ধর্মের পথে সাধক যারা— ইনসাফের যুদ্ধে সেনানী তারা

২০২৪ সালে দেশে যে যুগান্তকারী ছাত্র-জনতার মহাবিদ্রোহে স্বৈরাচারী ও ভারতীয় পদলেহী দুঃশাসনের অবসান ঘটে, সেই জাগরণে অন্যতম প্রধান সামাজিক শক্তি ছিল দেশের ছাত্র-জনতা, সত্যিকারের সুশীল, আদর্শবান এবং নৈতিক বলে বলীয়ান দেশের মাদরাসার ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের ওস্তাদকুল এবং দেশের আলেম সমাজ। বলা বাহুল্য, দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণ, দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গলের উভয়বিধ নৈতিক শিক্ষার প্রধান বাতিঘর হলো আলেমসমাজ। তথাকথিত প্রগতিশীল শহুরে এলিটরা বরাবর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এসেছে এই প্রজ্ঞাবান, দেশপ্রেমিক ও জনবান্ধব আলেম সমাজকে। তারা বামপন্থী নন বলে জ্ঞানে শিক্ষায় সংস্কৃতিতে, সাহিত্য-সাধনায় পিছিয়ে পড়া মানুষ বলে আমরা এতদিন গণ্য করে এসেছি। বিষয়টি নিতান্ত একটা অপপ্রচার। অথচ তারা হলেন সমাজের প্রকৃত অভিভাবক এবং সমাজ নেতা।

এখন দিন বদলেছে। স্বৈরাচার-বিরোধী গণজাগরণে আমরা তাদের ত্যাগ এবং গৌরবময় অবদান দেখেছি। নৈতিকতার পতাকা সমুজ্জ্বল করে ফ্যাসিবাদ উৎখাতের সংগ্রামে মক্তব-মাদরাসার ছাত্রছাত্রীরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের শিক্ষক আলেমরা যে প্রেরণা জুগিয়েছেন, তা কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র-শিক্ষকদের সংগ্রামী ভূমিকার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে অন্যদের চেয়ে বেশি। অথচ গত ১৫-১৬ মাসে তারা বৃদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে, এমনটি নব-জাগ্রত নবীন তরুণ ছাত্র যুবকদের কাছ থেকেও যথাযোগ্য স্বীকৃতি পাননি। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দেশের আলেম সমাজ এবং ইসলামী ধারার ছাত্র-যুবকদের অবদানের কোনো স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

এই আলেমে দ্বীনগণ দেশের নিঃস্বার্থ সামাজিক অভিভাবক। হতে পারে তারা ইংরেজি কম জানেন। কিন্তু আরবি-ফার্সি ভাষায় তারা সমৃদ্ধ। তারা একটি বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীর নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের সদাজাগ্রত প্রহরী। আমি নিজে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ছাদ ভেঙে পড়ায় হতাহত হিন্দু ছাত্র ভাইদের জরুরি রক্তদানের ডাকে বকশিবাজারের আলিয়া মাদরাসাসহ বহু মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা সে দিন হাজারে হাজারে ছুটে গিয়েছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সি বিভাগে। এরা হলেন বাংলাদেশের সেই সব গ্রাম থেকে আসা কৃষকের সন্তান। আমাদের ইতিহাস লিখিয়েরা যাদের সাথে করেননি এতটুকু সুবিচার। সমাজ যাদের সুমহান মানবিক অবদানের কথা চেপে গিয়েছে। তাদের গায়ে একেক সময় একেক ধরনের ‘ট্যাগ’ চড়ানো হয়েছে। কখনো বলা হয়েছে রাজাকার, কখনো বলা হয়েছে ‘উগ্র সন্ত্রাসবাদী’ ‘ধর্মান্ধ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এটা যে এই কোমলমতি দেশপ্রেমিক ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ও নৈতিক আচরণে আখলাকে দীক্ষিত সচ্চরিত্র কিশোর-যুবক শ্রেণীর প্রতি কতটা নিষ্ঠুর উপহাস এবং পরিহাস, সে কথা মনে হলে মন বিষণ্ন হয়ে পড়ে।

তারা সাধারণ শিক্ষার সব শাখাতে অর্থাৎ বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজিতে অবগাহন করেন। উপরন্তু তারা পবিত্র কুরআন, হাদিস, দ্বীনিয়াত, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ফার্সি ভাষা এবং সাহিত্য, উচ্চতর ইসলামী শাস্ত্র যেমন ফিকাহ, কিয়াস, কিয়াম প্রভৃতি গভীর জ্ঞানের রাজ্যেও সাবলীলভাবে সাঁতার কাটতে শেখেন। এক হিসাবে তারা আমাদের মতো ‘জেনারেল’ লেখাপড়ার চেয়ে আরো গভীর ধর্মীয় এলেম জ্ঞান অন্বেষণকারী এবং তাদের গড় মেধা আমাদের আধুনিক বা ইংলিশ মিডিয়ামের পাঠ্য জ্ঞানের চেয়ে সমৃদ্ধ, বহুমাত্রিক এবং নৈতিকতাসম্পন্ন।

মঙ্গোলদের বাগদাদ, বসরা এমনকি দিল্লি অভিযানকালে ইসলামের বহু গ্রন্থসম্পদ বা জ্ঞান ভাণ্ডার ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। লুট হয়ে যায় শত-সহস্র বছরের সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডার বা মহাফেজখানা। ইংরেজরাও লুটে নিয়ে যায় বহু বিখ্যাত আকর গ্রন্থ। সেকালে ছাপাখানা ছিল না। ফলে একটি কিতাবের একটা মাত্র কপি থাকত। বলা হয়ে থাকে বাগদাদের লাইব্রেরি থেকে লুট করা এসব বইপত্রে দজলা-ফোরাত নদীর স্রোত পর্যন্ত আটকে গিয়েছিল। পরে কিছু বইপত্র উদ্ধার করে পুনর্লিখনের ব্যবস্থা করা হয়। এ দেশের ইসলামী তরিকার ছাত্র-শিক্ষকরা ওইসব দুর্লভ কেতাব পড়ে দ্বীন ও দুনিয়াবি জ্ঞানের তৃষ্ণা নিবারণ করে থাকেন। বিদ্যার্জন বা পড়া একজন ইসলামী ধারার শিক্ষার্থীর কাছে কেবল পাশ করার নিমিত্ত নয়; ঐহী প্রত্যাদেশও বটে। কেননা আল্লাহর কালাম নিয়ে জিবরাইল আ: যখন ধ্যানমগ্ন নবী সা:-এর সামনে এসে খাড়ান, তখন তার প্রথম ঐশী প্রত্যাদেশ ছিল— ‘পড়ুন, আপনার প্রভুর নামে...।’ পঠন-পাঠন এবং অনুধাবন তাই ইসলামী জ্ঞান-অন্বেষণকারীদের জন্য একটি ধর্মীয় গুরুত্ববহ নির্দেশও বটে।

আমরা ইংরেজি কেতায় বেড়ে ওঠা ও গোমরাহিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকা শহুরে সংশয়প্রবণ মানুষ ইসলামী তরিকার শিক্ষাব্রতী ও জ্ঞানপিপাসু ভাইবোনদের সব সময় খাটো করে দেখতে অভ্যস্ত। দু-ছত্র ইংরেজি জেনে আমরা নিজেদের মহাজ্ঞানী, আলোকিত মানুষ ভাবতে গর্ববোধ করি। অথচ প্রকৃত প্রস্তাবে আমরাই অর্ধশিক্ষিত এবং ‘উজবুক’। আমরা আশৈশব কুরআন-হাদিসের আলো পাইনি। পাইনি সমৃদ্ধ আরবি-ফার্সি সাহিত্যের সওগাত। বঞ্চিত হয়েছি উর্দু থেকেও। অথচ উপমহাদেশকে আলোকিত করেছে আরবি-ফার্সি সমন্বিত এই উর্দু ভাষা, সাহিত্য ও সঙ্গীত। আমরা আমাদের ‘দ্বীনকে’ চিনতে পারিনি। ইসলামের ইতিহাস আমাদের অনেকের কাছে তাই ‘বেগানা’। তা হলে আমরা কীভাবে জ্ঞানী হওয়ার দাবি করি? আমরা এখনো আচ্ছন্ন আছি ঔপনিবেশিকতার সেই ঘনঘোর অন্ধকারে! ২০০ বছরের ব্রিটিশ গোলামি এবং একই সাথে উচ্চবর্ণ হিন্দু বাবু-সংস্কৃতির চাপে আমাদের মেধা-মগজ-মন-মনন সব কলুষিত, অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমরা মক্তব-মাদরাসা-হিফজখানার অপার শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপ করব কীভাবে? ওদের মেধা ও নৈতিকতার আমরা ধারেকাছেও নেই। আমরা পশ্চিমা বিজ্ঞান-সাহিত্য-রাষ্ট্র দর্শনের শরাবে মোহগ্রস্ত। আরবি সাহিত্য, পারস্য প্রতিভারত্ন, মোগলদের শিল্পকৃতি, বিদ্যানুরাগ, প্রজাকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও সামাজিক কল্যাণব্রত অনুধাবনের যোগ্য হয়ে উঠতে পারিনি আমরা।

আমাদের মোহ সংশয়বাদিতায়। আমাদের ঝোঁক তথাকথিত প্রগতিশীলতায়, আমাদের অনুকরণ হেগেল, গোগল, ডারউইন, মার্কস, এঙ্গেলস প্রমুখ। আমাদের জানার সৌভাগ্য হয়নি ইবনে খালদুন, আল-ফারাবি, ঈমাম গাজ্জালি, ইবনে তাইমিয়াহ, আবুজর গিফারি, আল্লামা ইকবাল, সৈয়দ কুতুব, আল মাওয়ার্দি। তা হলে আমরা কিসের জ্ঞানের বড়াই করি? আমরা বার্টান্ড রাসেল পড়ে গর্ব করি, অথচ আমাদের মাদরাসার ভাইয়েরা পড়ে ঈমাম গাজ্জালি-ইবনে তাইমিয়াহর রাষ্ট্র দর্শন। তা হলে সমৃদ্ধ কারা? কাদের জ্ঞানের পিপাসা মরুসম, জ্ঞানের ভাণ্ডার সমুদ্রসম? আমরা সেখানে চৈত্রের শুকনো খাল? কারা বেশি বিদ্বান, আমরা না ওই মক্তব-মাদরাসার জ্ঞান সাধকরা? তারা আধুনিক শিক্ষাও নিচ্ছে, ধর্ম-দর্শন-নৈতিকতা ও মানবাদর্শও শিখছে। শিখছে ইতিয়াস-ঐতিহ্য, সভ্যতার উত্থান-পতন। শিখছে দুনিয়া ও আখিরাত এবং দ্বীনিয়াত, আরবি ভাষা ও সাহিত্য, ফার্সি কাব্য সম্ভার। ছাত্র হিসাবে তারা মেধাবী এবং বৈচিত্র্য-অন্বেষী, জ্ঞানের পিপাসু, তাপস ও সাধক। পড়াশোনা তাদের ইবাদতের অংশ, আখলাকের বৈশিষ্ট্য এবং রূহের ক্ষুধা। তাদের সাথে অন্যদের তুলনা কী চলে?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক