হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিভূমি

কৃষিজমি রক্ষার্থে সবার আগে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা। এর কোনো প্রতিফলন সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়নি। অথচ কৃষিজমি, বনাঞ্চল, নদী, হাওর-বাঁওড় রক্ষার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্দেশনা। প্রয়োজন ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা সংবলিত মহাপরিকল্পনা। কৃষিভূমির শ্রেণী বিন্যাস এবং তা পরিবর্তনে বিধি-নিষেধ আরোপ করা দরকার। দরকার বেদখলকৃত ভূমি যেকোনো মূল্যে উদ্ধার করা এবং শ্রেণী হিসেবে পুনঃবিন্যাসের মাধ্যমে তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে কৃষিভূমির সুরক্ষা আইন ২০২৪ ও ২০২৬ মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ। বিশ্বের দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানরত ১৯৩টি দেশের তালিকায় এর অবস্থান ১৩৩তম। জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে চাহিদা ক্রমবর্ধমান, পাশাপাশি শিল্পায়নে অনগ্রসর। নগরায়ন, গৃহায়ন, শিল্পায়ন, সরকারি স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে ক্রমেই কমে যাচ্ছে কৃষিভূমির পরিমাণ। সরকারি হিসাবে দেশে কৃষিভূমির পরিমাণ প্রায় ৮৬ লাখ হেক্টর এবং বনাঞ্চল ১২.১১ শতাংশ। যেকোনো দেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। জলাভূমি, জলাধার ও প্রাকৃতিক মৎস্য বিচরণ ক্ষেত্র ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। কৃষিজমি দ্রুত পরিণত হচ্ছে অকৃষি জমিতে। যারা গত ২০-২৫ বছর ধরে ঢাকা আরিচা মহাসড়কের নিয়মিত যাত্রী তার খুব সহজেই বুঝতে পারবেন নগরায়ণে কিভাবে কৃষিজমি, জলাভূমি, বনভূমি কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে ক্রমেই উজাড় হয়ে গেছে। রাস্তার দু’পাশের কৃষিজমি, জলাভূমি, ছোট ছোট খাল-বিল এমনকি নদী পর্যন্ত হারিয়ে গেছে গত ২০-২৫ বছরে। এ সবই কিন্তু ঘটেছে কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায়। যেন কোথাও কেউ দেখার নেই। প্রাকৃতিক পরিবেশ হারিয়ে যাওয়ায় পরিবেশ দূষণের মাত্রা সীমা ছাড়িয়েছে।

হারিয়ে যাওয়া নদী ও খালের জায়গায় বিশাল বিশাল স্থাপনা সগৌরবে মাথা উঁচিয়ে ভেংচি কাটছে পরিবেশবাদী, পরিবেশমন্ত্রী, মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতরকে। একই অবস্থা সাভার থেকে নবীনগর ও চন্দ্রা পর্যন্ত রাস্তার। রাস্তার দুপাশে নয়নাভিরাম সবুজের সমারোহ এখন আর চোখে পড়ে না। বিল-ঝিল খালের ওপর, ছোট ছোট পানি প্রবাহের গতিপথে বহুতল অট্টালিকা যেন বিদ্রƒপ করছে প্রকৃতিকে। বন বিভাগের এসব বনাঞ্চল কিভাবে কার যোগসাজশে আইনের ফাঁকে রাতারাতি শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে তার সঠিক জবাব সম্ভবত কারো জানা নেই। জানা থাকলেও রহস্যজনক কারণে কেউ মুখ খুলবে না। দেশটা যেন লুটেরাদের মহোৎসবের মঞ্চ।

সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে দেশের আপামর জনগণের খাদ্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। জাতিসঙ্ঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণায় ২০৩০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রের সব নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দায়বদ্ধ। দেশের ১৮ কোটি নাগরিকদের খাদ্যের মূল উৎস কৃষি। দেশের জিডিপির ১১.২ থেকে ১১.৩ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় পুরোটাই কৃষিনির্ভর; যে কারণে বড় বড় শিল্পোন্নত দেশগুলো করোনার কষাঘাতে স্থবির হয়ে পড়লেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের ধস নামাতে পারেনি। বাংলাদেশে এক, দুই, তিন ও চার ফসলিসহ আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ এক কোটি ৬০ লাখ হেক্টরের কিছু বেশি। প্রতি বছর গড়ে ৮০ হাজার হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বার্ষিক খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা সঙ্কুুলান না হওয়ায় বাংলাদেশকে ক্রমেই আমদানিনির্ভর হতে হচ্ছে; যা ভবিষ্যতে আরো বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি সম্ভাবনার দেশ এভাবেই আমদানিনির্ভর অর্থনীতির গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। ২০১৪-১৫ সালে দেশের এক কোটি ১৭ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছিল। ২০২৪-২৫ সালে তা নেমে আসে এক কোটি ১৪ লাখ হেক্টরে। এক দশকে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় এক কোটি। বিপরীতে চাল উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ যা বাড়তি চাহিদার সঙ্কুলান করতে পারছে না। শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্প আশানুরূপ ফল বয়ে আনতে পারেনি। সার, বিদ্যুৎ, বীজের উচ্চমূল্য এবং বিরূপ আবহাওয়ায় কৃষি খাতে নেমেছে অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা।

বাংলাদেশের নগরায়নের গতির হার ৩ শতাংশ যা কৃষিজমির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। হাওর, বাঁওড়, বিল, নদী ও খাল এবং বনভূমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এতে গতি সঞ্চার করেছে জমিখেকো, নদীখেকো, বনখেকো, বালুখেকো প্রভৃতি বিশেষণে বিশেয়াতিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ কৃষিনির্ভর অর্থনীতির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হওয়ার শঙ্কায় পড়বে লাখো মানুষ। অবস্থার উত্তরণে ভূমি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে কৃষিভূমি, জলাভূমি, বনাঞ্চল, হাওর-বাঁওড় এবং নদী সুরক্ষা আশু গুরুত্বের দাবিদার। কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং কৃষি ও জলাশয় সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হলেও তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। দৃশ্যমান নয় বাস্তবায়ন প্রস্তুতিও। দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ অধ্যাদেশগুলোর বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। কৃষিজমি রক্ষার্থে সবার আগে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছা। এর কোনো প্রতিফলন সাম্প্রতিক নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিফলিত হয়নি। অথচ কৃষিজমি, বনাঞ্চল, নদী, হাওর-বাঁওড় রক্ষার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্দেশনা। প্রয়োজন ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ভূমি ব্যবহারের নীতিমালা সংবলিত মহাপরিকল্পনা। কৃষিভূমির শ্রেণী বিন্যাস এবং তা পরিবর্তনে বিধি-নিষেধ আরোপ করা দরকার। দরকার বেদখলকৃত ভূমি যেকোনো মূল্যে উদ্ধার করা এবং শ্রেণী হিসেবে পুনঃবিন্যাসের মাধ্যমে তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে কৃষিভূমির সুরক্ষা আইন ২০২৪ ও ২০২৬ মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]