নতুন মোড়কে পুরনো মদ

বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সঙ্কট ক্ষমতার নয়, ন্যায়-শৃঙ্খলা-ঐক্যের। পুরনো বয়ান নতুন করে চাপিয়ে দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়া যায় না। রাজনীতি মানে কেবল রাজপথ দখল নয়, সঠিক বয়ান তৈরি করা। এই বয়ানই ঐক্য গড়ে, এই বয়ানই রাজপথের শক্তি হয়ে ওঠে, এই বয়ানই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় পৌঁছে দেয়

ডা: মো: এনামুল হক
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে গত ১৬ বছর ছিল এক দীর্ঘ, দমবন্ধ করা অধ্যায়। রাষ্ট্র তখন আর কেবল শাসনযন্ত্র ছিল না, হয়ে উঠেছিল ভয় উৎপাদনের এক সুসংগঠিত কাঠামো। গুম, খুন, বিচারবহিভর্‚ত হত্যা, ভোটচুরি, ব্যাংক লুট, দুর্নীতি- এসব আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; ছিল একটি ধারাবাহিক শাসনদর্শনের অংশ। নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সেখানে নাগরিকত্বের নয়, সন্দেহের। ইনসাফ শব্দটি তখন কেবল ধর্মীয় বক্তৃতায় টিকে ছিল, রাষ্ট্রীয় নথিতে নয়। এই দীর্ঘ ক্লান্তি, ক্ষোভ ও অপমানের জমাট স্তর ভেঙেই ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেছিল- নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে, ন্যায় ও জবাবদিহির আকাঙ্ক্ষায়।

অভ্যুত্থানের পর খুব দ্রুতই একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে এসে দাঁড়ায়। যেসব প্রচলিত, বড়, রাজনৈতিক দল নিজেদের বিকল্প হিসেবে হাজির করল, তারা আদতে পুরনো রাজনীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া কিছুই নয়। ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও ক্ষমতার চরিত্র বদলায়নি। চাঁদাবাজি নতুন ব্যানারে ফিরল, টেন্ডারবাজি পেল নতুন রক্ষাকবচ, হত্যা ও রাহাজানি আবারো রাজনীতির অপ্রকাশ্য ভাষা হয়ে উঠল। যাদের একসময় আওয়ামী লীগ টোকাই-মাস্তান হিসেবে ব্যবহার করত, তারা কেবল দল বদলাল- নৈতিকতা বদলাল না। রাজনীতি আবারো নেমে এলো পেশিশক্তির দখলে, আদর্শের নয়।

এই নৈতিক শূন্যতা ঢাকতেই শুরু হলো পুরনো রাজনৈতিক বয়ানের পুনরুজ্জীবন। কারণ জাতির সামনে দেয়ার মতো কোনো নতুন রাষ্ট্রকল্প নেই, কোনো নৈতিক রূপরেখা নেই, কোনো ভবিষ্যৎ-ভাষা নেই। ফলে ইতিহাসের পুরনো ভূতকে ডেকে আনা হলো নতুন মুখোশে। শুরু হলো সেই চেনা ট্যাগিং-ফ্রেমিং রাজনীতি। যেখানে প্রাকটিসিং মুসলিমদের ধরে প্রথমে ‘উগ্র’, পরে ‘জঙ্গি’, শেষে ‘রগকাটা’ বানানো হতো, যেখানে শুধু নামাজের অপরাধে ধরে হত্যা করা হতো, সেখানে গুপ্ত-সুপ্ত বলে মজলুমের ওপর নতুন করে জুলুম চালানো হলো- এ এক বিকৃত দলীয় যুক্তি, যা আগেও দেখেছি।

সংবিধান, যাকে গত বছরগুলোতে সুবিধামতো কাটাছেঁড়া করা হয়েছে, তাকেই আবার কথায় কথায় উদ্ধৃত করা শুরু হলো। সংবিধান এখানে নৈতিক দলিল নয়; বরং রাজনৈতিক অস্ত্র। প্রয়োজনে তাকে সামনে আনা হয়, প্রয়োজনে অদৃশ্য করে দেয়া হয়। এই দ্বিচারিতা নতুন নয়; কিন্তু অভ্যুত্থানের পর তা আরো বেদনাদায়ক, কারণ মানুষ আশা করেছিল- অন্তত ভাষা বদলাবে।

একই সাথে প্রতিবেশী বড় দেশের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে পুরনো নতজানু বয়ান নতুন করে হাজির হলো। ‘সম্পর্ক রাখা উচিত’-এই আপাত নিরীহ বাক্যের আড়ালে ঢুকে পড়ল আধিপত্যবাদী বাস্তবতার বন্দনা। সার্বভৌমত্বকে ব্যাখ্যা করা হলো কৌশলগত নীরবতা হিসেবে, আত্মসম্মানকে বলা হলো অবাস্তব আবেগ। ভারতপ্রীতির এই রাজনীতি নতুন নয়; নতুন হলো একে আবারো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মোড়কে প্যাকেটজাত করার চেষ্টা।

