হাদি : স্বাধীনতার পাহারায় রক্তলেখা ভবিষ্যৎ

সেই ছেলেটিকেই, আমাদের প্রিয় হাদি ভাইকে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু ইতিহাস থেমে থাকে না। তার শহীদী রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ‘লাখো হাদি’র জন্মের অপেক্ষা।

একটি জাতির ইতিহাস কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদলের গল্পে রচিত হয় না; ইতিহাস গড়ে ওঠে কিছু অদম্য মানুষের আত্মত্যাগে, যারা সময়ের প্রয়োজনে নিজের জীবন রাজপথে রেখে যায়। শরিফ ওসমান হাদি সেই বিরল মানুষদের একজন। ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিপরীতে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আজ শহীদ হাদি হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকলেন।

ওসমান হাদির সাথে আমার কিংবা আমার মতো অনেকেরই ব্যক্তিগত কোনো পরিচয় ছিল না। দেখা হয়নি, কথা হয়নি। তবুও তিনি ছিলেন খুব কাছের, পরম আত্মীয়ের মতো। কারণ তিনি প্রতিনিধিত্ব করতেন সেই স্বপ্নের, যে স্বপ্ন সাধারণ মানুষ বুকের ভেতর লালন করে, কিন্তু প্রকাশ করতে ভয় পায়। হাদি সেই ভয়হীন উচ্চারণের নাম।

হাদির শাহাদাতের সংবাদটি আমি কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে শুনি। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসার দরজা খুলতেই আমার সাড়ে তিন বছরের শিশুটি ‘পাপ্পা’ বলে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে পড়ে যায় হাদি ভাইয়ের ১০ মাসের বাবুটার কথা। চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। হাদি বলে গিয়েছিলেন, তিনি যদি চলে যান, তার বাবুটাকে যেন আমরা দেখে রাখি। রাষ্ট্রে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নামতে গিয়ে যে বাবুটাকে তিনি কয়েক মাস কোলে নেয়ার সময়ও পাননি, সেই শিশুটির ভবিষ্যৎ আজ আমাদের সবার নৈতিক দায়।

শরিফ ওসমান হাদি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতিবিদদের ঘরে নিরাপদ মৃত্যু নয়; বরং রাজপথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রাণ দেয়াই প্রকৃত সম্মানের। এই বিশ্বাসই তাকে আলাদা করেছে। তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার নয়; বরং দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন। তাই তার রাজনীতি ছিল নির্ভীক, সরল ও মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর রাজনীতি।

ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল আপসহীন। শাহবাগে লাঠি হাতে দাঁড়ানো হাদি আজ আর নেই; কিন্তু তিনি বাতাসা আর মুড়ির রাজনীতি দিয়ে এই জাতিকে শিখিয়ে গেছেন, আন্দোলন মানে কেবল স্লোগান নয়, আন্দোলন মানে মানুষের সাথে থাকা, সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা এবং ভয়কে জয় করা। তার উপস্থিতি রাজনীতিতে এক ভিন্ন সংস্কৃতির ইঙ্গিত দিয়েছিল, যা আজকের সঙ্কটময় সময়ে আরো বেশি প্রয়োজন।

ফজরের সময়কে বেছে নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো ছিল তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক। এটি নিছক সময় নির্বাচন নয়; এটি ছিল রাজনীতিকে শুদ্ধতার সাথে যুক্ত করার একটি বার্তা। তার কণ্ঠে, চলনে-বলনে, কথার ভঙ্গিতে অনেকেই এই যুগের এক ভাসানীকে খুঁজে পেয়েছেন, যিনি মজলুমের পক্ষে দাঁড়াতে চেয়েছেন, নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকতে চেয়েছেন, আর ক্ষমতার মুখে সত্য বলার সাহস রেখেছেন।

শহীদ হাদি ভাইয়ের কণ্ঠ নেই। নেই শাহবাগের অবস্থান কর্মসূচি। আমরা আর শুনতে পাব না শত্রুর প্রতিও তার ইনসাফের কথা। কিন্তু ইতিহাস বলে, শহীদরা কখনো নীরব হন না। তাদের রক্তই হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের রাজনীতির রোডম্যাপ। শহীদ হাদির আত্মত্যাগ তারুণ্যের হৃদয়ে স্পন্দন জাগিয়ে তুলবে, নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শেখাবে, আমরা কোন পথে যাচ্ছি?

ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর এই মাসেই আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেছিলাম। আজো ডিসেম্বর এসেছে; কিন্তু সময়ের ব্যবধান প্রায় ৫৫ বছর। এই বিজয়ের মাসেই আমরা হারালাম আরেক সংগ্রামী যোদ্ধাকে, যিনি সেই স্বাধীনতাকে ভিনদেশী তাঁবেদারি ও আধিপত্যবাদ থেকে রক্ষার জন্য লাঠি হাতে পাহারা দিয়েছিলেন। আবরার ফাহাদের পর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শহীদ হওয়া আরেক নাম শরিফ ওসমান হাদি।

রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতা কোনো আপসের বিষয় নয়। যুদ্ধ শেষ হলেও স্বাধীনতার পাহারা শেষ হয়ে যায় না; বরং সময়ের সাথে সেই পাহারা আরো কঠিন হয়। হাদি ভাই সেই কঠিন পাহারার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তার জীবন উৎসর্গ আমাদের সামনে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে, সেটি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ। কিন্তু একই সাথে এটি একটি সতর্কবার্তাও, এই লড়াইয়ে সুবিধাভোগী, দুর্বৃত্তবাদী কিংবা আপসকামী শক্তির ফাঁদে পা দেয়া যাবে না।

কবির ভাষায় বলতে হয় :

‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে,

কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’

সেই ছেলেটিকেই, আমাদের প্রিয় হাদি ভাইকে হত্যা করা হয়েছে; কিন্তু ইতিহাস থেমে থাকে না। তার শহীদী রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ‘লাখো হাদি’র জন্মের অপেক্ষা।

লেখক : রাজনীতি পর্যবেক্ষক