বাজেট ২০২৬-২৭

রাজস্ব সঙ্কট, কাঠামোগত ব্যর্থতা ও সংস্কারের সুযোগ

শেষ পর্যন্ত এই বাজেট শুধু একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত। আমরা কি পুরনো, অকার্যকর কাঠামো ধরে রাখব, নাকি একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও কার্যকর করব্যবস্থার দিকে এগোব? ‘যা গোপন করা যায়, তার ওপর কর নয়, যা গোপন করা যায় না, সেই ভোগের ওপর কর’-এই ধারণা শুধু কর সংস্কার নয়, এটি একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সাহস দেখাতে প্রস্তুত কি না। সময় নষ্ট করার সুযোগ আর নেই। বিলম্ব মানে আরো রাজস্ব ক্ষতি, আরো ঋণনির্ভরতা এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ। তাই সংস্কার করতে হলে এখনই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তা বাস্তবায়নের পথে এগোতে হবে, যাতে মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরভাবে রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করা যায়

আগামী মাসেই সংসদে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। এই বাজেট আসছে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে। সরকারের সামনে এখন দ্বৈত চাপ স্পষ্ট, একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত রেখেছে, অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে আছে। এই দুই বাস্তবতা শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য নয় বরং পুরো অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা। কারণ, বাজেট কেবল ব্যয় পরিকল্পনা নয়, এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আস্থা এবং নীতিগত দিক-নির্দেশনার কাঠামো। যখন বাহ্যিক অর্থায়ন অনিশ্চিত এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব সংগ্রহ দুর্বল, তখন সরকারের সামনে দাঁড়িয়ে যায় একটিই মৌলিক প্রশ্ন, রাষ্ট্র কিভাবে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাবে?

বাস্তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সাম্প্রতিক সময়ে কর আদায় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ডিজিটাল রিটার্ন ব্যবস্থা, ভ্যাট অনলাইন, নজরদারি বৃদ্ধি এবং বড় করদাতাদের ওপর কঠোরতা- সবই জোরদার করা হয়েছে। তবুও কাক্সিক্ষত ফল আসেনি। কারণ সমস্যাটি শুধু প্রয়াসের ঘাটতি নয় বরং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। আয় গোপন, বিক্রয় কম দেখানো এবং আমদানিতে মূল্যায়নজনিত ফাঁকফোকর; এসব কারণে প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। এটি মূলত এনবিআরের ব্যর্থতা নয়; বরং এমন একটি করব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, যেখানে কর সংগ্রহের ভিত্তিই দুর্বল এবং ফাঁকি দেয়ার সুযোগ বিদ্যমান। অর্থাৎ, বর্তমান কাঠামোর ভেতরে থেকে যতই চেষ্টা করা হোক, তার একটি প্রাকৃতিক সীমা রয়েছে, যা অতিক্রম করা সম্ভব নয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সহজ সমাধান নেই। কর বাড়ানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন, আবার ঋণ বাড়ানো অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। উন্নয়ন ব্যয় কমালে প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে, আর ভর্তুকি কমালে জন-অসন্তোষ বাড়বে। ফলে এই বাজেট হয়ে উঠছে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের খেলা, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য রয়েছে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাজস্ব ব্যবস্থার কার্যকারিতা। কারণ বারবার দেখা গেছে, সমস্যা শুধু অর্থের অভাব নয়; বরং অর্থ সংগ্রহের কাঠামোগত দুর্বলতা।

বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো মূলত তিনটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল, ভ্যাট, আয়কর এবং আমদানি শুল্ক। ভ্যাট প্রায় ৪০ শতাংশ রাজস্ব দেয়, আয়কর ও করপোরেট কর প্রায় ৩০ শতাংশ, আর শুল্ক ও আমদানি কর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। কিন্তু এই কাঠামোর মূল সমস্যা হলো এটি সঙ্কীর্ণ করভিত্তির ওপর দাঁড়ানো এবং এমন উৎসের ওপর নির্ভরশীল যা সহজেই গোপন বা বিকৃত করা যায়। দেশের অর্থনীতি যেখানে প্রায় ৪৫ লাখ কোটি টাকা, সেখানে সরকারের আয় মাত্র ৩.৭ লাখ কোটি টাকা, অর্থাৎ- বিশাল একটি অংশ করের বাইরে রয়ে গেছে। স্পষ্টতই, সমস্যা করের পরিমাণ নয়, সমস্যা কর সংগ্রহের কাঠামো। বাস্তবতায় দেখা যায়, দেশে সম্ভাব্য করদাতার সংখ্যা কয়েক কোটি হলেও নিয়মিত আয়কর দেয় মাত্র কয়েক লাখ মানুষ। একইভাবে, মোট অর্থনীতির প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকায় তা করের আওতার বাইরে থেকে যায়। ফলে রাজস্ব সংগ্রহের প্রকৃত সম্ভাবনা অনেক বেশি হলেও তা বাস্তবে অর্জিত হচ্ছে না।

এই কাঠামো কেন কাজ করছে না, তা বুঝতে হলে আয়ভিত্তিক করব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে। আয় এমন একটি বিষয় যা সহজেই গোপন করা যায়, বিশেষ করে নগদনির্ভর ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে। একজন ব্যবসায়ী বা ব্যক্তি সহজেই প্রকৃত আয় কম দেখাতে পারে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কর নির্ধারণে কর্মকর্তার বিবেচনাধিকার, যা অনেক সময় দরকষাকষি ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করে। একই সমস্যা আমদানি শুল্কেও দেখা যায়, যেখানে ভুল মূল্যায়ন বা শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া সম্ভব হয়। ফলে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সৎ মানুষ কর দেয়, আর অসৎ মানুষ কর এড়িয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে, একজন দোকানদার যদি দিনে ১০ হাজার টাকার বিক্রি করেও পাঁচ হাজার টাকা দেখায়, তাহলে তার কর অর্ধেক হয়ে যায়। আবার আমদানিকারক পণ্যের মূল্য কম দেখালে শুল্ক কম পড়ে। ফলে যিনি সঠিক হিসাব দেন, তিনিই তুলনামূলক বেশি কর দেন- এটিই বর্তমান ব্যবস্থার বড় বৈপরীত্য। কর নির্ধারণে কর্মকর্তার বিবেচনাধিকার বলতে বোঝায়, কোনো করদাতার প্রকৃত আয়, ব্যয় বা করযোগ্য অংশ নির্ধারণে শেষ সিদ্ধান্ত অনেক সময় কর্মকর্তার মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে। এই ক্ষমতা তাত্ত্বিকভাবে প্রয়োজনীয় হলেও বাস্তবে এটি প্রায়ই অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ যখন সিদ্ধান্তের স্পষ্ট, স্বয়ংক্রিয় ও তথ্যভিত্তিক নিয়ম থাকে না, তখন কর নির্ধারণ হয়ে ওঠে ব্যক্তি-নির্ভর। এতে করদাতা ও কর্মকর্তার মধ্যে দরকষাকষি, বিলম্ব বা অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে সমঝোতার বিনিময়ে অঘোষিত লেনদেন ঘটে।

এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি সহজ উদাহরণ যথেষ্ট। একজন ছোট ব্যবসায়ী তার আয় লুকাতে পারে; কিন্তু সে যখন পণ্য বিক্রি করে, সেই লেনদেন লুকানো কঠিন। আবার একজন ধনী ব্যক্তি আয় কম দেখাতে পারে; কিন্তু তার বিলাসী ভোগ যেমন- এয়ার কন্ডিশনার, গাড়ি বা বিদেশ ভ্রমণ, সবই দৃশ্যমান। এখানেই বর্তমান করব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য সমাধানের ইঙ্গিত স্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন কিছুর ওপর কর বসাচ্ছি, যা সহজেই গোপন করা যায়? যদি তাই হয়, তাহলে কর ফাঁকি অনিবার্য। তাই প্রয়োজন এমন একটি করব্যবস্থা, যা দৃশ্যমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বয়ংক্রিয় এবং সবার জন্য সহজ। সহজভাবে বললে, আপনি যখন বাজারে কিছু কিনছেন বা সেবা নিচ্ছেন, তখনই কর স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে গেলে তা লুকানো যায় না। এতে করদাতার জন্য আলাদা হিসাব, রিটার্ন বা দৌড়ঝাঁপের ঝামেলা কমে যায়। সে শুধু তার স্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমেই কর দেয়। অন্যদিকে সরকারের জন্য প্রতিটি লেনদেন সরাসরি রেকর্ড হয়, ফলে ফাঁকি কমে এবং রাজস্ব নিশ্চিতভাবে সংগ্রহ করা যায়। এটি এমন এক ব্যবস্থা, যা করদাতার জন্য সহজ, আর সরকারের জন্য নির্ভরযোগ্য।

এই প্রেক্ষাপটে ভোগভিত্তিক করনীতি একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হিসেবে সামনে আসে। এর মূল দর্শন, ‘যতটুকু ভোগ, ততটুকু কর।’ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মোট জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশ ভোগের মাধ্যমে ঘটে, যা কর আরোপের জন্য একটি বড় ও দৃশ্যমান ভিত্তি তৈরি করে। এই ব্যবস্থায় কর আদায় হবে লেনদেনের মুহূর্তেই, ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ফলে কর ফাঁকি কমবে, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং করভিত্তি বিস্তৃত হবে। একই সাথে এটি উৎপাদন ও বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে না; বরং অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করে। বর্তমান ব্যবস্থায় যেখানে রিটার্ন, অডিট ও কর্মকর্তার বিবেচনার ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানে এই পদ্ধতিতে কর হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয় ও নিয়মভিত্তিক। করদাতার জন্য সুবিধা- ঝামেলাহীন, সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য; সরকারের জন্য সুবিধা- ফাঁকি কম, রাজস্ব স্থিতিশীল ও তথ্যভিত্তিক। অর্থাৎ, একই করহার রেখেও শুধু পদ্ধতি বদলালেই রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব, এটিই এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি।

বর্তমান হিসাবে মোট ভোগ প্রায় ৩১.৫ লাখ কোটি টাকা। যদি এর ওপর গড়ে ১০-১২ শতাংশ কার্যকর ভ্যাট আদায় করা যায়, তাহলে সম্ভাব্য রাজস্ব হতে পারে ৩.২ থেকে ৪.২ লাখ কোটি টাকা, যা বর্তমানের সমতুল্য বা বেশি। অর্থাৎ, করহার বাড়িয়ে নয়; বরং পদ্ধতি উন্নত করেই রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব। বিষয়টি সহজভাবে বুঝলে দেখা যায়, বর্তমানে বড় অংশের লেনদেন আংশিকভাবে ধরা পড়ে। যদি ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোগের মাত্র ৮০-৯০ শতাংশও কার্যকরভাবে কভার করা যায় এবং কার্যকর ভ্যাট হার ১২-১৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হয়, তাহলে সম্ভাব্য রাজস্ব দাঁড়াতে পারে প্রায় পাঁচ-ছয় লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ, লক্ষ্য অর্জনের চাবিকাঠি করহার নয়, সেটি হলো কাভারেজ ও সংগ্রহ দক্ষতা বৃদ্ধি।

অবশ্যই এই ব্যবস্থার কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা, নগদ লেনদেন কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা বজায় রাখা। তবে এগুলো পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। প্রথমে বড় খুচরা ব্যবসায় ও উচ্চমূল্যের লেনদেনে ডিজিটাল ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, এরপর ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র ব্যবসায় প্রসারিত করা। একই সাথে নগদ লেনদেন নিরুৎসাহিত করে ডিজিটাল লেনদেনে প্রণোদনা দেয়া এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য এবং এ বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া এখন সময়ের দাবি।

শেষ পর্যন্ত এই বাজেট শুধু একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয়, এটি একটি সিদ্ধান্ত। আমরা কি পুরনো, অকার্যকর কাঠামো ধরে রাখব, নাকি একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও কার্যকর করব্যবস্থার দিকে এগোব? ‘যা গোপন করা যায়, তার ওপর কর নয়, যা গোপন করা যায় না, সেই ভোগের ওপর কর’-এই ধারণা শুধু কর সংস্কার নয়, এটি একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সাহস দেখাতে প্রস্তুত কি না।

সময় নষ্ট করার সুযোগ আর নেই। বিলম্ব মানে আরো রাজস্ব ক্ষতি, আরো ঋণনির্ভরতা এবং সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ। তাই সংস্কার করতে হলে এখনই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তা বাস্তবায়নের পথে এগোতে হবে, যাতে মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে, অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরভাবে রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত করা যায়।

এ সুযোগ হারালে, একই সমস্যার বোঝা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বহন করতে হবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

[email protected]