দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি : উত্তরণের উপায়

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজার মনিটরিং জোরদার, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং টেকসই সরবরাহ চেইন তৈরি না করলে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ কঠিন। এ ছাড়া সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতি বছর যে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। আরো বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ বাড়ানো। অর্থনীতির কৌশলী ব্যবস্থাপনা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা জ্বালানির বর্ধিত দাম, আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের ওপর চাপ, রফতানি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী থাকা এসবই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা দুর্বল করবে। সরকারকে এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করতে হবে

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক দাম জনজীবন অসহনীয় করে তুলেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমদানি-নির্ভরতা, জ্বালানি সঙ্কট, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতিও এ জন্য অনেকাংশে দায়ী। অর্থমন্ত্রী নিজেও জাতীয় সংসদে অর্থনীতির বেহাল ও শোচনীয় অবস্থা কথা স্বীকার করেছেন। এ পরিস্থিতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, যা অর্থনীতিতে স্থবিরতা ও গভীর সঙ্কট তৈরি করেছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনীতির বেহাল দশা : দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের সাধারণ মানুষ বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ বেশি কষ্টে আছে। বাধ্য হয়ে তারা বিভিন্ন খাতে খরচ কমিয়ে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। তাদের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হচ্ছে। তেলের দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তার ওপর চাপ আরো বেড়ে যাবে।

এ দিকে দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই মন্দায় আক্রান্ত। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এ মন্দা আরো প্রকট হয়েছে। এতে এক দিকে ভোক্তার আয় কমেছে, অন্য দিকে যুদ্ধের প্রভাবে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দামে প্রভাব পড়ছে। এতে কঠিন চাপের মুখে পড়েছে ভোক্তা। আগামীতে এ সঙ্কট কোন দিকে মোড় নেবে তা নির্ভর করছে যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর।

বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্নে। নতুন কর্মসংস্থান যেমন হচ্ছে না, তেমনি বিদ্যমান কর্মও ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আয় কমার পাশাপাশি বেকারত্ব বাড়ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আরো নিম্নমুখী করে তুলছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন একটি পত্রিকাকে বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বাড়ছে। সেই ব্যয় বৃদ্ধিতে সমস্যা হতো না, যদি একই হারে আয় বাড়ত। কিন্তু তা না হওয়ায় মানুষ এখন সঞ্চয় ভেঙে অথবা ঋণ করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের কোনো সঞ্চয় নেই। তাদেরকে কেউ ধারও দেয় না। এ অবস্থায় তাদের অবস্থা শোচনীয়।

আন্তর্জাতিক বাজার ও জ্বালানি সঙ্কট : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশীয় বাজারে।

সরবরাহ চেন ও অলিগোপলি : অসাধু সিন্ডিকেট ও দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কারণে বাজারে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস : মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে, ফলে চাহিদার তুলনায় জোগান কম হচ্ছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। অর্থাৎ, মানুষের আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় বেড়েছে বেশি। এর ফলে প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা সঙ্কুচিত করছে। চাহিদা কমলে উৎপাদন কমে, বিনিয়োগ কমে- অর্থনীতি একধরনের স্থবিরতার দিকে এগোয়। ইতোমধ্যে সেই লক্ষণ স্পষ্ট। অন্য দিকে সরকার একধরনের নীতিগত উভয়সঙ্কটে পড়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়াতে হয়; কিন্তু এতে বিনিয়োগ কমে যায়, বাড়ে বেকারত্ব। আবার কর্মসংস্থান বাড়াতে চাইলে অর্থ সরবরাহ বাড়াতে হয়, যা মূল্যস্ফীতি আরো বাড়িয়ে দেয়। এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই সরকারকে ভারসাম্য খুঁজে নিতে হবে। কোনো একটি লক্ষ্যকে এককভাবে অগ্রাধিকার দিলে সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি : জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধিতে পণ্যের দাম চড়া। আগে যেখানে পরিবহন খরচ ২৫০ টাকা লাগত এখন সেখানে ৪০০ টাকা বেশি লাগে। জ্বালানি সমস্যার কারণে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও কমে গেছে। কৃষি সরঞ্জামসহসহ সার-কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য উৎপাদন খরচও বেড়েছে। মধ্যস্বত্ব¡ভোগী ও কালোবাজারির কারণে কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে, বেকারত্ব দূর হবে, বাজারে পণ্য সরবরাহ বাড়বে। মূল্যস্ফীতি কমবে। এ জন্য সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি ন্যায়সঙ্গত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস : অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, প্রোটিনসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার কেনা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। বাড়তি খরচের চাপে আটকে গেছে মানুষের জীবন। চাপ সামলাতেই হিমশিম নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। হাসপাতালের বিল, স্কুল-কলেজের ফি, এমনকি যাতায়াত, বাসাভাড়াও; কিন্তু সেই তুলনায় মানুষের আয় বাড়ছে না।

খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি : দ্রব্যমূল্যের এই বৃদ্ধিতে ৬০ শতাংশ পরিবার তাদের আয়ের ৭৫ শতাংশের বেশি খাদ্যের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে। পরিবারের সদস্যদের চাহিদা পূরণ দূরের কথা, নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করাই হয়ে উঠছে কঠিন। শুধু খাবার নয়, চিকিৎসা আর শিক্ষার খরচও বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরো বেড়েছে।

সামাজিক চাপ : বাজার স্থিতিশীল না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও মানসিক চাপ বিরাজ করছে। রান্নার গ্যাসের বাজারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে। এপ্রিল মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে এক হাজার ৭২৮ টাকায় নির্ধারিত হয়েছে। তবে বাস্তবে বাজারে এই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকার নিচে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে না।

অর্থনীতির এই গভীর সঙ্কটকালে সরকারকে কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত সেটি ঠিক করতে হবে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত, নাকি জ্বালানি। স্বৈরাচারী শাসনামলের শেষ তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি টানা কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগও কমেছে। ফলে অর্থনীতিতে স্থবিরতা তখন থেকেই দেখা দিয়েছিল।

এ দিকে দেশের আর্থিক খাতও সঙ্কটে। কয়েকটি ব্যাংক চালু রাখতে সরকারকে তারল্যসহায়তা দিতে হচ্ছে। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়েছে। ফলে এখন সরকার চাইলেও অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারছে না।

প্রবাসী আয় বাড়ায় বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমলেও রফতানি আরো দুর্বল হয়েছে। এর মধ্যে আবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রফতানি দুর্বল হতে পারে, প্রবাসী আয় কমতে পারে, আর তাতে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে বাজার মনিটরিং জোরদার, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং টেকসই সরবরাহ চেইন তৈরি না করলে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণ কঠিন। এ ছাড়া সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতি বছর যে লাখ লাখ মানুষ নতুন করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন, তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। আরো বড় চ্যালেঞ্জ বিনিয়োগ বাড়ানো। অর্থনীতির কৌশলী ব্যবস্থাপনা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, জ্বালানির বর্ধিত দাম, আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বিনিময় হারের ওপর চাপ, রফতানি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী থাকা এসবই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা দুর্বল করবে। সরকারকে এ জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করতে হবে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার

[email protected]