মো: সহিদুল ইসলাম সুমন
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে যখন কুয়াশা জমে, তখন সেটি দেখতে যতটা মোহময়, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভূরাজনীতি ঠিক ততটাই জটিল। বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখবেন, দক্ষিণ-পূর্ব কোণের এই পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু ভূখণ্ড নয়; বরং এটি আমাদের রাষ্ট্রের এক বিশাল কৌশলগত রক্ষাকবচ। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো- গত কয়েক দশকে আমরা পাহাড়কে কেবল পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এর গভীরের ক্ষত, সীমান্ত নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ আর ভূরাজনৈতিক মারপ্যাঁচ নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা খুব একটা স্বচ্ছ নয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্ষমতার হাল ধরলেন, তখন তিনি পাহাড়ের এই গুরুত্বটা অন্য যেকোনো নেতার চেয়ে অনেক বেশি অনুধাবন করেছিলেন। আজ যখন পাহাড়ে আবার নতুন করে অস্থিরতা দেখছি, তখন জিয়ার সেই ‘নিরাপত্তা দর্শন’ নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।
১৯৭৫-পরবর্তী টালমাটাল সময়ে বাংলাদেশ যখন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে, তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল এক অশান্ত আগ্নেয়গিরি। সীমান্তের ওপার থেকে মদদপুষ্ট সশস্ত্র বিদ্রোহীরা তখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল। জিয়াউর রহমান একজন সৈনিক হিসেবে জানতেন, শুধু বন্দুকের নল দিয়ে পাহাড় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তিনি বুঝেছিলেন, পাহাড়ে রাষ্ট্রের ‘শক্ত উপস্থিতি’ মানে শুধু বাংকারে সৈন্য বসিয়ে রাখা নয়; বরং পাহাড়কে মূল ভূখণ্ডের সাথে আত্মিক, অর্থনৈতিক এবং জনতাত্তি¡কভাবে যুক্ত করা।
আমি যখন পুরনো আর্কাইভের পাতাগুলো উল্টাই, তখন দেখি জিয়ার গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল সাহসিকতায় ভরা এবং প্রবলভাবে সময়োপযোগী। তার দর্শনটা ছিল বহুমুখী যেখানে সীমান্ত রক্ষা, অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা এবং উন্নয়নের একটি চমৎকার মিশেল ছিল। তিনি জানতেন, পাহাড় যদি অরক্ষিত থাকে, তবে পুরো বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। সেই সময়ের সেই ধূলিমলিন দিনগুলোর কথা ভাবলে অবাক লাগে, কিভাবে একজন মানুষ একাধারে উন্নয়ন বোর্ড গঠন করছেন, আবার অন্য দিকে দুর্গম সব পাহাড়ে সেনাচৌকি স্থাপনের নির্দেশ দিচ্ছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সংযুক্ত। এই ভূখণ্ডের গুরুত্ব বুঝতে হলে আপনাকে মানচিত্রের সেই ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের কথা মাথায় রাখতে হবে। পাহাড় যদি অস্থিতিশীল থাকে, তবে অপরাধী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জন্য এটি এক অভয়ারণ্য হয়ে দাঁড়ায়। জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, পাহাড়ে রাষ্ট্রের উপস্থিতি দুর্বল হওয়া মানে হলো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জন্য দরজা খুলে দেয়া।
তিনি সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর কৌশলগত অবস্থান বাড়িয়েছিলেন। জিয়ার নিরাপত্তা দর্শনের একটি বড় অংশ ছিল ‘মানুষের দেয়াল’ তৈরি করা। তিনি যখন দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল থেকে ভূমিহীন মানুষকে পাহাড়ে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন অনেক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু কৌশলগত দিক থেকে সেটি ছিল এক মাস্টারস্ট্রোক। সীমান্তের কাছাকাছি যখন নিজের দেশের অনুগত নাগরিকরা বসবাস শুরু করল, তখন সশস্ত্র বিদ্রোহীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ল। পাহাড়ের সেই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন কেবল জনসংখ্যার ভারসাম্য নয়; বরং রাষ্ট্রের জন্য এক অদৃশ্য সীমানা প্রাচীর তৈরি করেছিল।
আজকের পাহাড়ের দিকে তাকালে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। সেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি যখনই শিথিল হয়, তখনই জেএসএস বা ইউপিডিএফের মতো দলগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সহজ কথায় বলতে গেলে, পাহাড়ে আজ যে বিশাল চাঁদাবাজি আর অস্ত্রের ঝনঝনানি, তা হলো ‘রাষ্ট্রীয় শূন্যতার’ সরাসরি ফল। জিয়াউর রহমানের সময়ে এই পরিস্থিতির রাশ টেনে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল অত্যন্ত কঠোরভাবে।
তার দর্শন ছিল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। তখন পাহাড়ের সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে দমন করতে তিনি গঠন করেছিলেন বিশেষায়িত সব ইউনিট। কিন্তু তিনি শুধু দমনে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি জানতেন, পাহাড়ের মানুষের পেটে যদি ভাত না থাকে, তবে তারা সহজেই সন্ত্রাসের পথে পা বাড়াবে। তাই তিনি ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড’ গঠন করলেন ১৯৭৬ সালে। উন্নয়ন আর নিরাপত্তা এই দুই চাকায় ভর করে তিনি পাহাড়কে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন।
আসলে সমস্যাটা কোথায় জানেন? যখন রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রক ভূমিকা ছেড়ে দেয়, তখন সেই জায়গা দখল করে নেয় স্থানীয় ‘ডন’ বা সশস্ত্র গ্রুপগুলো। আজ পাহাড়ে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। এই যে চাঁদাবাজির অর্থনীতি, এটা পাহাড়ের উন্নয়নকে গিলে খাচ্ছে। জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন পাহাড়কে রাষ্ট্রের মূলধারার অর্থনীতির সাথে যুক্ত করতে, যাতে কেউ আড়ালে বসে সমান্তরাল শাসন চালাতে না পারে।
সেনাবাহিনী নিয়ে জিয়াউর রহমানের একটি নিজস্ব দর্শন ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি উন্নয়নশীল দেশের সেনাবাহিনী কেবল ব্যারাকে বসে থাকার জন্য নয়। বিশেষ করে পাহাড়ের মতো দুর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী হবে উন্নয়নের প্রধান কারিগর। তার নির্দেশেই পাহাড়ের গহিন অরণ্যে রাস্তাঘাট তৈরির কাজ শুরু হয়।
অনেকে প্রশ্ন তোলেন, পাহাড়ে সেনাবাহিনীর এত ক্যাম্প কেন? তাদের জন্য উত্তরটা হলো পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থান। আপনি যদি একবার সাজেক বা আলীকদমের গহীন জঙ্গল দেখেন, বুঝবেন সেখানে পুলিশ বা সাধারণ প্রশাসন দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। জিয়া জানতেন, সেনাবাহিনীর উপস্থিতি মানেই হলো রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতা। তার সময়ে ‘অপারেশন দাবানল’ শুরু হয়েছিল এই দর্শন থেকেই বিদ্রোহীদের দমন করা এবং দুর্গম জনপদে রাষ্ট্রের সেবা পৌঁছে দেয়া।
সেনাবাহিনী সেখানে কেবল অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকেনি; তারা সেখানে স্কুল করেছে, হাসপাতাল বানিয়েছে, সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছে। জিয়ার সেই দর্শন আজো পাহাড়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। আজ যদি পাহাড় থেকে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়, তবে যে শূন্যতা তৈরি হবে, তা পূরণ করার ক্ষমতা অন্য কোনো বাহিনীর নেই। এটি কোনো আবেগি কথা নয়, এটি হলো বাস্তবতা।
পাহাড়কে নিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতির খেলাটা অনেক পুরনো। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাথে পাহাড়ের যে সম্পর্ক, তা সব সময় মসৃণ ছিল না। জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সচেতন ছিলেন, পাহাড়কে ব্যবহার করে বাইরের শক্তি যেন বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। তিনি জানতেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা সেখানে যদি বিদেশী মদদপুষ্ট কোনো ‘বাফার স্টেট’ তৈরির চেষ্টা চলে, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে।
তার শাসনামলে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাহাড়ের ইস্যুটিকে খুব সতর্কভাবে সামলেছেন। তিনি যেমন অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন করেছেন, তেমনি প্রতিবেশীদের সাথে দরকষাকষিও করেছেন শক্ত অবস্থানে থেকে। তার নিরাপত্তা দর্শন ছিল ‘নিজের ঘর আগে গোছাও, তাহলে বাইরের কেউ উঁকি দেয়ার সাহস পাবে না।’ আজ যখন পাহাড়ে নতুন নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী (যেমন- কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ) গজিয়ে উঠছে, তখন বোঝা যায় আমাদের রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে কোথাও বড় কোনো ফুটো তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক রাজনীতির এই জটিল দাবার চালে বাংলাদেশ যদি পিছিয়ে পড়ে, তবে তার মাশুল দিতে হবে প্রজন্মকে।
আমরা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। পাহাড়ে রাষ্ট্রের উপস্থিতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে। তথাকথিত মানবাধিকার বা অধিকারের আড়ালে পাহাড়কে রাষ্ট্রহীন করার একটি সূ² প্রক্রিয়া চলছে বলে আমার মনে হয়। জিয়াউর রহমান যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তিনি হয়তো দেখে অবাক হতেন, তার তৈরি করা উন্নয়নের ভিত্তিগুলো আজ কতটা নড়বড়ে।
রাষ্ট্রীয় শূন্যতা মানে কী? এর মানে হলো এমন এক পরিস্থিতি যেখানে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের আইনের চেয়ে সশস্ত্র ক্যাডারদের ভয়ে বেশি তটস্থ থাকে। পাহাড়ে আজ সেই চিত্রই দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা চাঁদা না দিয়ে ব্যবসায় করতে পারছেন না, উন্নয়ন কাজ থমকে আছে। আর এই শূন্যতার সুযোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্র আর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো।
জিয়ার দর্শন ছিল পাহাড়ে বাঙালি ও পাহাড়ি জনগণের মধ্যে একটি সংহতি তৈরি করা। তিনি কখনোই পাহাড়িদের শত্রু মনে করেননি; বরং তাদের উন্নয়নের মূল স্রোতে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আজ পাহাড়ে যে বিভাজনের রাজনীতি চলছে, তা রাষ্ট্রের জন্য এক ভয়াবহ সঙ্কেত। যদি এখনই পাহাড়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো না হয় এবং জিয়ার সেই ‘স্ট্র্যাটেজিক ডমিনেন্স’ বা কৌশলগত প্রাধান্য ফিরিয়ে আনা না হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে পাহাড় আমাদের হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হতে পারে।
পাহাড় আমাদের সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। জিয়ার নিরাপত্তা দর্শন আমাদের শিখিয়েছিল, সার্বভৌমত্ব কোনো কাগুজে বিষয় নয়, এটি সরাসরি মাটির সাথে সম্পর্কিত। পাহাড়ে রাষ্ট্রের শক্ত উপস্থিতি কেবল দমন-পীড়নের জন্য নয়; বরং সেখানকার প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।
আসলে পাহাড় নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় ঘাটতি আছে। তারা পাহাড়কে দেখেন পর্যটন স্পট হিসেবে; কিন্তু জিয়া দেখেছিলেন ‘প্রতিরক্ষা দুর্গ’ হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আজ ভীষণ জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড় যদি শান্ত না থাকে, তবে সমতলও কখনো নিরাপদ থাকবে না। জিয়ার সেই সময়ের পদক্ষেপগুলো আজ হয়তো অনেকের কাছে কঠোর মনে হতে পারে; কিন্তু সেই কঠোরতা না থাকলে আজ আমরা হয়তো এই লেখাটা লেখার মতো মানচিত্রই খুঁজে পেতাম না।
লেখক : পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক



