তিস্তাপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা ও প্রত্যাশা

তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা তিস্তাপাড়ের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচানোর লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে চীন।

ভারত-বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত অভিন্ন নদী তিস্তা। কিন্তু ভারত নদীবিষয়ক জাতিসঙ্ঘের সনদ অমান্য করে নিজের অঞ্চল বন্যার কবল থেকে রক্ষায় ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে ৬০ কিলোমিটার উজানে জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ করে। বর্ষাকালে ভারত ব্যারাজের সব গেট খুলে দিয়ে তিস্তাপাড়ের মানুষকে বন্যায় ডুবায়। আর শুকনো মৌসুমে সব গেট বন্ধ করে তিস্তার ন্যায্য হিস্যার পানি আসতে দেয় না। ভারতীয় গবেষক গৌরি নুলকারের মতে, তিস্তার উজানে এবং বিভিন্ন উপ নদীতে ভারত আরো ১৫টি বাঁধ কিংবা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। যদি তা-ই হয়, তাহলে তিস্তা ও তিস্তাপাড়ের মানুষের কী দশা হবে তা সহজে অনুমেয়।

বর্ষা মৌসুম: বর্ষাকালে তিস্তার চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। বর্ষা মৌসুম এলে ভারত গজলডোবা ব্যারাজের সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা পড়েন মহাবিপদে। যাদের বাড়িতে অচল বৃদ্ধ, অসুস্থ-রোগী, মহিলা ও গবাদিপশু থাকে তাদের ভাগ্যে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। বর্ষায় তিন-চারবার তিস্তার দু’পাড় উপচে বন্যার সৃষ্টি হয়। চার দিকে অথৈ পানি, ফসলসহ জমি, রাস্তাঘাট সব তলিয়ে যায়। নৌকা ছাড়া চলার উপায় থাকে না। কিন্তু পর্যাপ্ত নৌকার অভাব। বর্ষাকালে লাশ দাফন ও দাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। দিনমজুরদের থাকে না কর্ম। ফলে অনেক দিনমজুর পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটায়। কোনো সময় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এতে জমির ফসল এবং খড়ের বাড়িঘর সম্পূর্ণ পচে নষ্ট হয়ে যায়। গরু, ছাগল, ভেড়ার অবর্ণনীয় কষ্ট হয়। দীর্ঘ বন্যা শেষে পুনরায় আবাদ করার সময় ও প্রয়োজনীয় বীজ-চারা থাকে না। রাস্তাঘাট সব কর্দমাক্ত ও খানাখন্দে ভরে যায়, চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। বর্ষার সময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এতে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পরে। তারা মা-বাবার সাথে কৃষিকাজে জড়িয়ে পড়ে, আর পড়ালেখা হয় না তাদের।

বর্ষাকালে নদীর বাঁকে বাঁকে শুরু হয় তীব্র ভাঙন। চোখের সামনে বাপ-দাদার ভিটেমাটি ও আবাদি জমি নিমিষে নদীতে বিলীন হয়ে যায়। নিরাশ বদনে বাকরুদ্ধ হয়ে দেখা ছাড়া করার কিছু থাকে না। নদীভাঙনের শিকার হয়ে গ্রামের অনেক ধনী মানুষ অন্যের জমিতে ছোট ছোট ভাঙা ঘর তুলে করুণার পাত্র হয়ে দিনাতিপাত করেন। অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে আশ্রিত হয়ে জীবনযাপন করেন।

অনেকে আবার সর্বস্ব হারিয়ে কোথাও আশ্রয় না পেয়ে এলাকা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে অন্যত্র চলে যান, বিশেষত শহরাঞ্চলে। কেউ আবার কোথাও না গিয়ে তিস্তার পাড় আঁকড়ে ধরে নদীর অদূরে ঘর বাঁধেন।

শুকনো মৌসুম : শুকনো মৌসুমে ভারত গজলডোবা ব্যারাজের সব গেট বন্ধ করে দিয়ে তিস্তার ন্যায্য হিস্যার পানি আটকে রাখে। তখন তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি থাকে না। তিস্তা হয়ে পড়ে খালসম। তিস্তায় নৌ-চলাচল ও জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নৌ-মালিক ও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। মৎস্যজীবীরা মাছ শিকার করতে না পেরে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকেন। তিস্তায় পানির অভাবে তিস্তাপাড়ের মানুষ স্যালোমেশিন দিয়ে গম, ভুট্টা, রসুন, পেঁয়াজ, চিনাবাদাম, লাউ, কুমড়া, কলাইসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন। সর্বদা অভাব-অনটন আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে লড়াই করে বাঁচতে হয় তাদের। চরাঞ্চলের মানুষ হাট-বাজার করেন মাইলকে মাইল ধু-ধু বালুচর আর খানাখন্দে ভরা মেটোপথ হেঁটে। অনেকে মালামাল বহন করেন ঘোড়ার গাড়িতে। বরযাত্রীকে হেঁটে যেতে হয় বিয়েবাড়িতে। নববধূকে হাঁটিয়ে আনতে হয় বাড়িতে। প্রসূতি ও রোগীকে পাশের উপজেলায় বা হাসপাতালে নিতে হলে তক্তায় অথবা জলচৌকিতে শুইয়ে রশি দিয়ে বাঁশ বেঁধে ঘাড়ে করে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সময়মতো সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী গুরুতর অসুস্থ পড়েন। এ সব দৃশ্য, বন্যা ও খরায় দুর্ভোগ-ভোগান্তি দেখে মানুষ চরবাসীর সাথে আত্মীয়তা করতে চান না।

প্রত্যাশা : তিস্তাপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা তিস্তাপাড়ের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচানোর লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে চীন। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে তিস্তার দু’পাড়ে বনায়ন, সৌর বিদ্যুৎ, আধুনিক সেচ সুবিধাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ হবে এবং বিভিন্ন স্থানে স্যাটেলাইট শহর, নৌ-বন্দর গড়ে উঠবে। দু-পাড়ের জমি হবে চিরস্থায়ী আবাদি ও বসতযোগ্য। জমি আর হবে না নদী সিকস্তি। নিশ্চিত হবে ভূমি মালিকানা, রোধ হবে ভূমিবিরোধ ও মামলা জট। নৌকা চলবে ১২ মাস, জেলেরা মাছ ধরবে সারা বছর। উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য দেশ-বিদেশে যাবে নদীপথে। এতে তিস্তাপাড়ের তথা উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন-জীবিকা হবে উন্নত এবং রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র্য। তিস্তাপাড়ের মানুষ চায় মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক দ্রুত।

লেখক : ভূমি গবেষক, সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা