দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড : শক্তিধর ডিপ স্টেট

দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা সব সময়ই ছিল। এদের শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা নীরবেই তাদের কষ্টের কথা গোপনে বলে বেড়ান। কিন্তু পুলিশ বা সরকারের কাছে এর কোনো প্রতিকার চেয়ে পান না বা চাইতেই ভয় পান। এসব সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের কথা ওপেন সিক্রেট হিসেবেই সচেতন দেশবাসী জানেন, বুঝেন ও অনুভব করেন। আইনশৃঙ্খলা সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব- সবাই এগুলো জানে। কিন্তু শুধু প্রতিকারটুকু পান না ভুক্তভোগীরা। তা হলে কি দেশের সভ্যতা, সমাজ, নাগরিকরা এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাছে জিম্মি হয়েই থাকবেন? প্রশ্ন হলো- আমাদের দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড একটি অদম্য ডিপ স্টেট হয়ে উঠেছে কি-না!

গত কয়েক মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। দিনে প্রচুর জনসমাগম স্থানে এসব হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর শিকার হয়েছে এক সময়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়ারা। এসব হত্যাকাণ্ড দেশব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টির পাশাপাশি আমাদের বিরাজমান আইনশৃঙ্খলার দুরবস্থার কথা জানান দিয়েছে। সেই সাথে অনেক প্রশ্ন তুলছে নাগরিকদের মনে।

বেপরোয়া হত্যাকাণ্ড : গত ৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুরাতন ঢাকায় স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নং গেটের সামনে লালচাঁদ সোহাগ নামে একজন ভাঙ্গাড়ি ব্যবসায়ী খুন হন। বিকেলের ব্যস্ত জনমানুষের সামনে একদল অস্ত্রধারী তাকে তার দোকান থেকে টেনে-হিঁচড়ে হাসপাতাল গেটের সামনে নিয়ে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। তাকে আহত করার পর উলঙ্গ করে নৃশংসভাবে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়া হয়। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসান মাহিন গ্রেফতার হয় এবং পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ঘটনার পরে সংশ্লিষ্টদের বিএনপি দল থেকে বহিষ্কার করে। সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, হত্যাকারীরা একসময় সোহাগের ব্যবসায়ী সঙ্গী ছিল। তাদের ভাঙ্গাড়ি ব্যবসার দ্ব›দ্ব, স্থানীয় ভাঙ্গাড়ি দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা দেয়া না দেয়াকে কেন্দ্র করে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। অনেকের ধারণা, অন্যদের সতর্ক সঙ্কেত দেয়ার জন্যই হত্যাকাণ্ডে নৃশংসতা প্রদর্শন করা হয়েছে।

গত ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নির্বাচনী মিছিল বের করলে একজন অস্ত্রধারী গুলি চালালে সারওয়ার হোসেন বাবলা নামে একজন নিহত হয় এবং এমপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ আহত হন। জানা যায়, নিহত বাবলা একজন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অবৈধ অস্ত্র ও চাঁদাবাজির বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। ওই ঘটনায় ছয় সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত চলমান। তবে পুলিশের ধারণা, ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ দ্বন্দ্বের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, বাবলাই হত্যাকারীর টার্গেট ছিল। আর এমপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ ঘটনাক্রমে এলোপাতাড়ি গুলিতে আহত হয়েছেন। ওই হত্যাকাণ্ডটিও ঘটেছে অজস্র্র মানুষের সামনে। প্রশ্ন জাগে, তালিকাভুক্ত আসামি কী করে একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর মিছিলে অংশগ্রহণ করে? এতে রাজনীতির সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ডের একটি নেক্সাসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

গত ১০ নভেম্বর বেলা ১১টায় রাজধানীর সুত্রাপুরে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সামনে আদালত চত্বর এলাকায় মামুন নামে এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দু’জন মুখোশপরা অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে মামুনকে পিস্তল দিয়ে গুলি করে। নিহত মামুন একজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী বলে জানা যায়। পুলিশের তথ্যমতে, ‘ইমন-মামুন’ গ্রুপের অন্যতম লিডার ছিল মামুন। এই গ্রুপ চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের ভাই সাইদ আহমেদ টিপু হত্যায় অভিযুক্ত। সূত্রমতে জানা যায়, এলাকার আধিপত্য নিয়ে ইমনের সাথে দ্ব›দ্ব চলছিল মামুনের। ইমনের নির্দেশে ফারুক হোসেন ও রবিন আহমেদ ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। হত্যাকারী দু’জন ভাড়ায় খুন করেছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশ।

গত ১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনজন মুখোশ ও হেলমেট পরা অস্ত্রধারী মিরপুরের পল্লবীতে গোলাম কিবরিয়া নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করে। পল্লবী থানা যুবদল নেতা কিবরিয়া এ সময় হার্ডওয়্যার দোকানে বসে ছিলেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এলাকার আধিপত্য ও চাঁদা নিয়ে দ্ব›দ্ব এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে জনি ভূঁইয়া নামে এক সন্ত্রাসীকে জনতা আটক করে পুলিশে দিলে সে হত্যার দায় স্বীকার করে। এটি পেশাদার চুক্তিভিত্তিক খুন বলে পুলিশ ধারণা করছে। আর হত্যার নির্দেশদাতা ও অর্থদাতা একজন প্রবাসী শীর্ষ সন্ত্রাসী, যে এক সময় নিহত কিবরিয়ার বন্ধু ছিল। বর্তমানে কিবরিয়া চাঁদাবাজিতে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল বলে পত্র-পত্রিকা থেকে জানা যায়।

গত ৩০ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টায় খুলনা মেট্রোপলিটন সেশন জজ আদালতের প্রবেশ গেটের সামনে হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন গুলিতে নিহত হন। কয়েকজন অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে দু’জনের মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়। জানা যায়, হত্যার শিকার যুবকরা হত্যা, অস্ত্র মামলা, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ছিল। তারা স্থানীয় অপরাধী ‘পলাশ গ্রুপের’ সদস্য ছিল।

অপরাধ বিশ্লেষণ : আলোচিত পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের একটি সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন ও কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডই সংঘটিত হয়েছে প্রচুর জনসমাগম স্থানে বা দিন-দুপুরে হাজারো মানুষের সামনে। অর্থাৎ- হত্যাকারীরা ছিল অত্যন্ত বেপরোয়া ও আত্মপ্রত্যয়ী। সবগুলোতেই সুনিপুণ পরিকল্পনার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু নিশ্চিত করা হয়েছে। উল্লিখিত চারটি ঘটনায় পিস্তল অথবা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীরা মূলত ভাড়াটে পেশাদার হত্যাকারী ছিল। আর হত্যার মূল মাস্টারমাইন্ড হয় বিদেশ থেকে অথবা পর্দার অন্তরালে থেকে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছে। খালি চোখে দেখা যাচ্ছে, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব, এলাকার আধিপত্য বিস্তার, চাঁদা সংগ্রহ বা ভাগাভাগি ইত্যাদি ছিল হত্যাকাণ্ডের মোটিফ। তবে পেছনের গল্প আন্ডারওয়ার্ল্ডেই রয়ে গেছে। কিন্তু তিনটি হত্যাকাণ্ডের সাথে রাজনীতির সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।

আন্ডারওয়ার্ল্ডে সা¤প্রতিক অস্থিরতার কারণ : সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ডে অপরাধ বিজ্ঞানী এবং সমাজ চিন্তকরা বেশ কয়েকটি কারণের কথা আলোচনা করছেন। এসব সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের মূল কারণ কাঁচা টাকা বা চাঁদার অংশীদারিত্ব বা স্বত্বাধিকারী নির্ধারণ। তবে এর পেছনে জাতীয়ভাবে অসংখ্য অভ্যন্তরীণ কারণ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণের সাথে সাথে আন্ডারওয়ার্ল্ড বা অপরাধ জগতেও মেরুকরণ ঘটেছে। আওয়ামী মদদপুষ্টরা পালিয়ে যাওয়ায় সেই অন্ধকার জগতে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যতা পূরণে চলছে ‘ডু-অর-ডাই’ প্রতিযোগিতা। বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতা সেই শূন্যতাকে দ্বিগুণ করে দিয়েছে। অন্য দিকে সফল গণ-অভ্যুত্থানে দেশের পুলিশ বাহিনী কাঠামোগতভাবে এবং নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, এখন পর্যন্ত সুসংহত হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে অপরাধীরা এই সময়টিকে তাদের সোনালি যুগ হিসেবে ধরে নিয়েছে। আর দুর্নীতিবাজ অফিসাররা তাদের অনৈতিক অর্থনৈতিক কার্যকলাপ ৫ আগস্টের আগের মতোই জারি রেখেছে সমান তালে। তবে অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেপরোয়া হয়ে উঠার পেছনে। এদেরকে সামনের নির্বাচন, এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার, নিজস্ব কর্মীবাহিনী পরিচালনা ইত্যাদিতে ব্যবহার করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সাথে একটি অশুভ চক্র তৈরি হচ্ছে। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অস্তিত্ব এবং তৎপরতার বিষয়ে সরকারের নীরবতা এর বিস্তৃতির একটি বড় কারণ। এই মৌনতাকে সরকারের নিঃশব্দ অনুমোদন বলে ধরে নেয় মূল অপরাধীরা। এ ছাড়া গত অভ্যুত্থানের সময় বড় দু’টি ঘটনা ঘটেছে যা আন্ডারওয়ার্ল্ডকে চঞ্চল করে তুলেছে। একটি হলো- বিভিন্ন থানা লুট করে কয়েক হাজার অস্ত্র সন্ত্রাসীরা নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ৩০০ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যার মধ্যে পিস্তলই হলো প্রায় ৪০০টি। দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো- বেশ কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী অভ্যুত্থানের পরপরই জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছে এবং অনেকেই প্রবাস থেকে দেশে ফিরছে। এসব অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রত্যাবর্তন দেশের অপরাধ জগতকে অস্থির করে তুলেছে। ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃত বেশ কিছু অপরাধীর হাতে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র পাওয়া গেছে। এগুলো তারা ক্রয় করে বা ভাড়ায় ব্যবহার করছে বলে জানায়। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য আরো দায়ী করে থাকেন আমাদের নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ব্যাপক বেকারত্বের হারকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সম্প্রতি বলেছেন, ‘দেশে একদল চাঁদাবাজি থেকে সরে গেছে, আরেক দল সেটি দখল করেছে। আমরা এখন এটি দৃশ্যমানভাবে দেখতে পাচ্ছি। চাঁদাবাজির পেছনে আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা দায়ী।’ (প্রথম আলো, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫)

আন্ডারওয়ার্ল্ড সরকারের চেয়েও শক্তিশালী : একটি বড় প্রশ্ন হলো- আমাদের দেশে অপরাধ জগত কি সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী? স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি সরকারের আমলেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা সুস্পষ্ট ছিল এবং আছে! এটি একটি ওপেন সিক্রেট যে, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বড় আকারের জমি ক্রয়-বিক্রয় ও বড় বাসাবাড়ি বা অবকাঠামো নির্মাণ প্রক্রিয়ায় বিশাল অঙ্কের অর্থ আন্ডারওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন গোষ্ঠীপ্রধানকে চাঁদা হিসেবে দিতে হয়। বর্তমানে বেশ কয়েকটি আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের তৎপরতা অনুভব করা যায়। রাজধানীতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত এই নেটওয়ার্ক। পাইকপাড়া, কল্যাণপুর, আদাবর ও মোহাম্মদপুরের কিছু অংশ নিয়ে একটি এলাকা। মিরপুর-১ এবং শাহআলী নিয়ে একটি অঞ্চল। মিরপুর-১০, ১৩ ও ১৪, ইব্রাহিমপুর, কচুখেত এবং ভাসানটেক হলো অন্য একটি গোষ্ঠীর এলাকা। (ডেইলি স্টার, ১৬ নভেম্বর ২০২৫) পুলিশের তথ্য মতে, বেশির ভাগ শীর্ষ গ্যাংলিডার বিদেশে বসে তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে স্থানীয় সহযোগী ও ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসীর মাধ্যমে। আর বেশ কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী দেশের জেলখানায় বসেই তাদের অপরাধ জগতের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে।

নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ : অতিশক্তিধর হয়ে ওঠা ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ চক্রকে নিয়ন্ত্রণ বা নিষ্ক্রিয় করা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই যথেষ্ট এই মহাশক্তিধর অপরাধ চক্রকে দমন করতে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধীরা তাদের পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে ফেলবে। এর পর কয়েকটি পদক্ষেপেই আন্ডারওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ককে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেয়া সম্ভব। প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে সেটি হলো- পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার নির্দেশনা ও সুযোগ দিতে হবে। দেশের প্রত্যেকটি সরকারের সময়ই এই সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ জগতের অস্তিত্ব¡ ও তৎপরতা পুলিশের নখদর্পণে ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের অসাধু কর্মকর্তারা এর সুবিধাভোগী ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। অবশ্য এতে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও সরাসরি যোগসাজশ ছিল। কাজেই পুলিশকে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নির্দেশনা দিয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। সেই সাথে দেশের কারাগারের সংস্কার প্রয়োজন। কারাগারে বন্দী শীর্ষ সন্ত্রাসীরা যেন কারাগারে বসেই তাদের ‘সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধী’ চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে চাঁদাবাজি, টার্গেট কিলিং এবং মাদক কারবার পরিচালনা করতে না পারে।

দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা সব সময়ই ছিল। এদের শিকার হয়ে ভুক্তভোগীরা নীরবেই তাদের কষ্টের কথা গোপনে বলে বেড়ান। কিন্তু পুলিশ বা সরকারের কাছে এর কোনো প্রতিকার চেয়ে পান না বা চাইতেই ভয় পান। এসব সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের কথা ওপেন সিক্রেট হিসেবেই সচেতন দেশবাসী জানেন, বুঝেন ও অনুভব করেন। আইনশৃঙ্খলা সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব- সবাই এগুলো জানে। কিন্তু শুধু প্রতিকারটুকু পান না ভুক্তভোগীরা। তা হলে কি দেশের সভ্যতা, সমাজ, নাগরিকরা এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাছে জিম্মি হয়েই থাকবেন? প্রশ্ন হলো- আমাদের দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড একটি অদম্য ডিপ স্টেট হয়ে উঠেছে কি-না!

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]