ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আর মাত্র এক দিন বাকি। জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন-উত্তর একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অধীর আগ্রহে পুরো জাতি অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য হলো— ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা এবং তার দল (পড়তে হবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী) বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিরা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে শেখ হাসিনার সরকার বিরোধী মত দমনে গুম-খুন ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করে শুধু ক্ষান্ত হয়নি; গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার সব উপায়ও রুদ্ধ করে রেখেছিল। রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছিল। তিনটি জাতীয় নির্বাচন সম্পূর্ণ তামাশায় পরিণত হয়। গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাহীন আওয়ামী লীগের তাই নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকতে পারে না।
পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের বাইনারি থেকে দেশের রাজনীতি এখন বেরিয়ে এসেছে। আশির দশকের প্রথম দিকে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে হটিয়ে এক রক্তপাতহীন সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা দখলের পর জেনারেল এরশাদ নিজের মসনদ পাকাপোক্ত করতে রাজনৈতিক দল-জাতীয় পার্টি গঠন করেন। যদিও পুরো আশির দশক জাতীয় পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল; তবু দেশে প্রকৃত বাস্তবতায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বাইনারি রাজনীতি বহাল ছিল। মূলত পঁচাত্তর-পরবর্তী দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি সমান্তরালে চলেছে।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইনারি রাজনীতি শক্ত ভিত পায়। সেই পাটাতন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপূর্ব বহাল ছিল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান (যাকে কেউ কেউ বর্ষা বিপ্লব নামে অভিহিত করেছেন) পরবর্তী এ দেশের রাজনীতি পুরনো বাইনারি ভেঙে নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। পরিবর্তী সময়ে এই বাস্তবতায় রাজনীতির মাঠে-ইসলামপন্থী বিশেষ করে গত দেড় দশকে ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার জামায়াতে ইসলামী প্রবল শক্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাই বিএনপির একসময়ের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বচনী মাঠে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়েছে। এতে দেশের বাইনারি রাজনীতি এবার বিএনপি বনাম জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের এই যে প্রবল উত্থান; এর পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্ন্তি করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রথমত, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয়ভাবে চরম জুলুমের শিকার হলে প্রাকৃতিক নিয়মে ওই ব্যক্তি গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনের তাগিদে কৌশলী হয়ে ওঠে। এটি স্বভাবজাত। অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় এমনটি হয়। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় জামায়াতে ইসলামী টিকে থাকার রাজনৈতিক কৌশল রপ্ত করতে পেরেছে। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন— প্রাচীন মিসরে বনি ইসরাইলকে চরম নির্যাতন, নিপীড়ন করে ফেরাউন ধ্বংস করতে চেয়েছিল। নিয়তির নির্মম পরিহাস— সদলবলে ফেরাউনের সলিল সমাধি হয়। অন্য দিকে নবী মূসার নেতৃত্বে বনি ইসরাইলকে আল্লাহ জিল্লতির জীবন থেকে মুক্তি দেন। তারা স্বাধীনতার স্বাদ পায়। মক্কায় কোরাইশদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে নবী সা: মদিনায় হিজরত করেন। পরে নির্যাতিত মুসলিমের হাতে কোরাইশদের পতন ঘটে।
হাল আমলের একটি উদাহরণ দিই— আশির দশকের প্রথম দিকে ফিলিপাইনের বিরোধী নেতা বেনিগনো একুইনো জুনিয়রকে ১৯৮৩ সালে হত্যার মধ্য দিয়ে ফার্দিনান্দ মার্কোস তার পতনের বীজ নিজে রোপণ করেন। একুইনো জুনিয়রের বিধবা স্ত্রী কোরাজন একুইনোর প্রবল আন্দোলনের মুখে আশির দশকের মাঝামাঝি স্বৈরশাসক মার্কোসের পতন ঘটে। আর কোরাজন একুইনো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ১৯৮৬-১৯৯২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। শুধু তাই নয়, এই দম্পতির একমাত্র পুত্র বেনিগনো একুইনোও দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ২০১০-২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অথচ একুইনো জুনিয়রকে হত্যা করে মার্কোস তার মসনদ নিষ্কণ্টক করতে চেয়েছিলেন। সেই তিনি দেশ থেকে পালিয়ে জানে বাঁচেন। এমন উদাহরণ বিশ্ব ঐতিহাসে ভূরি ভূরি। এটি প্রমাণিত সত্য যে, নিপীড়িত অর্থাৎ— মজলুমের প্রবলভাবে রাজনৈতিক কর্তাসত্তায় হাজির হওয়া আসলে সময়ের ব্যাপার মাত্র। একসময়ে যে আওয়ামী দুঃশাসনে হত্যা-গুমের সবচেয়ে বেশি শিকার জামায়াতের নেতাকর্মী; সেই দলটি আজ এ দেশের রাজনীতিতে অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কেউ স্বীকার করুন আর নাই করুন— এটিই সত্যি, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল অনন্য। দেশের মানুষের একটি অংশের কাছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা তাই বিপুল বেড়েছে।
তৃতীয়ত, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন নির্বাচনী জোটে জুলাইযোদ্ধাদের সম্মুখসারির নেতৃত্বের সমন্বয়ে গঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির যোগ দেয়া। এতে তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন জামায়াতের জন্য সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চতুর্থত, চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সীমাহীন দখল ও চাঁদাবাজি হয়েছে। জামায়াত নেতাকর্মীদের এর সাথে সম্পৃক্তি পাওয়া যায়নি। এ কারণে দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে জামায়াতের অবস্থান দৃঢ় হয়েছে। মনে রাখা ভালো, বর্তমানে দেশের মানুষের যে অংশটি সমাজে নৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, সেসব মানুষের আস্থা কুড়িয়েছে জামায়াত। তবে এ বিষয়ও সবার নজর এড়ায়নি যে, শহরাঞ্চলে খেটে খাওয়া শ্রমিক, মজুর ও রিকশাচালক, যারা রাজনৈতিকভাবে সচেতন; তারাও এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। তবে গ্রামীণ জনপদে কৃষকসমাজে জামায়াতের রাজনীতি কতটা প্রভাবশালী হয়েছে সেটি দেখার বিষয়। নারী ভোটারদেরও উল্লেখযোগ্য অংশ জামায়াতকে সমর্থন করছে তার লক্ষণ স্পষ্ট। নিশ্চিত বলা যায়, জামায়াত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সারা দেশে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে যাচ্ছে।
বিএনপি একাধিকবার ক্ষমতায় যাওয়া একটি দল। যাদের রয়েছে দেশের সর্বত্র শক্তিশালী সংগঠন। তবে দলটির জনপ্রিয়তায় ভাটার টান পড়েছে তা-ও লক্ষ করার মতো। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এর মধ্যে রয়েছে— চব্বিশ-পরবর্তী দলটির নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়া। বিশৃঙ্খল এ অবস্থা সামাল দিতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তারে দলীয় নেতাকর্মীরা তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছেন। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত ১৭ মাসে দলটির ৮৮ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।
এমন বাস্তবতায় এবারের নির্বাচন নিয়ে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো : শিক্ষিত ভোটারের বেশির ভাগ জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এর নির্দেশক হিসেবে বলা যায়— দেশের বড় পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের বিপুল বিজয়। এতে এই বার্তা দেয় যে, দেশের তরুণসমাজ জামায়াতের আদর্শ ও কর্মসূচির সাথে সহমত প্রকাশ করছে। এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। অন্য আরেকটি প্রবণতা লক্ষণীয়, নিরাপত্তার স্বার্থে নারী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জামায়াতকে ভোট দিতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের ছাত্রশিবিরকে সমর্থন ও ভোট দেয়া এর স্পষ্ট লক্ষণ।
তবে আমলাতন্ত্রের অবস্থান নির্বাচনে বিশেষ নিয়ামক শক্তি। এ ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেহেতু দলীয় সরকারের অধীনে হচ্ছে না, সেহেতু আমলাতন্ত্র ন্যূনতম নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে।
রাজনৈতিক সচেতন শহুরে শ্রমজীবী যারা জামায়াতের পক্ষে অবস্থান নেবেন, তারা গ্রামে তাদের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে ভোটের রাজনীতিতে যে একটি প্রভাব বিস্তার করবেন— তা সহজে অনুমেয়। অন্য দিকে নির্বাচনে বিএনপির প্রতি কৃষকসমাজ বিশেষভাবে সমর্থন জানাবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে । ফলে গ্রামীণ জনপদে এখনো বিএনপি তার জনপ্রিয়তা অনেকটা ধরে রাখতে পেরেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ দেশের মানুষ তীব্র ভারতীয় আগ্রাসন-বিরোধী মনোভাব পোষণ করায় বিএনপির ভারতের প্রতি নমনীয় মনোভাবে দেশের একটি বিরাট অংশ রুষ্ট। ফলে এ অংশের সমর্থন জামায়াতের পক্ষে চলে যাওয়া স্বাভাবিক। পাশাপাশি ভারতের সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলোতে একই কারণে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। বিএনপির আরেকটি দুর্বলতা হলো— সারা দেশে ৭৯টি আসনে ৯২ বিদ্রোহী প্রার্থীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অন্য দিকে জামায়াতের মাত্র একজন প্রার্থী বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটের মাঠে পেশিশক্তির প্রভাব বড় হয়ে ওঠে । পেশিশক্তির ব্যবহারে জামায়াতের দলীয় অবস্থান নেই। কায়েমি স্বার্থের সাথেও জামায়াতের সেভাবে সম্পর্ক নেই বললেই চলে।
বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট একে-অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হচ্ছে। উভয় দলের আসন ব্যবধান অনুল্লেখযোগ্য হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে নির্বাচনে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ভোটাররা তাদের যে সিদ্ধান্ত ব্যালটে জানাবেন তাই চূড়ান্ত। ফল যাই হোক না কেন, এবারের নির্বাচন আমাদের জাতীয় জীবনের বাঁকবদল— এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



