাকবে; কিন্তু দুর্নীতির ওপর দাঁড়িয়ে নয়।
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পারলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি— এ দেশের মানুষের অর্ধেকের বেশি সমস্যা আপনাতেই মিটে যাবে। মানুষের জীবনযাপন সহজ হবে, স্বাচ্ছন্দ্যময় হবে, নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসবে। রাষ্ট্র তখন আর শোষণের যন্ত্র থাকবে না; রাষ্ট্র হবে সেবার বাহন।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল একটি নির্বাচন নয়— এটি একটি গণভোট। পুরনো বনাম নতুনের, ভণ্ডামি বনাম সততার, বস্তাপচা রাজনীতি বনাম পরিবর্তনের রাজনীতির লড়াই। জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে— কে তাদের মুক্তির পথ দেখাতে পারে।
একটি কথা পরিষ্কার— যে দল, যে নেতা মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হবে, সে দল ভবিষ্যতের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। বাংলাদেশের রাজনীতিও আর কারো জন্য অপেক্ষা করবে না।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



