এক দিকে প্রত্যাবর্তন, অন্য দিকে পতন

আঠারো মাস কারাগারে এবং সতেরো বছর বিদেশে কাটানোর পর সশরীরে আবার বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনের মাঠে তারেক রহমান। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে গত দেড় বছর ধরেই তার দেশে ফেরা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মা খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় তার দেশে না ফেরার সমালোচনা কম হয়নি। অবশেষে দেশে এলেন তিনি, যখন নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে ব্যস্ততা চলছে। তাই এবার অনেক চ্যালেঞ্জও আছে তারেক রহমানের সামনে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে জনগণের আস্থা কতটা নিতে পারবেন, সে দিকে নজর থাকবে অনেকের।

এ দিকে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে সেটি নিয়েও চলছে আলোচনা। আওয়ামী লীগের পরিণতি কি মুসলিম লীগের মতো হবে? নাকি আবার ফিরে আসবে দলটি? প্রাসঙ্গিক এসব প্রশ্নের মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরায় কিছু তথ্য জানালেন শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তাও আগের মতো উস্কো-খুস্কো হয়ে নয়, একেবারে স্যুটেড-ব্যুটেড হয়ে ঠাস ঠাস করে কথা বললেন তিনি। আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পেলেও শেখ হাসিনাকে আর নেতৃত্বে নাও দেখা যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন জয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমার মা আসলে দেশে ফিরতে চান। তিনি অবসর নিতে চান। বিদেশে থাকতে চান না।’

চব্বিশের আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন শেখ হাসিনা। দেশটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন আওয়ামী লীগ নেতাদের আরো অনেকে। সরকার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, আগামী নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারবে না। শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ পলাতক বা বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে কারাগারে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন। পতনের পর থেকে গণমাধ্যমে, বিশেষ করে সোস্যাল মিডিয়ায় মাঝে-মধ্যে জয়ের কিছু বিক্ষিপ্ত বক্তব্য এসেছে। ফ্যাকাসে শশ্রুমণ্ডিত হয়ে কখনো কখনো তিনি বলেছেন, এ দেশ নিয়ে তার, তার মা বা তার পরিবারের কোনো ভাবনা নেই। তারপর সেই কথা আবার অস্বীকার করেছেন। এতে তার কথাকে ‘নিরর্থক-আকথা’ বলে মূল্যায়ন করেছেন অনেকে। এখন আলজাজিরার মতো আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্য অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। তাও নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি এবং এর চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে যখন ভিন্ন এক হাইট ও হাইপ ভাসছে, ঠিক সেই সময়টাতেই জয়ের এমন সাক্ষাৎকার। এক দিকে তার মাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা চলছে। এতে আওয়ামী লীগ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও অযোগ্য। শেখ হাসিনাসহ তার ছেলে-মেয়ে, বোন, ভাগনেরা ছড়িয়ে আছেন দেশে দেশে। জয় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ওয়াশিংটন ডিসিতে তার বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভ‚ত আলজাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে জয়ের কাছে তার প্রশ্ন ছিল- বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো ভবিষ্যৎ আছে কি না। জয়ের জবাব- ভবিষ্যৎ অবশ্যই আছে। তিনি যোগ করেন, তার মায়ের বয়স হয়েছে (৭৮ বছর)। এমনিতেই এটি তার শেষ মেয়াদ হতো। তিনি অবসর নিতে চাচ্ছেন। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রীনিবাসন জৈনের প্রশ্ন ছিল- তাহলে এটাকে কি ‘হাসিনা যুগের সমাপ্তি’ বলা যায়? জয়ের জবাব- ‘সম্ভবত তাই।’ সাথে সাথেই আবারো প্রশ্ন- ‘তাহলে আপনি বলছেন যে, আওয়ামী লীগ যদি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, তাকে (শেখ হাসিনা) ছাড়াই কি দল চলবে?’ জবাবে জয় বলেন- ‘হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। এটা সবচেয়ে পুরনো দল। ৭০ বছর ধরে আছে। তাকে (শেখ হাসিনা) সাথে নিয়ে অথবা তাকে ছাড়াই এই দল চলবে। কেউ তো চিরদিন বাঁচে না।’

মাঝে-মধ্যেই শেখ হাসিনার ‘গরম’ অডিও আসছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আওয়ামী লীগ নেতারাও শব্দ বোমা ফাটাচ্ছেন। জয়ও অনেকটা উড়াধুড়া কথা বলেছেন। এর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নির্বাচন ‘হতে দেওয়া হবে না’। আলজাজিরা সেই প্রসঙ্গ এনে প্রশ্ন রাখে- ‘আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞার একটি কারণ হিসেবে সরকার বলছে, আপনারা নির্বাচনে সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন। বিষয়টা সত্য কি না? জবাবে জয় বলেন- ‘দেখুন, যখন কাউকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলা হয়, তখন আর কী হবে? আমরা সহিংসতা চাই না। আমাদের তো প্রতিবাদ করতেও দেওয়া হচ্ছে না।’

দেশে এখন নির্বাচনের উতল হাওয়া বইছে। এসময় সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যগুলো কৌতুহলোদ্দীপক। ব্যাপক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেরও দাবি রাখে। তবে তিনি কতক্ষণ এই কথায় অটুট থাকতে পারবেন, সেটি নিয়েও সন্দেহ আছে। কয়েকদিন পর কথা ঘুরিয়ে ফেলার শঙ্কা থেকেই যায়।

নির্জলা সত্য হচ্ছে- চরম দুঃশাসন করে, অগুনতি মানুষ হত্যা করার পর পালিয়ে গেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বা তার দলের কেউ এখন পর্যন্ত ভুল স্বীকার করেননি, ক্ষমাও চাননি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে যেভাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন, সেরকম কিছু করলেও কিছুটা বিবেচনা করা যেত।

১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত দুঃশাসনের জেরে ২১ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে ছিল। একাশি সালে দেশে ফিরে শেখ হাসিনা দলের হাল না ধরলে আওয়ামী লীগের অবস্থা মুসলিম লীগের মতো হতে পারত। তারপরও পঁচাত্তর-পরবর্তী শেখ হাসিনার একটি সুবিধা ছিল- তার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের মর্মান্তিক হত্যা জাতির কাছে বারবার নিবেদন করা। সেটি জনগণের মধ্যে আবেগ জাগাতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ সফলভাবে ব্যবহার করেছে; কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। শেখ হাসিনা শাসনের টানা পনেরো-ষোল বছরে যে নির্যাতন, দুর্নীতি, হত্যা, গুম, লুটপাট চলেছে- যার জন্য ক্ষমা চাইলেই ক্ষমা পাওয়া অসম্ভব। এর চেয়েও বড় কথা, চৌকস নেতৃত্ব ছাড়া যেকোনো দল ধীরে ধীরে দুর্বল হতে বাধ্য। যোগ্য উত্তরসূরি বা সেকেন্ড-থার্ড লেয়ারে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে দিলেও দল খাদের কিনার থেকে উঠে দাঁড়াতে পারে। দেশীয় রাজনীতিতে তার টাটকা উদাহরণ বিএনপি-জামায়াত। প্রতিবেশী ভারতে উপমহাদেশের প্রাচীন দল কংগ্রেস এবং পাকিস্তানে মুসলিম লীগের করুণ অবস্থাও এর বিপরীত উদাহরণ।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরিতে নেতৃত্ব দেয়া মুসলিম লীগ আজ পাকিস্তানেও অস্তিত্বহীন। দল দু’টিতেই মূল সমস্যা যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের হাল ধরার মতো উপযুক্ত কেউ নেই। শেখ হাসিনা প্রকাশ্য রাজনীতিতে আর আসতে পারছেন না, তা অনেকটা পরিষ্কার। ছেলে জয় সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছেন। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যা, গুম মামলা ছাড়াও দুর্নীতি-লুটপাটের অন্তহীন অভিযোগ আছে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা এবং নির্যাতনকারী হিসেবে আওয়ামী লীগের নৈতিক অবস্থান ধুলায় মিশে গেছে। বিএনপি-জামায়াত বা নতুন কোনো দল একই কাজ করলেই কেবল আওয়ামী লীগ তুলনাগতভাবে কিছুটা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। সেই মাঠ কবে আসবে, এ অপেক্ষায় থাকতে হবে আওয়ামী লীগকে। সেখানেও উপযুক্ত ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বের আবশ্যকতা রয়েছে। মাঠে নানা বয়ান ও দুঃখজনক ঘটনা থাকলেও ফ্যাসিস্ট জমানায় ফেরার দুঃসাহস কোনো দল করবে না। মাঠে যে যা-ই করুক, চব্বিশের আগের জমানায় ফেরার জন্য কেউ একবার ভাবলে দশবার পেছাতে হবে তাকে। যুগের পরিবর্তন এবং নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে রাজনীতি করা আগের চেয়ে কঠিন হয়ে যাবে। ফলে সনাতনী ধারায় চলা রাজনৈতিক দলগুলো অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে। এই তালিকার প্রথমেই আছে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা দলটির নেতৃত্বে এমন কোনো সজ্জন রাখেননি, যার মধ্যস্থতায় দলটির একটি ভবিষ্যৎ রচনা হবে। তিনি রেখেছেন লতাপাতায় জড়ানো-ছড়ানো পারিবারিক সদস্য ও বাছাই করা দুষ্টদের। এর সাথে নানা উজবুকি কাণ্ডকীর্তি যোগ করে দিচ্ছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। এক দিকে তিনি জানালেন, চব্বিশের আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে তৎকালীন সরকার ও শাসকদলের ভ‚মিকা যথাযথ ছিল না। অন্য দিকে দাবি করলেন, বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগকে এখনো সেখানকার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ভোটার সমর্থন করেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পেছনে বিদেশী শক্তির হাত আছে বলে, শুরু থেকে দাবি করে আসছিলেন শেখ হাসিনা; কিন্তু সম্প্রতি ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউজ ১৮-এ দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার পতনে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো বিদেশী শক্তি ‘সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত’ ছিল না। এটি শেখ হাসিনার ভুল স্বীকার, পরিশুদ্ধি বা নতুন কোনো চাতুরী। সে দিকেও সতর্ক নজর অনেকের। এত কিছুর মধ্যেও আওয়ামী লীগের ভেতরে ‘রিফাইন্ড’ বা ‘পরিশুদ্ধ’ আওয়ামী লীগের আকাঙ্ক্ষা আছে।

চব্বিশের আগস্ট মাসের পাঁচ তারিখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে আছে। সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় স্বল্প সময়ের জন্য ঝটিকা মিছিল করে চরম মার খেয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে ঘিরে অনলাইনে ডাক দেয়া ‘লকডাউন’, ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির আড়ালে চোরাগোপ্তা ককটেল নিক্ষেপ ও গাড়ি পুড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ। এতে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। এসব কর্মসূচিতে দলটির নেতাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করতে নিয়মিত অনলাইনে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং কেন্দ্রীয় নেতারাও এই কাজটি করছেন। নতুন করে সেখানে কেবল একটি মাত্রা দিলেন জয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]