ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দখল করে তাদের আদি ভূখণ্ডের সাথে সম্পর্ক মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে।
পদ্ধতিগত পরিকল্পনার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্প্রতি পশ্চিম তীরের তত্ত্বাবধানকারী সামরিক সংস্থা ইবরাহিমি মসজিদের সব প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ফিলিস্তিনি হেবরন পৌরসভা থেকে সরিয়ে নিয়ে ইসরাইলি ধর্মীয় পরিষদের কাছে হস্তান্তর করেছে।
এই পদক্ষেপের ফলে ইবরাহিমি মসজিদে ইসলামী প্রশাসনের অবসান ঘটল। হেবরন পৌরসভা এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি ইবরাহিমি মসজিদ ও হেবরনের পুরনো শহরকে ইউনেস্কোর ঘোষিত বিপন্ন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণার সাথে সাংঘর্ষিক।
পূর্ব জেরুসালেমের পুরনো শহরের ইবরাহিমি মসজিদ, যেটি আল আকসা মসজিদের বিপরীতে অবস্থিত সেটিকে মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টান– সবার জন্যই হজরত ইবরাহিম আ:-এর সমাধিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এটি মুসলিম আওকাফ এবং হেবরন পৌরসভা দ্বারা পরিচালিত হতো।
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ যখন ইহুদিদের এই স্থানে প্রার্থনা করার অনুমতি দেয় তখন এটি উত্তেজনাপূর্ণ বিষয় হতে ওঠে। ১৯৯৪ সালে সশস্ত্র ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বারুচ গোল্ড স্টেইন রমজান মাসে এই মসজিদে প্রবেশ করে মুসল্লিদের ওপর গুলি চালায়, এতে ২৯ জন নিহত, ১২০ জনেরও বেশি আহত হয়। এই গণহত্যার পর ১৯৯৭ সালে এক চুক্তির মাধ্যমে মসজিদের ৬৩ শতাংশ ইহুদি উপাসকদের জন্য এবং ৩৭ শতাংশ মুসলিম নামাজিদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। স্থানটিতে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, কারণ ইহুদি উগ্রপন্থীরা মুসলিম নামাজিদের উত্ত্যক্ত করছিল এবং ইসরাইল হেবরনের পুরনো অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর দখল করে নিচ্ছিল। ইহুদিদের ছুটির দিনে মুসলিমদের মসজিদে ঢুকতে দেয়া হতো না, একবার শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ৮০ বার আজান দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
অতি সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের সব প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেয়া হয়। পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। খুব কম দেশই এই পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে।
২০০০ সালে আল আকসা মসজিদ কম্পাউন্ডে অ্যারিয়েল শ্যারনের আক্রমণের পর থেকে, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর সরকার ইহুদি উপাসকদের একচেটিয়াভাবে মুসলিমদের স্থান পরিদর্শনের উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। জর্দানের আওকাফ দ্বারা পরিচালিত স্থিতাবস্থা চুক্তির অধীনে আল আকসাকে মুসলমানদের বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। স্থিতাবস্থা লঙ্ঘন করায় বাদশাহ আবদুল্লাহ বারবার নেতানিয়াহুর সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছেন।
বর্তমান ইসরাইলি সরকারের অধীনে (যার মধ্যে চরমপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরও রয়েছেন) আল আকসায় ইহুদি অনুপ্রবেশ অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৫৮ হাজারেরও বেশি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী এই প্রাঙ্গণে হামলা চালিয়েছে। তারা এখন ইসরাইলি বাহিনীর নিরাপত্তা পাচ্ছে। চুক্তি লঙ্ঘন করে তাদেরকে দিনে দু’বার এখানে ঢুকতে এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ দেয়া হয়।
জর্দান ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছেন, ইসরাইলি উগ্রপন্থীরা মসজিদ ভেঙে সেখানে একটি ইহুদি মন্দির নির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে। ভূগর্ভস্থ খননকাজ মসজিদের ভিত্তির জন্য বড় হুমকি। ইসরাইলি বাহিনী নজিরবিহীনভাবে বহুদিন মসজিদ বন্ধ রেখেছে, আওকাফ কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ রোধ করেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় ২০২১ সালে, যখন একটি ইসরাইলি আদালত আল আকসায় ইহুদিদের নীরব প্রার্থনার পক্ষে রায় দেয়। ফলে এটি ইসলামী স্থান থেকে একটি যৌথ ইসলামী-ইহুদি স্থানে রূপান্তরিত হয়। আল আকসার পূর্বাংশ, বাব আল-রাহমা, কার্যত মন্দিরে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইহুদিরা ইসরাইলি পতাকা উত্তোলন ও ইহুদি ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করছে।
কয়েক দশকের পুরনো নীতি থেকে গুরুতর বিচ্যুতিতে, নেতানিয়াহু ২০২৬ সালেই জানুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে আল-হারাম আল শরিফের (যেটিকে ইসরাইলিরা টেম্পল মাউন্ট বলে) ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার ব্যাপারে প্রকাশ্যে সমর্থন ব্যক্ত করেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জিল লিমন সতর্ক করে বলেছিলেন, বেন-গভির একতরফাভাবে ধর্মীয় স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করছেন, বিদ্যমান উপাসনা ব্যবস্থা সংরক্ষণের সরকারি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছেন। ডেপুটি অ্যাটর্নির এই সতর্কবার্তার পর নেতানিয়াহু বেন-গভিরের কর্মকাণ্ড সমর্থন করে মিথ্যা বক্তব্য দেন।
আল আকসায় প্রতিদিনের অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকা, বেন-গভিরের নিয়ম-বিধি লঙ্ঘনের প্রতি নেতানিয়াহুর প্রকাশ্য সমর্থন এবং ইবরাহিমি মসজিদ দখলের উদাহরণ সামনে থাকায় বাস্তব উদ্বেগ রয়েছে যে, ইসরাইল এ বছর আল আকসার দখল পুরোপুরি নিয়ে নিতে পারে। এরই মধ্যে ইসরাইল পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে থাকা বিভিন্ন স্থাপনাসহ সব পুরাকীর্তির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
২০২৫ সালের শেষের দিকে নেসেটে একটি খসড়া আইন পেশ করা হয়েছিল, যাতে পশ্চিম তীরের পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর ওপর ইসরাইলের কর্তৃত্ব সম্প্রসারণের চেষ্টা করা হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে এলাকা ‘এ’ এবং ‘বি’ অন্তর্ভুক্ত করে। যে এাকাগুলো অসলো চুক্তি অনুসারে ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে থাকার কথা। ইসরাইলের চরম আধিপত্যবাদী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরব এবং মুসলিম বিশ্বের জোরালো প্রতিক্রিয়া না থাকায় ইসরাইলি উগ্রপন্থীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে। ইসরাইলের এই অন্যায্য ও জঘন্য পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জর্দান একা কিছু করতে পারবে না। এ ব্যাপারে আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর কাছ থেকে জরুরি যৌথ পদক্ষেপ প্রয়োজন।
লেখক : যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, নয়া দিগন্ত



