রফতানি বহুমুখীকরণ দরকার

আশা করা যায়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন হলে এবং নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে দেশের বিনিয়োগ, আমদানি ও রফতানিতে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে।

দেশের রফতানি খাতে এখনো শীর্ষে রয়েছে তৈরী পোশাক শিল্প। ১৯৮৪ সালে জাতীয় রফতানিতে তৈরী পোশাক শিল্পের অংশ ছিল ০.০১ শতাংশ। সেখান থেকে আজ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৫০ শতাংশ, যা তৈরী পোশাক শিল্প উদ্যোক্তাদের সাফল্যের প্রমাণ। সাথে ছিল সরকারের নীতিসহযোগিতা। বিগত দুই অর্থবছরের রফতানি আশাব্যঞ্জক। ২০২৩-২৪ সালে রফতানি চার হাজার ৪৪৭ কোটি ডলার এবং ২০২৪-২৫ সালে চার হাজার ৮২৮ কোটি ডলার। প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

গত অর্থবছরে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি

সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মে পর্যন্ত প্রত্যেক মাসেই পণ্য রফতানি বেড়েছে। তবে শেষ মাস জুনে রফতানি সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে।

বিদায়ী অর্থবছরে দেশ থেকে সব মিলিয়ে চার হাজার ৮২৮ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ১৬ কোটি টাকার মতো। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল চার হাজার ৬৪৩ কোটি ডলারের পণ্য।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গত সপ্তাহে পণ্য রফতানি আয়ের হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, তৈরী পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল, চামড়াবিহীন জুতা ও হিমায়িত খাদ্যের রফতানি বেড়েছে। অন্যদিকে, পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি কমেছে।

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি থাকার কারণে কারখানা বন্ধ ছিল। সে সময় পণ্য রফতানি হয়নি। আবার মাসের শেষ দিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে ২৬ ও ২৭ জুন পণ্য আমদানি-রফতানি পুরোপুরি বন্ধ ছিল। মূলত এ দু’টি কারণে জুন মাসে পণ্য রফতানি তুলনামূলক কম হয়েছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে বিদায়ী অর্থবছরের শুরুতে রফতানি বাণিজ্য হোঁচট খায়। তারপর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বহুমুখী দাবি আদায়ের আন্দোলন, শ্রম অসন্তোষে বেশি ভুগেছে তৈরী পোশাক শিল্প। এরপর গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন সমস্যা ব্যবসায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সবশেষে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনে টানা দু’দিন পণ্য আমদানি-রফতানি বন্ধ ছিল। এভাবে অর্থবছরের পুরোটা সময় এক ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করেছে দেশের পণ্য রফতানিসহ সামগ্রিক ব্যবসায়-বাণিজ্য।

গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রফতানি হয় চার খাতে। অবশ্য তিন বছরের ব্যবধানে সেখান থেকে বেরিয়ে গেছে দু’টি খাত- প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য ও হোম টেক্সটাইল। বিদায়ী অর্থবছরে তৈরী পোশাক এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে।

নতুন অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে নির্বাচনকেন্দ্রিক অস্থিরতা। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের বাস্তবসম্মত সমাধান না হলে সে দেশের বাজারে পণ্য রফতানি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। আর দেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে রফতানিকারকদের ভুগতে হবে।

গত এক সপ্তাহে গ্যাসসঙ্কটের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারলে গ্যাসসঙ্কট হয়তো প্রকট হবে না। বর্তমানে তৈরী পোশাকের ক্রয়াদেশ সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে।

তৈরী পোশাকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১৫ কোটি ডলারের রফতানি আয় এসেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাত থেকে। এই রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ বেশি। সে অর্থবছরে ১০৪ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি হয়েছিল।

গত ২০১১-১২ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রফতানি হয়, যা পরের বছর ২৭ শতাংশ কমে যায়। তবে বিদায়ী অর্থবছরে রফতানি বেড়েছে আড়াই শতাংশ। এ সময়ে রফতানি হয়েছে ৯৯ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য।

পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি গত দুই অর্থবছর ধরে কমছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১৩ কোটি ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানি হয়। পরের বছর সেটি কমে হয় ৯১ কোটি ডলার। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানি হয়েছে ৮২ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৪ শতাংশ কম। এ ছাড়া বিদায়ী অর্থবছরে ৮৭ কোটি ডলারের হোম টেক্সটাইল, ৩২ কোটি ডলারের চামড়াবিহীন জুতা, ৫৪ কোটি ডলারের প্রকৌশল পণ্য, ৪৪ কোটি ডলারের হিমায়িত খাদ্য, ২৮ কোটি ডলারের প্লাস্টিক পণ্য রফতানি হয়েছে।

দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিদায়ী অর্থবছরে পণ্য রফতানিতে যেটুকু প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেটিকে ইতিবাচক বলতে হবে। তৈরী পোশাক শিল্প মালিকরাও বলেন, পণ্য রফতানি ভালো হওয়ার কারণ ট্রাম্প ফ্যাক্টর। নতুন অর্থবছরে চীন থেকে প্রচুর ক্রয়াদেশ সরে এসেছে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

রফতানি খাতে নতুন সংযোজন

১. তৈরী পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। অন্যান্য খাতের পণ্য রফতানি বৃদ্ধির জন্য সরকারকে নীতিসহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

২. আইটি খাতের রফতানির হিসাব এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আইটি খাতের রফতানি সংযুক্ত করলে রফতানি আরো বেশি দেখা যাবে। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রফতানির তথ্য সংগ্রহ করে নথিবদ্ধ করা দরকার।

৩. গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে দেশের পণ্য রফতানি বৃদ্ধি পাবে। নতুন নতুন পণ্য রফতানিতে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

৪. দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ আরো বেশি জোরদার ও কার্যকর করতে হবে। ব্যাংকের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। বর্তমানে ব্যাংকের ১৩ থেকে ১৮ শতাংশ সুদের চাপে ব্যবসায়ীরা দিশেহারা।

৫. বিনিয়োগের পূর্বশর্ত হচ্ছে দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এটি অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের স্বার্থে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে দেশে নির্বাচিত ও টেকসই সরকারের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করেন না। বিনিয়োগকারীরা সবার আগে এটিই চান। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিনিয়োগের স্বার্থে খুবই প্রয়োজন। আশা করা যায়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন হলে এবং নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে দেশের বিনিয়োগ, আমদানি ও রফতানিতে নতুন জোয়ার সৃষ্টি হবে।

লেখক : সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই