দ্বৈত নাগরিকত্বের নির্বাচনী বৈতরণী আইন ও নৈতিকতার দ্বন্দ্ব

যারা সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে চান, তাদের অবশ্যই আইনের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। দ্বৈত নাগরিকদের নিজেদের মনোনয়নপত্রে পূর্ণাঙ্গ ও সত্য তথ্য প্রকাশ করা আবশ্যক; তাদের বর্তমান বা অতীত নাগরিকত্ব সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে স্বীকারোক্তি দিতে হবে। একই সাথে তাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা আইন অনুযায়ী সেই নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য ‘সরল বিশ্বাসে’ যাবতীয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এটি কোনো অতিরিক্ত বা অন্যায্য দাবি নয়। যারা দেশ শাসনের অধিকার চান, তাদের কাছ থেকে নাগরিকরা ন্যূনতম যে সততা ও স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করেন, এটি তার প্রতিফলন

এহসান এ সিদ্দিক
এহসান এ সিদ্দিক |নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হবে কি না এ প্রশ্ন সামনে রেখে গত দুই সপ্তাহ ধরে নির্বাচন কমিশন এবং হাইকোর্ট বিভাগে একটি আইনি বিতর্ক চলমান রয়েছে। আলোচনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত হয়নি। এটি গত ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ শাসনামলের রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনিবার্য পরিণতি। সেই সময়ে বিরোধী দলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতাকর্মী এমন সব পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, যেখানে দেশত্যাগ করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। ওই সময়কালে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তাদের মধ্যে কেউ চিরতরে হারিয়ে গেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আর কখনো তাদের দেখা মেলেনি। অন্যদের ওপর চালানো হয়েছিল আরো সূক্ষ্ম ও ঘড়যন্ত্রমূলক দমন-পীড়ন। বিরোধী রাজনীতিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপরও নেমে এসেছিল আর্থিক চাপ, ভীতি প্রদর্শন এবং কর্মচ্যুতি। বিশেষ করে যারা ব্যবসায় বা পেশাজীবী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা ছিলেন সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায়।

বিষয়টির একটি প্রকট উদাহরণ ছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে গ্রামীণফোনে কর্মরত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের পুত্রের চাকরিচ্যুতি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও করপোরেট আনুগত্যের যুগল প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের জীবনকে কিভাবে দুর্বিষহ করে তুলেছিল; এ ঘটনা তার একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত। এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতির মুখে অনেক রাজনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিল না। প্রবাসে অবস্থানকালে তাদের অনেকে সংশ্লিষ্ট দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, এই রাজনীতিকদের একটি বড় অংশ বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। একই সাথে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করছেন। স্বৈরতন্ত্র-পরবর্তী এ বাস্তবতায় তাদের ফিরে আসা রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়বদ্ধতা, আনুগত্য এবং রাজনৈতিক অধিকারের সীমানা নিয়ে এক কঠিন আইনি ও নৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সব প্রবাসী রাজনীতিককে নিপীড়নের শিকার হিসেবে গণ্য করা হবে সত্যের অপলাপ বা একধরনের অসততা। তাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা বিপুল অর্থ পাচার করে দেশ ছেড়েছিলেন; বিদেশে পাচারকৃত সেই অর্থে গড়ে তুলেছেন আলিশান বাড়ি এবং দুর্নীতির টাকায় প্রবাসে উপভোগ করেছেন বিলাসী জীবন। আইন এই মৌলিক পার্থক্যটি উপেক্ষা করতে পারে না। করা উচিতও নয়। এমন এক বৈচিত্র্যময় প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে নিবন্ধটি পর্যালোচনার চেষ্টা করছে যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী কাঠামোতে দ্বৈত নাগরিকদের আদৌ কোনো রাজনৈতিক অধিকার অবশিষ্ট আছে কি না।

এ বিষয়ে সাংবিধানিক অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কোনো ব্যক্তি জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য নন, যদি না তিনি সংশ্লিষ্ট বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের প্রেক্ষাপটে এ বিধিনিষেধ মোটেও অযৌক্তিক নয়। যারা দেশ শাসনের গুরুভার গ্রহণ করতে চান, রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আইনি আনুগত্য হতে হবে অবিভাজ্য ও প্রশ্নাতীত। তা ছাড়া দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেয়া হলে তা ঠিক সেই ধরনের আচরণকে উৎসাহিত করবে, যা ইতোমধ্যে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, বহু রাজনীতিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে সুরক্ষা হিসেবে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ বিদেশে স্থানান্তর করেছেন। ঠিক এ কারণে ‘সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন’ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের প্রস্তাব দিলেও সংসদ সদস্যদের দ্বৈত নাগরিকত্ব বর্জনের নিয়মে কোনো শিথিলতা আনার সুপারিশ করেনি।

২০২৬ সালে দ্বৈত নাগরিকদের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর আরোপিত সাংবিধানিক বিধিনিষেধের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন একটি উদার ও গতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, একজন দ্বৈত নাগরিক নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন যদি তিনি বিদেশী নাগরিকত্ব বর্জন করেন, যাকে সংবিধানে ‘বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে’ শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। কমিশন বিধানটি এভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে, এ শর্তের পরিপালন মূলত ব্যক্তির গৃহীত পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল, সংশ্লিষ্ট বিদেশী রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নয়। অন্য কথায়, যদি একজন দ্বৈত নাগরিক তার বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আইনত প্রয়োজনীয় যাবতীয় কার্যাবলি সম্পন্ন করেন, তবেই তিনি সাংবিধানিক শর্ত পূরণ করেছেন বলে গণ্য হবেন। ফলস্বরূপ, নির্বাচন কমিশন সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে বিদেশী সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকত্ব বাতিলের কোনো আনুষ্ঠানিক সনদ বা প্রামাণ্য দলিলে জোর প্রদান করেনি।

কমিশনের এ অবস্থান আগের অনমনীয় রীতিগুলো ভেঙে এক নতুন নজির স্থাপন করেছে। একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন মনে করেছে, প্রার্থীর ভাগ্য বিদেশী রাষ্ট্রের দাফতরিক মন্থরতার হাতে ছেড়ে দেয়া অনুচিত। কারণ এর ফলে পরোক্ষভাবে বিদেশী রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের সংসদীয় গঠনপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা পেয়ে যায়। ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি আমি যখন নির্বাচন কমিশনের সামনে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে লড়ছিলাম, তখন আমি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরি। আমার বক্তব্য ছিল, জনপ্রতিনিধিদের আইনি বৈধতা কোনো বিদেশী আমলাতন্ত্রের সনদের ওপর ঝুলে থাকতে পারে না। সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচনব্যবস্থা কেবল তার নিজস্ব আইন দ্বারা পরিচালিত হবে; বিদেশের দাফতরিক সিদ্ধান্তের কাছে এটি মাথা নত করতে পারে না।

কমিশনের সামনে যুক্তি উপস্থাপনকালে বেশ কয়েকজন সিনিয়র অ্যাডভোকেট জোর দিয়ে বলেন, ‘বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে’, এই শব্দগুচ্ছ সরাসরি প্রার্থীর নিজস্ব আচরণের ওপর আলোকপাত করে। সংবিধান প্রত্যাশা করে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। এটি নির্বাচন কমিশনকে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা দেয় না যে, সংশ্লিষ্ট বিদেশী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সেই আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর বা অনুমোদিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। নির্বাচন কমিশন এ যুক্তিগুলো গ্রহণ করে। একটি সমন্বিত আদেশের মাধ্যমে কমিশন ঘোষণা করে, যেসব দ্বৈত নাগরিক তাদের বিদেশী নাগরিকত্ব প্রত্যাহারে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন, তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কমিশন এক দিকে যেমন সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে, অন্য দিকে এ নীতিও সুসংহত করেছে যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী অধিকার কেবল এ দেশের আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, যা বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োগ করবে।

তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক দ্বৈত নাগরিককে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেয়া হলেও, কুমিল্লা-১০ আসনের প্রার্থী আব্দুল গফুর ভূঁইয়া ছিলেন এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। জনাব ভূঁইয়া এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। শুনানিকালে দু’টি গুরুতর সমস্যা উন্মোচিত হয়। প্রথমত, এটি প্রমাণিত হয়, তিনি তার মনোনয়নপত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করে নির্বাচন কমিশনকে বিভ্রান্ত করেছেন, যা একটি ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’। দ্বিতীয়ত, তিনি তার বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেননি। নির্ধারিত ফরম এবং পদ্ধতি ব্যবহারের পরিবর্তে তিনি কেবল মার্কিন কর্তৃপক্ষকে একটি ই-মেইল পাঠিয়ে তার নাগরিকত্ব ত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন, যা ছিল নিতান্তই অপর্যাপ্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের দাফতরিক নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, একটি ই-মেইল কখনো নাগরিকত্ব ত্যাগের বৈধ আবেদন হিসেবে গণ্য হতে পারে না। আদালতের সামনে উপস্থাপিত নথিপত্র থেকে প্রতীয়মান হয়, ওই প্রার্থী তার বিদেশী নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য কোনো আন্তরিক বা প্রকৃত প্রচেষ্টা চালাননি। গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ শুনানির পর হাইকোর্ট বিভাগ আব্দুল গফুর ভূঁইয়ার রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন। ফলে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে তিনি অযোগ্য রয়ে গেলেন। এখন দেখার বিষয়– আপিল বিভাগে তিনি আবেদন করেন কি না।

রাষ্ট্র এবং এর সব প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিরোধী দলের অসংখ্য রাজনীতিকের ওপর চালানো রাজনৈতিক নিপীড়নের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক নির্বাসন ও জোরপূর্বক অভিবাসনের রূঢ় বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে নির্বাচন কমিশন একটি বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে, যা অত্যন্ত বিচক্ষণ ও ন্যায়সঙ্গত। তবে, অতীত নিপীড়নকে কখনোই ‘অসততার লাইসেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। যারা সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে চান, তাদের অবশ্যই আইনের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। দ্বৈত নাগরিকদের নিজেদের মনোনয়নপত্রে পূর্ণাঙ্গ ও সত্য তথ্য প্রকাশ করা আবশ্যক; তাদের বর্তমান বা অতীত নাগরিকত্ব সম্পর্কে খোলাখুলিভাবে স্বীকারোক্তি দিতে হবে। একই সাথে তাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা আইন অনুযায়ী সেই নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য ‘সরল বিশ্বাসে’ যাবতীয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এটি কোনো অতিরিক্ত বা অন্যায্য দাবি নয়। যারা দেশ শাসনের অধিকার চান, তাদের কাছ থেকে নাগরিকরা ন্যূনতম যে সততা ও স্বচ্ছতা প্রত্যাশা করেন, এটি তার প্রতিফলন।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি