ভারতের ‘বিশ্বগুরু’র দাবি ও বাস্তবতা

সুতরাং আয়নার দিকে তাকানোর ফল বিশ্ব দেখতে পাচ্ছে। ভারত শক্তিশালী দেশ হতেই পারে। কিন্তু কর্ম ছাড়া সম্ভাবনার কোনো মূল্য নেই। নিজেকে মহান হিসেবে প্রচার করলেই কোনো দেশ শিখরে পৌঁছতে পারে না।

বাংলাদেশকে সব দিক ঘিরে থাকা ভারত বিশাল দেশ। আয়তনে বিশ্বের সপ্তম। জনবলে প্রথম। এর অর্থনীতি যেমন বড়, পেশিও তেমনি দশাসই। নিজেকে বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ বলে প্রচার করে দেশটি। দেশটি প্রাচীন সংস্কৃতির লালনভূমিও বটে। একদার পুরোহিত ও পণ্ডিতরা অন্যতম প্রাচীন কাব্য, গণিত, অর্থ ও নীতিশাস্ত্র, এমনকি সৌন্দর্যতত্তে¡রও ঐতিহ্য তৈরি করেছিলেন। দেশটি এখন বিশ্বে নিজের একটি নতুন ইমেজ গড়তে সচেষ্ট। গায়ে ‘বিশ্বগুরু’র ছাপ মারা উত্তরীয় জড়িয়ে নিজেকে পরাশক্তি বলে দাবি করছে।

পরাশক্তি হতে যে যোগ্যতা লাগে এর অন্তত দু’টি : বৃহৎ আয়তন এবং জনসংখ্যা প্রকৃতি-প্রদত্ত। এর বাইরে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব জরুরি। বিজ্ঞানে কিঞ্চিৎ সাফল্যের নমুনাও দেখিয়েছে ভারত। পরমাণুর দানোকে বোতলবন্দী করেছে। সম্প্রতি চাঁদের উল্টো পিঠে নভোযান পাঠিয়েছে। আর বিশ্বের চতুর্থ বৃহৎ সামরিক বাহিনী গড়েছে। গণমাধ্যম শিরোনাম করছে- ভারত এখন বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি। এসব দাবির কতটা সত্য আর কতটা প্রচারণা?

এ প্রশ্ন আমরা তুলিনি, তুলছেন ভূ-রাজনীতির কৌতূহলী পর্যবেক্ষক, গবেষক, বিশ্লেষক ও বিজ্ঞজন। প্রশ্ন তোলার কারণটি আমরা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর অনুসরণে দেখতে চাই।

আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো- এ প্রশ্ন ওঠার পেছনে মূল ভূমিকা ভারতের অতি উৎসাহী মিডিয়ার। তাদের নিরন্তর অসত্য, বানোয়াট, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বেপরোয়া প্রচারণার। না, শুধু বেনামা, বেওয়ারিশ সংবাদমাধ্যম নয়, খোদ মূল ধারার গণমাধ্যমও দিনের পর দিন একই কাজ করেছে। এ মিথ্যাচার বিশ্বের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে গত মে মাসে তিন দিনের পাক-ভারত সঙ্ঘাতের সময়। এ সময় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে গিয়ে দেশটির মিডিয়া হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে এমন সব আজগুবি সাফল্যগাথা জোশের সাথে প্রচার করে, যা রোমাঞ্চ গল্পকেও হার মানায়। এ সময় গোটা বিশ্বের নজর ছিল দুই দেশের ওপর। ভারতীয় মিডিয়ার খবর কতটা বানোয়াট ও অসত্য তা দেখেছে বিশ্ব। এক্ষেত্রে ইন্টারনেটে ফ্যাক্ট চেক টুলসের অনুসন্ধানকে বাহবা দিতে হয়।

ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের গালগল্প ফাঁদে ভারতীয় মিডিয়া। ভারতে মুসলিম নারীকে গণধর্ষণের পুরনো ছবি দেখিয়ে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের ছবি বলে চালানো হয়। সেটি উঠে আসে বিবিসির মতো বৈশ্বিক গণমাধ্যমে। এতে সবাই সতর্ক হয়। এখন ভারতীয় মিডিয়া ও সরকারের যেকোনো খবর খতিয়ে দেখছে বিশ্ববাসী। এতে ভারতের প্রতি বিশ্বের সমীহার দৃষ্টি উবে যেতে শুরু করেছে। এজন্য এখন প্রশ্ন উঠছে ভারতের পরাশক্তি হওয়ার দাবি নিয়েও। দাবি ও বাস্তবতার কিছু নমুনা আমরা তুলে ধরছি পাঠকের জন্য। গোটাটাই বিদেশি বিশ্লেষকদের নজরে দেখা। ভারতের ঘটনাবলির ওপর চোখ রাখা বাংলাদেশের জন্য জরুরি।

ফোর্বসের একটি তালিকা

চলতি বছরের শুরুর দিকে, বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ১০টি দেশের তালিকা প্রকাশ করে। তালিকার শীর্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ফ্রান্স, জাপান ও সৌদি আরব। অর্থাৎ প্রথম দশে ভারত নেই। ভারত ছিল স্পটলাইটের বাইরে ১২ নম্বরে। ঘটনার মোচড় এখানে। ভারত যে নিজেকে একটি উদীয়মান বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে দাবি করছে; তার কী হবে! ভারতীয় রাজনীতিকরা তাদের দেশকে ‘বিশ্বগুরু’ বলে প্রচার করছেন। ভারতের সংবাদ চ্যানেলগুলো সাড়ম্বরে তা সম্প্রচার করে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতে প্রায় উপেক্ষিত দেশ কানাডা নীরবে উঠে এসেছে ১১তম স্থানে।

শীর্ষ দশের মধ্যে স্থান না পাওয়ার এই একটি ঘটনার জেরে ভারতসম্পর্কিত আরো গভীর সত্য বেরিয়ে আসে। সেটি হলো, ভারত নিজেকে কিভাবে দেখে আর বাকি বিশ্ব তাকে কিভাবে দেখে, এ দুয়ের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান। ফোর্বসের তালিকা একটি আয়না এবং এতে ভারতের যে চিত্র ধরা পড়েছে তা মোটেও দিল্লির জন্য সুখকর নয়।

বেশ কয়েক বছর ধরে, ভারত নিজের উন্নতির প্রমাণ হিসেবে গর্বের সাথে একটি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে। সেটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির। দেখা যাচ্ছে, ভারতের জিডিপি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ অ্যারন কুমার স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, ভারতের জিডিপি ৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেখানো হয়ে থাকতে পারে।

কেন অ্যারন এ কথা বলছেন? কারণ, নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় এসে জিডিপি গণনার পদ্ধতি পাল্টে দিয়েছে। একবার নয়, দু’-দুবার। নতুন সূত্রগুলো প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখায়। সমস্যা হলো, হিসাবের পদ্ধতি পাল্টালেও বাস্তবতা বদলে যায় না। প্রকৃতপক্ষে, বেকারত্বের হার বেড়েছে। অবকাঠামোগত ঘাটতি এখনো বিশাল। দেশজ উৎপাদন ভারতের অর্থনীতির মাত্র ১৫ শতাংশের কম। এটি আরো কমছে। এমনকি মুডিসের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তথ্য কারসাজি এবং সুশাসন বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ভারতের ঋণের দৃষ্টিভঙ্গি (ক্রেডিট আউটলুক) কমিয়ে দিয়েছে। সিএনএন ও নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ভারতের সামরিক সক্ষমতার দাবি এবং অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ভারত এখনো ব্যাপকভাবে কৃষি ও নিম্নস্তরের পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল, যা প্রকৃত শিল্পশক্তির উৎপাদনশীলতার মাত্রার প্রতিফলন নয়। দেশটি এমন এক কোম্পানির মতো যা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নথিপত্রে হিসাব বাড়িয়ে দেখায়। কিন্তু তার কারখানাগুলো অর্ধেক খালি এবং অনেক শ্রমিক বেতন পাচ্ছে না। সুতরাং, ভারতের জিডিপির রেখচিত্র চিত্তাকর্ষক দেখানো হলেও এর ভিত্তি নড়বড়ে। দুর্বল ভিত চাপে ধসে পড়ে।

চতুর্থ বৃহৎ সামরিক শক্তি

ভারত প্রায়ই নিজেকে শীর্ষ স্তরের সামরিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সশস্ত্র বাহিনী এবং রাফালের মতো অত্যাধুনিক জেট নিয়ে গর্ব করে। কিন্তু যখন বাস্তব যুদ্ধের কথা আসে, তখন গল্পটি নাটকীয়ভাবে ঘুরে যায়। ২০১৯ সালে পাকিস্তানে ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের কথা মনে করুন। ভারতীয় পাইলট অভিজিত বর্তমানকে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছিল। তার পাকিস্তানি চায়ের স্বাদের প্রশংসা করার ভিডিও বিখ্যাত হয়ে আছে। এ নিয়ে হাসাহাসি কম হয়নি। কিন্তু রসিকতার আড়ালে লুকিয়েছিল নিষ্করুণ সত্য। তা হলো, ভারতীয় বিমান প্রতিপক্ষের গুলিতে পর্যুদস্ত হয়। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভারতীয় ও চীনা সেনারা হাতাহাতিতে লিপ্ত হলে ভারতীয় বাহিনীর কয়েক ডজন সেনা নিহত এবং আটক হয়। ভারতীয় সেনাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা, আতঙ্ক ও পশ্চাদপসরণের কথা বিশ্ব জেনেছে, কিন্তু সমন্বিত প্রতিরোধের কোনো খবর আসেনি। সীমান্তের বড় অংশ চীন দখল করে নিলেও ভারত কিছু করতে পারেনি। চলতি বছর পাকিস্তানের সাথে বিমানযুদ্ধে ভারত রাফাল, স্যু-৩০ এবং মিগ-২৯-এর মতো উন্নত বিমান হারিয়েছে, প্রতিপক্ষের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। এসব ঘটনা দেশটির সামরিক সক্ষমতার দাবি এবং প্রকৃত কর্মক্ষমতার মধ্যে একটি বিরাট ফারাক ফাঁস করে দেয়। এ মুহূর্তে এটি স্পষ্ট, প্রতিদ্ব›দ্বীদের তুলনায় ভারতের সক্ষমতা কম।

বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য

একসময় ভারতকে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সম্ভাব্য ভিত্তি বলে মনে করা হতো। সেই ভারত এখন শুধু সমালোচনা নয়, তার চেয়েও বাজে কিছুর সম্মুখীন। সেটি হলো- উপেক্ষা। মাত্র কয়েক বছর আগে, চীনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ভারতকে কোয়াড জোটে নিয়েছিল। কিন্তু সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক- সব দিক থেকে দুর্বল পারফরম্যান্স দেখিয়েছে ভারত। ফলে সে উৎসাহে দ্রুত ভাটা পড়েছে। ফল হলো, প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে সামনের সারিতে বসা মোদিকে উপেক্ষা করে পেছনে বসা কোনো নেতার সাথে হাত মেলান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ। ট্রাম্প ভারতীয় অভিবাসীদের কোমরে দড়ি বেঁধে কার্গো বিমানে দেশে ফিরিয়ে দেন। আর ফোর্বসের তালিকায় ভারতের উপরে অবস্থান নেয় কানাডা। এটিই বাস্তবতা। কানাডার জনসংখ্যা কম কিন্তু তার অর্থনীতি স্থিতিশীল; আছে উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদন ভিত্তি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও নির্ভরযোগ্য জোট। বিপরীতে ভারতকে দেখা হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চিত (আনপ্রেডিকটেবল) ও ধীরগতির দেশ হিসেবে।

বিশ্বের চোখ খুলেছে

আশাবাদ আর ভিত্তিহীন দাবি দিয়ে বিশ্বের স্বীকৃতি পাওয়া যায় না। এ জন্য লাগে বিশ্বাসযোগ্যতা ও বাস্তব ফল। এ মুহূর্তে ভারত নিয়ে বিশ্বের প্রত্যাশা নীরবে হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। কারণ, ভারতের কথা আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান দেখতে পাচ্ছে বিশ্ব।

ভারত যখন নিজেকে পরাশক্তি বলে জাহির করছে, অন্য দেশগুলো তখন নীরবে বাস্তব পদক্ষেপ নিচ্ছে। যেমন, মেক্সিকো ও ব্রাজিল। এরা বিশ্বের পরবর্তী কারখানা হয়ে ওঠার বিষয়ে নাটকীয় ঘোষণা দেয় না, কিন্তু নীরবে শিল্প উৎপাদন বাড়াচ্ছে, রফতানি বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে। মেক্সিকো উপকৃত হচ্ছে চীন থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সাপ্লাই চেন সরিয়ে নেয়া থেকে, যা ভারত পাবে বলে দীর্ঘদিন ধরে আশা করছিল। কিন্তু সুযোগ নিতে পারেনি। আসিয়ান ব্লকও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করছে। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ পরাশক্তির মর্যাদা দাবি না করে সামনের কাতারে চলে আসছে। ভারতের তুলনায় অতিক্ষুদ্র দেশ ভিয়েতনামের উৎপাদন, রফতানি বৈশ্বিক পর্যায়ে জোর প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছে। ইন্দোনেশিয়া ইলেকট্র্রিক ভেহিকেলের (ঊঠ) ব্যাটারি ইকোসিস্টেম তৈরি করছে।

এগুলো গলা ফাটানো স্লোগান নয় কিন্তু বাস্তব কৌশল, যার অগ্রগতি পরিমাপ করা যায়। বিশ্ব এটি দেখতে পায় তাদের পরিসংখ্যান, অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মধ্যে। বার্তাটি স্পষ্ট। যারা বেশি শোরগোল করে তারা প্রতিযোগিতায় জয়ী হয় না। যারা দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, কঠোরভাবে গড়ার কাজ করে, তারা বিজয়ী হয়।

বিশ্বনেতা হওয়ার স্বপ্ন

ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে পরবর্তী চীন, বৃহৎ উৎপাদনকারী, প্রযুক্তিগত শক্তিধর দেশ এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু অস্বস্তিকর সত্য এই যে, স্বপ্ন এখনো বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।

আমেরিকার সাথে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি রফতানি নিয়ে যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভারতকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আমদানির ওপর নির্ভরতা বেদনাদায়কভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং এখন চীনের সাথে ভারতের ১০০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, যা কেবল একটি সংখ্যা নয়। এটি নির্ভরতার প্রতীক। এমনকি ইলেকট্রনিক্স, টেলিকম ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো মূল কৌশলগত ক্ষেত্রগুলোতেও ভারতের পরনির্ভরশীলতা গভীর।

মেক ইন ইন্ডিয়া এবং ডিজিটাল ইন্ডিয়া সম্পর্কে বিশাল ঘোষণা সত্তে¡ও, দেশটি এখনো স্মার্টফোন, সেমিকন্ডাক্টর, এমনকি সামরিক বিমানের উপাদান আমদানি করে।

বিশ্বনেতা হওয়ার স্বপ্ন অনেক দেশ দেখছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এমন সব দেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে যারা শুধু কাজটা করে। ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান পরিষ্কার। তার প্রযুক্তিগত আখ্যান শুনতে বলিষ্ঠ, কিন্তু গভীরতর গবেষণা ও উন্নয়ন, দক্ষ শ্রমের জোগান, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং দক্ষ শাসনব্যবস্থা না থাকলে, এ আখ্যান রূপকথার গল্পমাত্র, বাস্তবতা নয়।

গত দশক ধরে, ভারতীয় রাজনীতি জাতীয় উন্নয়নকে ব্র্যান্ডিং করছে। মেক ইন ইন্ডিয়া, ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং বিশ্বগুরুর মতো স্লোগান ব্যানারে মুদ্রিত হয়, সমাবেশে চিৎকার করা হয় এবং বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারিত হয়। কিন্তু পর্দার বাইরে তাকালে বেশিটাই শূন্য। ইঞ্জিন ছাড়া ফাইটার জেটের প্রোটোটাইপ, হিসাবপদ্ধতি পাল্টানোর সূত্রে স্ফীত জিডিপি পরিসংখ্যান, টিভি শিরোনামে সামরিক বিজয় ফাঁপিয়ে দেখানো- এগুলো সব গৎবাঁধা দৃশ্যকল্প। ফাইটার জেট প্রকল্পের কথা ধরুন। ভারত এক এয়ার শোতে একটি পূর্ণাঙ্গ আকারের মডেল তৈরি করেছিল। মিডিয়া এটিকে পঞ্চম প্রজন্মের অগ্রগতির উল্লম্ফন হিসেবে তারিফ করে। কিন্তু খবর নিয়ে দেখুন, এটি ওড়ে না। এর ইঞ্জিনও ভারত তৈরি করতে পারেনি। অর্থাৎ ইঞ্জিন ছাড়া ফেরারি তৈরি করে বলা হচ্ছে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছি। পাকিস্তানের জেট ফাইটার কিন্তু বিদেশে রফতানি হচ্ছে।

শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে শক্তিশালী দেখানোর এ আকাঙ্ক্ষার কুফল আছে। এটি একটি বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়ার ফাঁস তৈরি করে। অহঙ্কারের রাজনীতি কেবল অগ্রগতি বিলম্বিত করে না, দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করে।

সুতরাং আয়নার দিকে তাকানোর ফল বিশ্ব দেখতে পাচ্ছে। ভারত শক্তিশালী দেশ হতেই পারে। কিন্তু কর্ম ছাড়া সম্ভাবনার কোনো মূল্য নেই। নিজেকে মহান হিসেবে প্রচার করলেই কোনো দেশ শিখরে পৌঁছতে পারে না।