এই জায়গায় এসে একাত্তরের চেতনা, রাজাকার তকমা, মুজিববন্দনা- সব কিছুই আবার রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠল। ইতিহাস ব্যাখ্যার বিষয় নয়, ব্যবহার্য পণ্যে পরিণত হলো। যারা প্রশ্ন করে, তারা সন্দেহভাজন; যারা ভিন্ন বয়ান দেয়, তারা শত্রু। ইনক্লুসিভ ডেমোক্র্যাটিক বাংলাদেশের কথা বলে মূলত পুরনো আওয়ামী কাঠামোকেই ফিরিয়ে আনার এক সূক্ষ্ম প্রয়াস শুরু হলো। যেন সমস্যা ব্যক্তি, কাঠামো নয়; যেন দমননীতি ছিল বিচ্যুতি, দর্শন নয়। এই বয়ান আসলে জনগণের স্মৃতির সাথে প্রতারণা। এ দিকে আরেকটি বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রচলিত বড় রাজনৈতিক দলগুলো দক্ষিণপন্থার উত্থান নিয়ে প্রবল উদ্বেগ দেখালেও বাম-রামদের আস্ফালনে তারা প্রায় নির্লিপ্ত। ইসলামবিদ্বেষ, ওয়াজ মাহফিলে বাধা, মসজিদে ইসলামপন্থীদের ও নারীদের ওপর হামলা- ক্ষমতায় আসার আগেই দেখল জনগণ। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের তকমা খুব সহজে সাঁটানো হয়, এটিই সর্বশেষ ও অন্যতম প্রধান অস্ত্র।

নির্বাচনী রাজনীতিতে ধর্ম যখন বিশ্বাসের আশ্রয় না হয়ে ভোটের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র তার নৈতিক মেরুদণ্ড হারাতে বসে। টুপি, মসজিদের মিম্বর, মাজারের আঙিনা কিংবা ধর্মীয় আবেগ- সবই যেন ব্যালট বাক্সের নীরব সাক্ষী বানানো হয়। ঈমানের ভাষা এখানে আর আত্মশুদ্ধির আহ্বান থাকে না; তা রূপ নেয় স্লোগানে, বিভাজনে, আর সন্দেহের বীজ বপনে। প্রতিপক্ষকে ‘অধর্মী’ তকমা দেয়া সহজ হয়; কিন্তু ন্যায়নীতি, সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নগুলো চাপা পড়ে।

সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারণায় চোখ রাখলে যে চিত্র ভেসে ওঠে, তা নতুন কোনো ভোরের ইশারা নয়; বরং বহু ব্যবহৃত, বস্তাপচা পুরনো ভাষ্যের পুনরাবৃত্তি। ভাবনার কাঠামো আগের মতোই জীর্ণ। অতীতের ক্ষত আর অভিযোগের তালিকা টেনে এনে বর্তমানকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলে, অথচ ভবিষ্যতের জন্য স্পষ্ট কোনো নকশা অনুপস্থিত। তরুণ সমাজ যখন কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মর্যাদার রাজনীতি খোঁজে, তখন প্রচারণার মঞ্চে শোনা যায় সেই চেনা প্রতিধ্বনি- ক্ষমতা হারানোর হাহাকার, প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষা-বিদ্রুপ, মিথ্যে অভিযোগ, অপপ্রচার আর পুরনো অর্জনের গৌরবগাথা। নতুনত্বের অভাব এখানে কেবল কৌশলগত দুর্বলতা নয়; এটি রাজনৈতিক কল্পনার দারিদ্র্যও বটে। জনতার দৃষ্টিতে প্রশ্নটা তাই তীক্ষè হয় : যে দল পরিবর্তনের দাবি তোলে, সে নিজে কতটা বদলাতে পেরেছে? ভোটার আজ আর আবেগের ভারে সিদ্ধান্ত নেয় না; সে খোঁজে সময়োপযোগী ভাষা ও বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা। সেই পরীক্ষায় পুরনো বস্তা কাঁধে নিয়ে নতুন পথচলা কঠিনই থেকে যায়।

সাধারণ মানুষ গত ৫৪ বছরে সব শাসন দেখেছে। তারা খুব ভালোভাবেই জানে, মুখ বদলায়, স্লোগান বদলায়; কিন্তু চরিত্রগত পার্থক্য খুব বেশি নয়। তাই আজ তারা প্রচলিত আদর্শহীন রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে মুক্তির নিশানা খুঁজছে। এই অনুসন্ধান তাদের দৃষ্টি ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর দিকে টেনেছে- কারণ সেখানে নৈতিকতার ভাষা আছে, ইনসাফের দাবি আছে। কিন্তু সঠিক গাইডলাইন, সময়োপযোগী রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বই এখন বড় প্রশ্ন।

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় সঙ্কট ক্ষমতার নয়, ন্যায়-শৃঙ্খলা-ঐক্যের। পুরনো বয়ান নতুন করে চাপিয়ে দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়া যায় না। রাজনীতি মানে কেবল রাজপথ দখল নয়, সঠিক বয়ান তৈরি করা। এ বয়ানই ঐক্য গড়ে, এই বয়ানই রাজপথের শক্তি হয়ে ওঠে, এই বয়ানই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় পৌঁছে দেয়। কিন্তু সেই বয়ান যদি মিথ্যার ওপর দাঁড়ায়, যদি অপবাদের ওপর নির্মিত হয়, যদি বিভাজনের ইন্ধন জোগায়- তাহলে সে ক্ষমতা আবারো ন্যায়ের বিপরীতে দাঁড়াবে।

সময় এসেছে পুরনো বয়ান পরিত্যাগ করার। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত আদর্শিক রাজনীতিতে ফিরে আসা, বাংলাদেশপন্থী হওয়া, হিংসা ও আক্রমণ থেকে দূরে থাকা, রাজনীতি করতে গিয়ে মিথ্যা অপবাদ ও ট্যাগিং রাজনীতি বর্জন করা। কারণ মিথ্যে বয়ান শেষ পর্যন্ত জাতিকে বিভক্ত করে, রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। নতুন বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন সত্যভিত্তিক, ন্যায়নিষ্ঠ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ভাষা- যে ভাষা মানুষকে ভয় দেখায় না; বরং দায়িত্বশীল নাগরিক করে তোলে। নতুন বাংলাদেশ কোনো মুখোশ চায় না। সে চায় বাস্তব স্বচ্ছ সত্তা, ইনসাফ।

লেখক : মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক

[email protected]