নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপির ছায়া

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সুযোগ, অথবা অতীতের ‘সূক্ষ্ম কারচুপির’ ছায়ার পুনরাবৃত্তি। ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্ট জানাচ্ছে, বৈধতা ছাড়া স্থিতিশীলতা টেকে না।

বাংলাদেশে নির্বাচন কখনোই কেবল একটি তারিখের ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা, শাসনব্যবস্থার চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষার ক্ষণ। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তাই নতুন করে সামনে এসেছে একটি পুরনো কিন্তু মীমাংসিত প্রশ্ন : এই নির্বাচন কি ২০০৮ সালের মতো আরেকটি ‘সূক্ষ্ম নির্বাচনী কারচুপি’র পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না- এই সরল দ্বৈধতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে নিহিত আছে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ব্যবস্থাপনার কৌশল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ২০০৮ সালের নির্বাচন যেমন কেবল ভোটের দিনের ঘটনা ছিল না, তেমনি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও শুধু একটি তারিখে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বহুবিধ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সমন্বয়ে একটি সম্ভাব্য সঙ্কটময় মুহূর্ত।

২০০৮ নির্বাচন : প্রতিযোগিতা কি সত্যিই ছিল

২০০৮ সালের নির্বাচন বহুল আলোচিত। ভোটার উপস্থিতি ছিল নজিরবিহীন, প্রকাশ্য সহিংসতা তুলনামূলক কম এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছিল। সে সময় এটিকে অনেকেই ‘সেরা নির্বাচন’ হিসেবে প্রচার করেন।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিশ্লেষণে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। প্রকাশ্য ব্যালট কারচুপির অভিযোগ না থাকলেও নির্বাচনের অনেক আগেই প্রশাসনিক ভারসাম্য নির্ধারণ করা হয়, শক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›িদ্বতাকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করা হয় এবং নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়।

এটিই ছিল ‘সূক্ষ্ম নির্বাচনী কারচুপি’ যেখানে ব্যালট বাক্সের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল নির্বাচনের পরিবেশ, প্রতিযোগিতা ও রাজনৈতিক বয়ান। ভোটের দিনটি শান্তিপূর্ণ ছিল; কিন্তু ভোটের আগেই রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং শক্তির ভারসাম্য নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

অর্থাৎ- ২০০৮ সালের নির্বাচন ‘প্রকাশ্য স্বচ্ছ’ ছিল; কিন্তু কাঠামোগতভাবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়াটি পরবর্তীতে শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে দেখা গেছে, যেখানে নির্বাচন হয়েছে; কিন্তু গণতন্ত্রের প্রকৃত বিকল্প সীমিত ছিল।

১২ ফেব্রুয়ারি : কেন সেই স্মৃতি আবার প্রাসঙ্গিক

আজকের বাংলাদেশ ২০০৮ সালের বাংলাদেশ নয়। সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রবাহ দ্রুততর হয়েছে, রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। তবুও, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে যখন একই ধরনের আশঙ্কা ফিরে আসে, তা নিছক অতীতভীতি বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না। এই আশঙ্কার পেছনে অন্তত চারটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে সরাসরি স্পর্শ করছে।

এক. রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় অপরিবর্তিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি : নির্বাচন কেবল নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয় না। এটি নির্ভর করে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত। ফলে, সরাসরি ভোট জালিয়াতি না হলেও, মামলা-মোকদ্দমা, অনুমতি-নিষেধ, নিরাপত্তাব্যবস্থার অসম প্রয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পক্ষপাত- এসবের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠ একপেশে করে তোলার সুযোগ থেকে যায়। প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান নয়; কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে গভীর প্রভাব ফেলে।

দুই. ‘অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন দেখানোর কৌশল : ২০০৮ সালের নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রতিযোগিতা প্রদর্শনের জন্য একটি দৃশ্যমান আবরণ তৈরি করা। এতে দেখা যেত, নির্বাচনে অংশগ্রহণ আছে; কিন্তু কার্যকর বিরোধিতা নেই। একাধিক দল থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতার বিকল্প তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে বলেন ম্যানেজড ডেমোক্র্যাসি, যেখানে নির্বাচন কাঠামোগতভাবে অক্ষুণœ থাকে; কিন্তু রাজনৈতিক আত্মা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

তিন. আন্তর্জাতিক বাস্তবতা-স্থিতিশীলতার বয়ান : ২০০৮ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল মূলত একটি কারণে- তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা। গণতন্ত্রের গুণগত মান নয়; বরং স্থিতিশীল সরকার তখন প্রধান বিবেচ্য ছিল। আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বাংলাদেশকে কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের দেশ হিসেবে দেখে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সাথে যুক্ত। এই পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক গভীরতার চেয়ে ‘ম্যানেজেবল আউটকাম’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, একটি নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে আপত্তিহীন হলেও অভ্যন্তরীণভাবে বৈধতার সঙ্কটে পড়ে।

চার. প্রযুক্তি ও আইনি নিয়ন্ত্রণ-আধুনিক কারচুপির রূপ : ২০০৮ সালের নির্বাচনকার্য ছিল তুলনামূলকভাবে সরল। রাষ্ট্রের হাতে সীমিত নিয়ন্ত্রণের উপকরণ ছিল, ভোটের দিন কেন্দ্র দখলের প্রয়োজন থাকত এবং প্রকাশ্য কারচুপির চ্যালেঞ্জও তুলনামূলকভাবে সহজে নজরে আসত। তবে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক প্রযুক্তি, আইনি কাঠামো এবং সামাজিক ভয়ের সংস্কৃতি একত্র হয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘নীরব কারচুপির’ নতুন রূপ তৈরি করেছে।

প্রথমে, ডিজিটাল নজরদারি ভোট ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। অনলাইন প্রচারণা, সোশ্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যপ্রবাহের ম্যানিপুলেশন ক্ষমতাসীন পক্ষকে ভোটারদের প্রভাবিত করার সুযোগ দেয়। একই সাথে, আইনি কাঠামোর ব্যবহার বিরোধী দল ও সমালোচকদের কার্যক্রম সীমিত করে। নির্বাচন-সংক্রান্ত মামলা, অনুমতি-নিষেধ ও আইনি চাপের মাধ্যমে প্রতিদ্ব›দ্বীদের মাঠ অসম করে তোলা যায়।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক ভয়ের পরিবেশ নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিদ্ব›দ্বীদের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি হয়। ফলে ভোটার এবং প্রার্থীরা মুক্তভাবে অংশ নিতে ভয় পায়। ফলাফল, ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ হলেও, ভোটের আগেই রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্ধারিত হয়ে যায়। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, জাল ভোট বা প্রকাশ্য কারচুপির চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এই নীরব ও কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ, যা আধুনিক নির্বাচনকে শুধু প্রক্রিয়াগতভাবে বৈধ রাখে; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিনিধিত্বশীল করে তোলে।

সংক্ষেপে, প্রযুক্তি এবং আইনি নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় নির্বাচনী কারচুপির একটি নীরব; কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর রূপ সৃষ্টি করেছে।

আন্তর্জাতিক তুলনা : বাংলাদেশ একা নয়

বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বর্তমান ঝুঁকি বোঝার জন্য দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা জানা গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক কর্তৃত্ববাদ আর ক্ষমতা প্রদর্শনের ওপরে নির্ভর করে না; বরং এটি ব্যালট, আইন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে টিকে থাকে।

পাকিস্তান : দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান ‘হাইব্রিড ডেমোক্র্যাসি’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে নির্বাচন নিয়মমাফিক হয়, ভোটার উপস্থিতি থাকে; কিন্তু প্রতিদ্ব›দ্বী রাজনৈতিক শক্তিকে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে দুর্বল করা হয়, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং ক্ষমতার বিকল্প সীমিত রাখা হয়। এর ফলে ভোটের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত থাকে।

মিসর : মিসরের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা আরো স্বচ্ছ। নির্বাচন নিয়মিত হয়; কিন্তু শক্তিশালী বিরোধী প্রার্থীরা আগেই বাদ পড়ে, রাজনৈতিক পরিসর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকে। নির্বাচন মূলত ক্ষমতার পুনঃনিশ্চয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

তুরস্ক : তুলনামূলকভাবে সূক্ষ্ম মডেল। এখানে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন সম্ভব; প্রতিদ্ব›িদ্বতা আছে; কিন্তু মিডিয়ার বড় অংশ সরকারপন্থী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনি কাঠামো পক্ষপাতপ্রবণ, ফলে মাঠ অসম থাকে।

বাংলাদেশের ঝুঁকি হলো- এই তিন মডেলের সংমিশ্রণ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। নির্বাচন হতে পারে আইনগতভাবে বৈধ, আন্তর্জাতিকভাবে আপত্তিহীন; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অপ্রতিনিধিত্বশীল।

সংক্ষেপে, বাংলাদেশ একা নয়। পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দেয়, নির্বাচনের প্রক্রিয়া থাকলেও, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোগত কারচুপি গণতন্ত্রের আভাসকে ক্ষয়প্রাপ্ত করে। এটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে, যা স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সঠিক নজরদারি ও প্রতিরোধের তাগিদ জাগায়।

নির্বাচন আগেই প্রভাবিত : কী বলছে ইতিহাস

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- ভোট শান্তিপূর্ণ হওয়া মানেই গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরবর্তী অভিজ্ঞতা এই সত্যকে স্পষ্ট করেছে। বিরোধী দলের শক্তি সীমিত করা, রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চাপ তৈরি করা এবং স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ- সব মিলিয়ে জনগণের প্রকৃত সম্মতি ছাড়া সরকার টিকতে পারে না।

এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে তিনটি গুরুতর প্রভাব ফেলে। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ক্ষয় হয়। আদালত, পুলিশ ও প্রশাসন নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হলে জনগণ তাদের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সঙ্কুচিত হয়। ভোটারদের প্রভাব সীমিত থাকে। তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিস্ফোরণ দেখা দেয়। যখন জনগণ অনুভব করে, তাদের ভোটের গুরুত্ব নেই, তখন হতাশা, বিদ্রোহ ও অস্থিরতার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

সংক্ষেপে, ইতিহাস প্রমাণ করে- বৈধতা ছাড়া স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। নির্বাচন স্বাধীন, মুক্ত ও ন্যায্য পরিবেশে অনুষ্ঠিত না হলে, সেটি নিছক প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়। বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি বা অন্যান্য জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষা প্রাসঙ্গিক- গণতন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে ভোটের আগে তৈরি রাজনৈতিক পরিবেশের ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতায়, কেবল ব্যালট বাক্সে নয়।

বাংলাদেশ বনাম আন্তর্জাতিক উদাহরণ

আধুনিক নির্বাচনী রাজনীতিতে গণতন্ত্র আর কর্তৃত্ববাদের সীমারেখা ক্রমেই ঝাপসা হয়ে উঠছে। বাংলাদেশকে এই প্রেক্ষাপটে দেখলে স্পষ্ট হয়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ। নির্বাচন হয়, ভোটার উপস্থিতিও থাকে; কিন্তু আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে ফলাফলের সীমা আগেই নির্ধারিত থাকে।

পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের ঝুঁকি স্পষ্ট। বাংলাদেশ এমন এক মডেলের দিকে যেতে পারে, যেখানে নির্বাচন আইনগতভাবে বৈধ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে; কিন্তু রাজনৈতিকভাবে হবে অপ্রতিনিধিত্বশীল। এই পরিস্থিতিতে সরকার টিকে থাকে; কিন্তু গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি- জনগণের প্রকৃত সম্মতি ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।

১২ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়

প্রশ্ন শুধু ২০০৮ সালের পুনরাবৃত্তি হবে কি না তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কোন পথ বেছে নিচ্ছে? পাকিস্তানের মতো নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা? মিসরের মতো বিকল্পহীন নির্বাচন? নাকি তুরস্কের মতো অসম কিন্তু খোলা রাজনীতি?

যদি এই নির্বাচন জনগণের ক্ষমতা পরিবর্তনের বাস্তব সুযোগ না দেয়, তবে এটি হবে সূক্ষ্ম কারচুপির আধুনিক সংস্করণ। শান্তিপূর্ণ দেখালেও এটি গভীরভাবে অস্থিরতার বীজ বপন করবে। গণতন্ত্রের শক্তি ভোটের বাক্সে নয়; তা নিহিত থাকে প্রতিযোগিতার ন্যায্যতায়। সেই ন্যায্যতা ছাড়া নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়, ইতিহাসে ফিরে আসে হারানো সুযোগ হিসেবে।

উপসংহার : জনগণ, কাঠামো ও ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সরকারি কাঠামো কতটা নিরপেক্ষ, নির্বাচন কতটা মুক্ত এবং জনগণ কতটা অংশগ্রহণ করে। শুধু ভোটের দিন শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ করলেই গণতন্ত্র টিকে থাকে না। ভোটের আগের পরিবেশ, প্রতিযোগিতার সুযোগ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নির্ধারণ করে নির্বাচনের প্রকৃত বৈধতা।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সুযোগ, অথবা অতীতের ‘সূক্ষ্ম কারচুপির’ ছায়ার পুনরাবৃত্তি। ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্ট জানাচ্ছে, বৈধতা ছাড়া স্থিতিশীলতা টেকে না।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত