এম এ আজিজ
২০২৫ ও ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে জোর করে ঠেলে পাঠানো বা পুশইন করা হচ্ছে। আসাম সরকার মূলত অভিবাসী (আসাম থেকে বহিষ্কার) নির্দেশ-১৯৫০ আইন (Immigrants-Expulsion from Assam Act, 1950) নামক একটি ঔপনিবেশিক আমলের আইন ব্যবহার করে বাংলাভাষী ও কথিত অবৈধ অভিবাসীদের বাংলাদেশে পুশইন করছে।
অভিবাসী বহিষ্কার আইন-১৯৫০ প্রণয়নের ১০ বছর আগে ১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পিতা শিশির অধিকারী (পূর্বনাম মাখনলাল ভট্টাচার্য) ও মা গায়ত্রী দেবি (পূর্বনাম গায়ত্রী ভট্টাচার্য) নাম পরিবর্তন করে আদি বাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাটাজোর গ্রাম ছেড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাস শুরু করেন। শুভেন্দু অধিকারীও ১৯৭০ সালে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁকুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অভিবাসী বহিষ্কার আইন-১৯৫০ করার ২০ বছর পর। তার বাবা-মা এখনো বেঁচে।
প্রশ্ন উঠেছে, ১৯৫০ সালের অভিবাসী বহিষ্কার আইনে বিবেচনা করলে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পরিবারও ‘অবৈধ অভিবাসী’। শুভেন্দু অধিকারীর জন্মও অভিবাসী বহিষ্কার আইন হওয়ার ২০ বছর পর। তাহলে তার মা-বাবাসহ তার পরিবারকেও অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বাংলাদেশে পুশইন করবে কে?
অন্য দিকে শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন, ‘আমার মা বরিশাল থেকে এসেছিলেন, হিন্দু নিপীড়নের যন্ত্রণা আমি বুঝি।’ শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন মমতা ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সেই শুভেন্দু অধিকারীই মমতা ব্যানার্জিকে পরাজিত করে বিজেপি থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। তিনি বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভা ও রাজনৈতিক সমাবেশে ‘আসাম মডেল’ অনুসরণ করে বাংলাভাষী মুসলিমদের চিহ্নিত করার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে পুশইন করার কড়া বার্তা দিয়েছেন। গত ১২ মে আসামের গুয়াহাটিতে তিনি বলেন, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে অনুপ্রবেশ রোধে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, তা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গেও বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকার অনুপ্রবেশের বিষয়ে উদাসীন ছিল এবং বিএসএফকে বর্ডার অবকাঠামো নির্মাণে জমি পর্যন্ত দেয়নি।
মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারী ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) জমি বরাদ্দের অনুমোদন দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে, ভারতের প্রাদেশিক সরকার ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই বন্দুকের মুখে বা জোর করে অনেককে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে।’
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভিযানের শিকার হয়ে অনেকেই- যারা দাবি করছেন তারা ভারতেরই নাগরিক, বাংলাদেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশী কর্মকর্তাদের বরাতে জানা গেছে, মে ২০২৫ সালে ভারত থেকে এক হাজার দুই শতাধিক মানুষকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার সীমান্তে এ ধরনের পুশইন প্রচেষ্টা ঠেকাতে নজরদারি বাড়িয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে। ভারতের আসামসহ বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা বা কৌশল হিসেবে এই পুশইন চলছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা মনে করেন, ভারত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ। অনেক ক্ষেত্রেই ভারত ও বাংলাদেশ একে-অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভারত ও বাংলাদেশ- উভয় পক্ষের মধ্যে পক্ষপাতহীন আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করাই কল্যাণকর।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



