বেসুরো শব্দ

স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকাগুলোকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা ও এর বাস্তবায়ন শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দিতে সক্ষম। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করা সত্ত্বেও তা কখনোই পালিত হয় না। গাড়ি চালক, গাড়ি মালিক, কেউই এর তোয়াক্কা করে না। জনস্বাস্থ্যের জন্য এর বাধ্যতামূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার

বেসুরো শব্দ যা মানুষের শ্রবণযন্ত্রের সহ্য ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে বিকট হয়ে উঠলে সৃষ্টি হয় শব্দদূষণ। নিয়ন্ত্রণহীন শব্দের ভারে তিলোত্তমা শহরের পরিবেশ দূষিত। শহরের অধিবাসীদের শরীরে এর প্রভাব দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অলক্ষ্যে নাগরিক জীবনকে তিলে তিলে ঠেলে দিচ্ছে অযাচিত স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে। এ সমস্যা মূলত মূল সড়কের আশপাশে বসবাসরত নাগরিকদের দৈহিক, মানসিক ও স্নায়বিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা যায়। রাতের বুক চিরে হাইড্রলিক হর্নের কান ফাটানো আওয়াজ তুলে যখন বাস ও ট্রাকগুলো ছুটে চলে, তখন সড়কের পাশে বসবাসকারী নাগরিকদের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও দুর্যোগ। বিশেষ করে এসব বাড়িতে বসবাসরত বয়স্ক জনগোষ্ঠী, যারা উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগে ভোগেন, তাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে স্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এসব বয়স্ক জনগোষ্ঠীর ভেতর শব্দদূষণজনিত অনিদ্রায় ভোগা রোগীর সংখ্যা সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি। শ্রবণশক্তির সীমা ছাড়িয়ে গাড়িঘোড়ার শব্দের ফলে শ্রবণশক্তি ক্রমান্বয়ে কমতে কমতে বধিরতার পর্যায়ে চলে যায়। বয়সী জনগোষ্ঠীর ভেতর তৈরি হয় শব্দজনিত Stress anxiety র মতো অস্থিরতা ও নিদ্রাহীনতা। শিশুদের ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তির ক্ষয় ছাড়াও তাদের স্মৃতির বিকাশ ও প্রকাশ দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুরা অমনোযোগী হয়ে পড়ে। খিটখিটে মেজাজের সাথে সাথে পড়াশোনার প্রতি অনীহা, দুর্বল স্মৃতিশক্তি এমনকি হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে। শিশুদের স্বাভাবিক গঠন প্রক্রিয়া এবং মানসিক স্ফুরণ ও বৃদ্ধিমত্তার বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শ্রমিকসহ সব ধরনের নাগরিকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্ষতি উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হওয়া। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা শব্দদূষণের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোকে শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, মানসিক বিকাশ, পড়াশোনায় অমনোযোগ, খিটখিটে স্বভাব, মাথাব্যথাসহ ক্ষুধামন্দা, কানে কম শোনা বলে উল্লেখ করেছেন। বয়স্কদের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দনের অস্থিরতা, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি হৃদযন্ত্রের অভিঘাতের কথা বলেছেন। অনিদ্রা, বদহজম মেজাজের তারতম্যসহ বিভিন্ন ধরনের শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতার কারণ হিসেবে শব্দদূষণের কথা উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন তত্ত্বীয় গবেষণায় দেখা গেছে, মূল সড়কের পাশের দোকানদার এবং বসবাসকারী মানুষের শ্রবণ ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে অনেক কম। শ্বাসকষ্ট, চোখের জ্বলুনি, চোখ লাল হওয়া, চোখ খচখচ করা, চোখে পানি পড়াসহ দৈহিক দুর্বলতা, অকাল বার্ধক্যের উল্লেখ করা হয়েছে শব্দদূষণের স্বাস্থ্যক্ষতির ক্ষেত্রে।

৪৫ ডেসিবেলের উপরে শব্দমাত্রা স্বাস্থ্যসমস্যা তৈরি করতে পারে। ঢাকা শহরের শব্দামাত্রা সবসময়েই এর উপর থাকে। গাড়ির হর্ন, রাস্তার পাশের নির্মাণকাজজনিত শব্দ, মাইকের আওয়াজ, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার শব্দদূষণের অন্যতম কারণ। প্রধানত জনসচেতনতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঐকান্তিক সহযোগিতা ছাড়া শব্দদূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট শব্দ মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রার শব্দ নিয়ন্ত্রণ, হাইড্রলিক হর্ন, মোটরসাইকেলের হর্ন নিয়ন্ত্রণ ও গাড়ি চালকদের সচেতন করার মাধ্যমে এটা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সড়কে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ শব্দমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জরিমানাসহ অন্যান্য শাস্তির আইনি এবং কার্যকর বিধান কিছুটা চালু হলেও শব্দমাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। পথচারীর শব্দ নিরোধক কানের প্লাগ ব্যবহার শব্দদূষণের ক্ষতি থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে নিঃসন্দেহে। গাড়ি, মোটরসাইকেল প্রভৃতির যন্ত্রাংশ শব্দসীমার মধ্যে রাখাটাও শব্দদূষণ প্রতিরোধ করার একটি উপায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইক বা সাউন্ড সিস্টেমের ক্ষেত্রে শব্দসীমা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। পৃথিবীর বহু দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা এখন প্রায় সব দেশেই অনুসৃত হচ্ছে। এর প্রর্বতন এবং প্রচলন শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট সহায়ক। স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, আবাসিক এলাকাগুলোকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা ও এর বাস্তবায়ন শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দিতে সক্ষম। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকাকে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণা করা সত্ত্বেও তা কখনোই পালিত হয় না। গাড়ি চালক, গাড়ি মালিক, কেউই এর তোয়াক্কা করে না। জনস্বাস্থ্যের জন্য এর বাধ্যতামূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার।

পরিবেশ উপদেষ্টা ক’দিন আগে শব্দদূষণ নিরোধ বিষয়ে আলোচনার আয়োজন করেছিলেন। এতে মিডিয়াকর্মী তার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছাড়া, যাদের সচেতন হওয়া সবচেয়ে বেশি দরকার তাদের সীমিত উপস্থিতি-এ ব্যাপারে আমাদের সচেতনতার দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিদিন বিভিন্ন এনিমেশন, কার্টুন, ফিল্ম প্রচারের ব্যবস্থা করা গেলে তা সহায়ক হতে পারে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল এলাকায় সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এক ঘণ্টার জন্য ‘নীরব এলাকা’ প্রতিপালন করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর, তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় এবং অধিদফতর, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানকে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে বছরে একদিন পরিবেশ দিবস পালন শুধু ফটোসেশন ছাড়া শব্দদূষণ রোধে কার্যকর কোনো ফল বয়ে আনবে না। শব্দদূষণ একটি সামাজিক ও জাতীয় পরিবেশ সমস্যা। এর মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]