দাবা খেলায় ধৈর্য রাখতে হয়। চাল দিতে হয় বুঝে শুনে। প্রতিপক্ষের চালের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। মনযোগ হারালে হাতের মুঠোয় চেকমেট করার মতো চাল থাকলেও জেতা যায় না। রাজনীতির মাঠও দাবার বোর্ডের মতো। দাবার কৌশল আবর্তিত হয় রাজনীতির কৌশলের আদলে। এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতির দাবাখেলা জমে উঠেছে। আর এক গ্র্যান্ডমাস্টার চাল হাতে নিয়ে বসে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
এখন দ্বিধা ঝেড়ে সঠিক চালে কিস্তিমাত করতে পারলেই জয় নিশ্চিত। বিএনপির একার না, সে জয় হতে পারে জামায়াত, এনসিপিসহ সব দলের, গোটা বাংলাদেশের। কিছু যুদ্ধে বিরোধী শিবিরকে পরাস্ত করার চেয়ে দেশকে জিতিয়ে দেয়াই বড় জয়। চেকমেটের এই চাল হবে দেশের বিরুদ্ধে সক্রিয় ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে, যারা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে চায়। ষড়যন্ত্রের সেই ‘রাজা’ হটাতে পারলে যে জয় আসবে, সেটি হবে স্থায়ী। সবাই মিলে জিততে পারলে তা পরিণত হবে সম্মিলিত উৎসবে।
বিএনপির হাতে এখন ‘জুলাই সনদ’ নামের বিজয়ী চাল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়ায় বলেছেন, ‘জুলাই সনদে প্রথম স্বাক্ষর করেছে বিএনপি। এরপর অন্যান্য দল। বিএনপি সরকার জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করবে।’
আমরা মূলত এই বিএনপিকেই চাই, যে বিএনপি জুলাই বিপ্লবে শহীদদের আকাক্সক্ষা ধারণ করবে। গণভোটে দেয়া মানুষের রায়কে সম্মান জানাবে। সবাইকে এককাতারে দাঁড় করিয়ে দেশের প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করবে। এই চাওয়াই ছিল রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের।
জিয়াউর রহমানের দর্শন ছিল জাতীয়তাবাদ। তিনি ধর্ম বা বর্ণভিত্তিক জাতির কথা বলেননি। বলেছেন বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সবার পরিচয় হবে বাংলাদেশী। যার যার ধর্ম থাকবে, নৃগোষ্ঠীর পরিচয় থাকবে। তবে সবার পরিচয় হবে বাংলাদেশী।
তিনি মনে করতেন, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্ম হতে হবে এই দেশের কাদামাটি থেকে, ভিনদেশী তরিকায় নয়। তিনি বাকশাল বাতিল করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দরজা খুলে দিয়েছিলেন। জিয়া বিশ্বাস করতেন, এই দেশের উন্নয়ন হতে হবে গ্রাম থেকে। এর জন্য খাল খনন করেছেন। কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। পোশাকশিল্প আর জনশক্তি রফতানির দরজা খুলে দিয়েছেন। এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটির সূচনা করেন জিয়াউর রহমান।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শরীরে বইছে সেই শহীদ জিয়ার রক্ত। তিনি জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করবেন, এটাই স্বাভাবিক। ফ্যাসিবাদ ফেরার সব পথ বন্ধ করে দেবেন, সেটিই আশা। বাংলাদেশ তো এমন বিএনপির সাথেই পরিচিত।
সরকার গঠনের পর গণভোটের রায় এড়িয়ে যাওয়া এবং ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে অস্পষ্টতা মানুষকে হতাশ করেছে। জুলাইয়ের শহীদ এবং আহতদের ত্যাগের অবমাননা বুলেটের মতো বিঁধেছিল মানুষের বুকে।
বিএনপির যে নিঃস্বার্থ কর্মীকে বছরের পর বছর ধানের জমিতে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে, তার চোখে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। স্বপ্নের সেই পথ ধরে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে চাইছে। মানুষ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে বিএনপিকে। তাহলে এখন কেন বিএনপির সেই কর্মীকে দোটানায় থাকতে হবে? তাকে কেন প্রশ্ন তুলতে হবে, বিএনপি কি নিজের আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছে?
হতে পারে সেই সংশয় দূর করতেই দাবার বোর্ডে লাগসই চাল দিতে শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর প্রতিফলন দেখা গেছে জাতীয় সংসদে। জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিরোধী দলের প্রস্তাব গ্রহণ করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে সরকারি ও বিরোধী দলের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকছে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার এই প্রতিশ্রুতি মূলত ‘জুলাই সনদ’-এর অন্তর্ভুক্তিমূলক স্পিরিট ধারণ করে। বিএনপির কাছে আমরা এমন দায়বদ্ধতা ও উদারতাই আশা করি।
এই ইতিবাচক ভূমিকা কেবল সংসদীয় চর্চায় নয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। গুম আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়নের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। শেখ হাসিনা রেজিম জামায়াত ও বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুম করেছে। গুমের শিকার হয়েছেন নির্দলীয় সাধারণরাও। ভয়াবহ সেই চর্চা আবার যেন ফিরে আসতে না পারে, সে জন্যই জুলাই সনদ। গুমের শিকার হয়েছিলেন এমন কয়েকজন এখন জাতীয় সংসদে আছেন। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর ফিরে আসেননি। তার স্ত্রীও নির্বাচিত এমপি। গুমের সাথে জড়িতদের শনাক্ত করার উদ্যোগ তো সবার আগে তাদেরকেই নিতে হবে। গুম যেন আর না হয় এর জন্য একটা শক্ত আইনি দেয়ালও তৈরি করতে হবে। ফ্যাসিবাদী নির্যাতনের শিকার কেবল এই সংসদের কয়েকজন সদস্যই নন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর পরিবারও এর ভুক্তভোগী। সেই এক-এগারো থেকে শুরু। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনা হয় কাল্পনিক অভিযোগ। নির্যাতন করা হয় বড় ছেলে তারেক রহমানকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী)। তাকে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তার বিরুদ্ধে সাজানো হয় বেশ কয়েকটি মামলা। এই প্রহসন মঞ্চায়নে ভূমিকা রাখে সাংবাদিকদের একটা অংশ। ওই তথাকথিত ‘এলিট’ সাংবাদিকরা এখন মুখোশ পাল্টে বিএনপির সুহৃদ সেজেছেন। দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে দুঃখের দিনের সারথিদের।
এক-এগারো সরকারের সাজানো প্লটে ভর করে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ২০০৯ সালে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে। ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমানের মৃত্যু হয়। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে হৃদরোগে মারা যান তিনি। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় মোট ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। পরে ২০১৯ সালে চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ারে স্থানান্তর করা হয়। ২০২০ সালে গুলশানে তার বাড়িতে থাকার শর্তে ছয় মাসের জন্য মুক্তি দেয়া হয়। সেই সাথে রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। ওই সময়টুকুর মধ্যে বিভিন্ন রোগে কাবু হয়ে পড়েন খালেদা জিয়া। বেশির ভাগ সময় হাসপাতালেই থাকতে হতো তাকে। শরীরের জটিল অবস্থায়ও দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে যেতে দেয়া হয়নি। শেষে খালেদা জিয়াকে ঠেলে দেয়া হয়েছে মৃত্যুমুখে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি তার ওপর চালানো নির্যাতনের কথা ভুলতে পারবেন?
৫ আগস্টের বিজয় দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নতুন করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। জিয়া পরিবারের জন্য এনেছে স্বস্তি। পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে টেলিভিশনে দেখছিলেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, এই দিনটা দেখার খুব প্রয়োজন ছিল।’ ৬ আগস্ট বিকেলে কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি। তারপর এক বিবৃতিতে সাহসী ছাত্র-জনতার প্রশংসা করেন।
শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বিএনপি ও জামায়াতের নেতারাও শুকরিয়া জানিয়েছিলেন। প্রাণভরে প্রশংসা করেছিলেন ছাত্র-জনতার। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছিলেন, এই ‘মাসুম বাচ্চারা’ তাদের কারাগার থেকে বের করে এনেছেন। জুলাইয়ের লড়াইয়ে কেবল শিক্ষার্থীরাই ছিল না। আওয়ামী লীগের খুদকুঁড়ো খাওয়া মুষ্টিমেয় কিছু লোক ছাড়া গোটা বাংলাদেশ এক হয়েছিল। নেমে এসেছিল রাজপথে। একই মিছিলে দেখা গেছে জামায়াতের কর্মীকে, বিএনপির কর্মীকেও।
দেখা গেছে, একই মিছিলে এক মায়ের দুই সন্তান। বড় সন্তান জামায়াতের, ছোট সন্তান বিএনপির। দুই সন্তান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে নতুন বাংলাদেশের জন্য। তাদের লড়াইয়ে ফল এসেছে, বাংলাদেশে পরিবর্তন এসেছে। তবে এক মায়ের সেই দুই সন্তানের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে ফাটল। একজন অন্যজনের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। গত নির্বাচনে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। দেখা যাচ্ছে এখনো। চট্টগ্রামে সরকারি সিটি কলেজে এক শিবিরকর্মীর পায়ের গোড়ালি কেটে দেয়া হয়েছে। ছাত্রদলের হামলায় এই নৃশংস ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে শিবির। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন জামায়াতের এমপি শাহজাহান চৌধুরী। জবাবে একে ‘একতরফা ব্লেম’ বলে দায় সেরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অথচ তিনি শক্ত হাতে হাল ধরতে পারতেন। ঘোষণা দিতে পারতেন নিরপেক্ষ তদন্তের।
ক্ষমতার মোহে যখন এক ভাই অন্য ভাইয়ের রক্তে উৎসব করতে চায়, তখন সেটি উৎসব থাকে না, হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি। এতে পুরনো ফ্যাসিবাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর অবস্থার দরজা খুলে যাবে। ভাইয়ের রক্তে ভেজা হাতে সুন্দর আগামী গড়া যায় না।
জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদের যে ভিত্তি গড়েছিলেন, তার মূলে ছিল মানুষ। বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী তার বাবার সেই আদর্শই উচ্চকিত করবেন।
আমরা সেই বিএনপি চাই, যারা ইনসাফের কাব্য লিখবে। এ জন্য জুলাই সনদকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস দ্রুত পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ দাবার বোর্ডে থাকা চেকমেট চালটি চালতে হবে এখনই।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



