বাংলাদেশে প্রচলিত রাজনীতির একটি বড় সমস্যা হলো- যে দল ক্ষমতায় বা শক্তিশালী অবস্থানে থাকে, তাদের সহযোগী সংগঠনের কর্মীরা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও সরকারি কাজে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। বিএনপি এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। সারা দেশে শক্তিশালী অবস্থানে। তাদের কিছু নেতাকর্মী একই পথে হাঁটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগ যে এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ও দখলদারি (যেমন- বালুমহাল, হাট-বাজার, স্ট্যান্ড) নিয়ন্ত্রণ করেছে, এখন বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী সেই জায়গাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন; যাকে সাধারণ মানুষ বলছেন, ক্ষমতার নতুন বন্দোবস্ত।
শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশকে প্রভাবিত করে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়। আওয়ামী লীগ যেভাবে প্রশাসনকে ব্যবহার করত, এখন বিএনপির কর্মীরাও একই কাজ করছে বলে এন্তার অভিযোগ।
ক্ষমতার ঘ্রাণ পাওয়ার পর থেকে দেশে বিএনপির নতুন কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় দেশজুড়ে কাদা ছোড়াছুড়ি, মামলা-মোকদ্দমাসহ ঘটছে সহিংস ঘটনাও। এসব বিষয়ে প্রায় প্রতিদিন পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে তোলপাড় চলছে। গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ যুগান্তর পত্রিকায় ‘মেঘনা উপজেলা বিএনপির কমিটিতে ত্যাগীরা বঞ্চিত, তৃণমূলে ক্ষোভ’ শিরোনামে প্রকাশ, ‘কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে ত্যাগীদের স্থান হয়নি। এতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। মেঘনা বিএনপির নতুন কমিটি ঘিরে মেঘনা, তিতাস, দাউদকান্দি উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বিগত ১৭ বছর যারা হামলা মামলার শিকার হয়ে কারাভোগ করেছেন এবং প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থেকে দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন, তাদের বাদ দিয়ে কমিটি গঠন করে মূলত মেঘনা উপজেলা বিএনপিকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে- এমন মন্তব্যও আলোচনায় উঠে এসেছে।
যেকোনো দলের দুর্বলতার সূচনা আত্মকলহ থেকে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল যেকোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণাম ডেকে আনে। দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে যায়, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। ভেতরের কোন্দল প্রকাশ্যে চলে এলে সাধারণ মানুষের কাছে দলের ভাবমর্যাদা নষ্ট হয়। আস্থা কমে যায়। একপর্যায়ে দল ভেঙে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। যখন মূল লক্ষ্য হয় দলের ক্ষমতা বা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার, তখন দলের আদর্শ ও জনকল্যাণমূলক কাজের অ্যাজেন্ডা পেছনে সরে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে রাজনৈতিক অস্তিত্বের সঙ্কট তৈরি করে।
‘মেঘনা উপজেলা বিএনপির কমিটিতে ত্যাগীরা বঞ্চিত, তৃণমূলে ক্ষোভ’ শিরোনামের খবর পড়ে মনে হলো- কোথায় শহীদ জিয়ার অমর উক্তি- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ! দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার ডাইং ডিক্লারেশন এবং গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ দলটির বর্ধিত সভায় বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমানের দীর্ঘ ভাষণ। সব ছাপিয়ে মনে পড়ে সেই কালজয়ী গানের কলি- ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই।’ সবাইকে সোনার হরিণ দিতে গেলে সামনে চলে আসে ঈশপের গল্পটি।
এক লোক ও তার ছোট ছেলে মিলে তাদের বাড়ির পোষা গাধাটি বিক্রি করতে হাটের পথে রওনা দিলো। হাট অনেকটা দূরে, তাই দুজনে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। পথে যেতে যেতে গ্রামের এক লোকের সাথে দেখা। লোকটি অবাক হয়ে বলল, আরে, তোমরা তো ভীষণ বোকা! এত বড় গাধা আছে অথচ দু’জনে হেঁটে যাচ্ছ? গাধা কি শুধু বোঝা টানার জন্য, চড়ার জন্য নয়? বলে লোকটা হেসে চলে গেল। বাবা ভেবে দেখলেন, লোকটির কথা মিথ্যে নয়। তাই তিনি ছেলেকে গাধার পিঠে বসালেন, আর নিজে হেঁটে চলতে লাগলেন।
কিছু দূর যেতে দেখা হলো কয়েকজন পথচারীর সাথে। তারা হো হো করে হেসে বলল, দেখেছিস, কি নিষ্ঠুর ছেলে! ছোট্ট বয়সে বাবাকে হাঁটিয়ে দিব্যি গাধার পিঠে চড়ে বসেছে! আজকালকার ছেলেপুলে এমনই। তাদের ঠাট্টা-মশকরা শুনে ছেলেটি লজ্জায় গাধা থেকে নেমে পড়ল। এবার বাবা গাধার পিঠে বসলেন।
এভাবে কিছুটা এগোতে দেখা হলো দুই মহিলার সাথে। এক মহিলা আরেকজনকে ফিসফিস করে বলল, দেখো দেখি কেমন নির্লজ্জ লোক! নিজে দিব্যি গাধার পিঠে বসেছে, আর ছোট্ট ছেলেটিকে হাঁটিয়ে নিচ্ছে। বাবা হয়ে ছেলের প্রতি এতটুকু মায়া নেই! কথা শুনে লোকটার বুক ধক করে উঠল। তিনি ভাবলেন, মানুষের মুখ বন্ধ করা মুশকিল। তাই এবার ছেলেকে নিজের সামনে বসিয়ে নিলেন গাধার পিঠে। বাবা-ছেলে একসাথে গাধায় চড়ে হাটের কাছাকাছি পৌঁছালেন।
কিন্তু এবারো মানুষ থামল না। চারপাশের লোকজন হাততালি দিয়ে হেসে উঠল, আহা রে, এত ছোট্ট একটি গাধার পিঠে একসাথে বাবা-ছেলে বসে গেছে! প্রাণীটির দুঃখ-দুর্দশা বোঝে না! একেবারে দয়া নেই। এসব কথা শুনে বাবা চিন্তায় পড়ে গেল। ছেলের সাথে আলোচনা করে অবশেষে তারা নতুন বুদ্ধি বের করল। বন থেকে একটি বাঁশ কেটে এনে গাধার পা বেঁধে দুই প্রান্তে ঝুলিয়ে দুজন মিলে কাঁধে তুলে নিলো। একে একে তারা হেঁটে চলতে লাগল। মানুষের ভিড় আরো জমল, সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ল; এই তো দেখো, পৃথিবীর বোকা লোকেরা! গাধাকে চড়তে না দিয়ে উল্টে গাধাকে কাঁধে নিয়ে যাচ্ছে! শেষমেশ তারা যখন হাটের কাছাকাছি একটি সাঁকোতে পৌঁছাল, তখন হঠাৎ গাধার বাঁধন খুলে গেল। গাধাটি ছটফট করতে করতে নদীতে পড়ে গেল এবং স্রোতে ভেসে গেল। বাবা-ছেলে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তখনই পেছন থেকে আসা এক বৃদ্ধ লোক এগিয়ে এসে বলল, এ ঘটনা তোমাদের শেখায়- জীবনে সবাইকে খুশি করতে গেলে আসলে কাউকে খুশি করা যায় না। যা-ই করো না কেন, কিছু লোক সমালোচনা করবেই। বর্তমান সময়েও যেকোনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিজের বিবেক ও বোধবুদ্ধি দিয়ে দলীয়, রাষ্ট্রীয় ও সরকার পরিচালনায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
লেখক : আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক



